‘আমার পুরো দেশের জন্য এটি একটি বড় মুহূর্ত’, সিএনএনকে ডিজে সানজয়

বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে পারফর্ম করার ঠিক আগে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই বলেছিলেন ডিজে সানজয়।

খ্যাতি ও যশের চূড়ায় উঠলেও নিজের শিকড় আর দেশকে যে কতটা দারুণভাবে ভালোবাসা যায়, বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে তারই এক অনন্য এবং কালজয়ী উদাহরণ সৃষ্টি করলেন এই তরুণ। পুরো বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের নজর যখন তার ওপর, তখন তিনি নিজের একক সাফল্যের চেয়ে স্বদেশের গৌরবকেই বড় করে দেখালেন।

শুধু একজন ডিজে হিসেবেই নন, সানজয় একজন বিশ্বমানের মিউজিক প্রডিউসার বা সংগীত প্রযোজক হিসেবে ইতোমধ্যে হলিউড থেকে শুরু করে বলিউডের সংগীতের ধারা বদলে দিচ্ছেন। দীর্ঘ সময় ধরে পর্দার আড়ালে থেকে নোরা ফাতেহির একের পর এক ব্লকবাস্টার হিট গানের পেছনের মূল কারিগর ছিলেন তিনি, আর এবার কানাডার টরন্টো স্টেডিয়ামের (বিএমও ফিল্ড) বিশ্বকাপের মঞ্চে সেই কারিগর নিজেই এলেন একদম সামনে।

বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া সানজয় পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠেন এবং বর্তমানে লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক একজন ইডিএম (ইলেকট্রনিক ডান্স মিউজিক) প্রযোজক ও ডিজে হিসেবে কাজ করছেন। 

ইলেকট্রনিক ও ফিউশন ঘরানার সংগীতে তার কাজ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বলিউড ছাড়িয়ে আরবান পাঞ্জাবি মিউজিক ঘরানায় দারুণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন তিনি। তার জাদুকরী প্রযোজনায় ইতোমধ্যে কণ্ঠ দিয়েছেন অরিজিৎ সিং, গুরু রন্ধাওয়া, সুনিধি চৌহান, জনিতা গান্ধী, বেনি দয়াল এবং আমেরিকান আইডলের তারকা এলিয়ট ইয়ামিন,ট্রেভর হোমস ও অ্যাশ কিংসহ আরও অনেক বিশ্বখ্যাত শিল্পী। সমসাময়িক হিন্দি ও ফিউশন সংগীতের বিভিন্ন প্রজেক্টে যুক্ত থেকে বলিউডের সংগীত অঙ্গনেও নিজের এক মজবুত অবস্থান তৈরি করেছেন এই দূরদর্শি প্রযোজক।

সানজয় যেভাবে দেশকে উপস্থাপন করলেন বিশ্বমঞ্চে
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী মঞ্চে পারফর্ম করতে যাওয়ার আগেই সানজয় প্রমাণ করে দিয়েছেন যে তিনি তার চিন্তা-চেতনা আর মননে বাংলাদেশকে কী প্রবলভাবে ধারণ করেন। স্টেডিয়াম কাঁপাতে নামার আগে নিজের আউটফিট বা পোশাকের মাধ্যমেই তিনি বিশ্ববাসীকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের সংস্কৃতির সাথে। 

তার জন্য বিশেষভাবে তৈরি কাস্টম-মেড জ্যাকেটটির কলার, হাতা এবং পিঠের অংশে সগৌরবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, গর্জনরত রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের প্রতীক এবং এদেশের লোকজ ঐতিহ্যের অনন্য অনুষঙ্গ ‘রিকশা পেইন্টের’ নিখুঁত রঙিন মোটিফ।

কোনো চাপিয়ে দেওয়া প্রচার নয়, বরং সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বৈশ্বিক প্রবাসীদের প্রতিনিধি হয়ে নিজের শেকড়কে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া মঞ্চে তুলে ধরার এই দুর্দান্ত প্রয়াসটি হৃদয় কেড়েছে প্রতিটি বাঙালির।

বিশ্বকাপের অফিশিয়াল থিম সং ‘সির সির’ গানটিতে সানজয়ের এই পারফরম্যান্স এবং এর কালচারাল ইমপ্যাক্টের ভূয়সী প্রশংসা করেছে বিবিসি নিউজ, সিএনএন এবং দ্য ন্যাশনালের মতো বিশ্বের প্রথম সারির গণমাধ্যমগুলো। বিবিসি নিউজ তাদের বিশেষ ফিচারে পশ্চিমা ইলেকট্রনিক বিটের সাথে দক্ষিণ এশীয় ছোঁয়ার এই মেলবন্ধনকে সাধুবাদ জানিয়েছে। 

আর মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে দেওয়া সেই এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সানজয় বলেন, “আমি যেখান থেকে এসেছি, সেখানে সাধারণত এরকম মুহূর্ত খুব একটা পাওয়া যায় না। তাই এটি শুধু আমার নিজের জন্য কোনো মুহূর্ত নয়, এটি আসলে আমার পুরো দেশের জন্য একটি বড় মুহূর্ত। আর হ্যাঁ, আমি আমার দেশের মানুষ ও আমার বাবা-মায়ের জন্য অত্যন্ত গর্বিত। এবং হ্যাঁ, আমার সত্যিই ভীষণ ভালো লাগছে।”

বিশ্বকাপ উদ্বোধনীতে ‘সির সির’ পারফর্মেন্সে ডিজে সানজয়
এই আনন্দের মাঝে বাংলাদেশের জন্য আরও একটি গর্বের বিষয় হলো, বিশ্ব মাতানো এই গানটির কো-প্রডিউসার এবং লিরিকেও জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নাম। সানজয়ের সাথে এই গানের সহ-প্রযোজনা এবং লিরিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বাংলাদেশের আরেক কৃতি সন্তান রাসেল আলি। আন্তর্জাতিক এই প্রজেক্টে তাদের দুজনের এই মেলবন্ধন বাংলা সংস্কৃতির বৈশ্বিক যাত্রায় এক নতুন পালক যুক্ত করল।

এবারের ফিফা ওয়ার্ল্ডকাপের অফিশিয়াল গানগুলো যখন বিশ্বজুড়ে তেমন একটা আলোড়ন তুলতে পারছিল না, ঠিক তখনই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এক মহাকাব্যিক ঝড় তোলে সানজয়-নোরার এই গানটি। রিলিজ হওয়ার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউটিউবে ২০ মিলিয়নেরও (২ কোটি) বেশি ভিউ পার করে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় রেকর্ড গড়ে এটি। এর মাধ্যমে তারা বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় পপ কুইন শাকিরার প্রথম দিনের ভিউয়ের রেকর্ড সম্পূর্ণ ভেঙে দেন। 

এবারের আসরে শাকিরার অফিশিয়াল গান ‘দাই দাই’ প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যেখানে ৮.২ মিলিয়ন ভিউ পেয়েছিল, সেখানে সানজয়-নোরার গানটি তার দ্বিগুণেরও বেশি ভিউ পেয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুততম সময়ে দেখা ফিফা অ্যান্থেম-এর মর্যাদা লাভ করে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, গানটির অফিশিয়াল মিউজিক ভিডিওর ভিউ ইতিমধ্যেই ইউটিউবে ৪১ মিলিয়নের ঘর ছুঁয়ে অবিরাম ছুটে চলেছে। 

প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সংগীতশিল্পী ও প্রযোজক হিসেবে ফিফার অফিশিয়াল ট্র্যাকে সরাসরি নাম লেখানো এবং উদ্বোধনী মঞ্চে দাঁড়িয়ে পুরো বিশ্বকে নাচানোর এই মহাকাব্যিক রেকর্ড দক্ষিণ এশীয় সংগীতের ইতিহাসে চিরকাল একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে।

আর ভবিষ্যত? দেশের মানুষের উদ্দেশ্যে সানজয় তো বলছেন, এটা মাত্র শুরু...