সম্প্রতি ফাঁস হওয়া পানামা পেপারসে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি ও সম্পদ গোপনের তথ্য সামনে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি বড় করপোরেশনের ওপর অক্সফামের গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। এর ভিত্তিতে 'ব্রোকেন অ্যাট দ্য টপ' শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বৈশ্বিক কর ব্যবস্থায় বড় ধরনের অনিয়ম চলছে।’
আরও পড়ুন: পানামা পেপারস-এ মার্কিন নাগরিক না থাকায় বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন
অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে সম্পদ গোপনের দিক দিয়ে অক্সফামের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তর কোম্পানি ও টেকনোলজি জায়ান্ট অ্যাপলের নাম। কর ফাঁকির জন্য স্বর্গ বলে বিবেচিত এলাকা অর্থাৎ ট্যাক্স হ্যাভেনের তিনটি শাখায় প্রতিষ্ঠানটি ১৮ হাজার ১শ কোটি ডলার অর্থ জমা রেখেছে।
আর অক্সফামের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বোস্টনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান জেনারেল ইলেক্ট্রিকের নাম। অক্সফাম জানায়, ২৮শ কোটি ডলার সমপরিমাণের অর্থ কর মওকুফ পাওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটি ট্যাক্স হ্যাভেনের ১১৮টি শাখায় ১১ হাজার ৯শ কোটি ডলার অর্থ জমা রেখেছে।
ট্যাক্স হ্যাভেনের টাকা রাখার মাধ্যমে সম্পদ গোপনের প্রবণতার তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে কম্পিউটিং ফার্ম মাইক্রোসফট। ট্যাক্স হ্যাভেনে প্রতিষ্ঠানটির ১০ হাজার ৮শ কোটি ডলার জমা রাখা আছে বলে জানিয়েছে অক্সফাম।
এছাড়া শীর্ষ দশের তালিকায় আরও রয়েছে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি পিফাইজার, গুগলের পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান অ্যালফ্যাবেট এবং তেল কোম্পানি এক্সন মোবিলের নাম।
আরও পড়ুন: পানামা পেপারস: বিশ্বের ধনী ও প্রভাবশালীদের প্রতিক্রিয়া
অক্সফামের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ৫০টি প্রতিষ্ঠান ২০০৮ সাল থেকে ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে ১৪শ বিলিয়ন ডলার অফশোর প্রতিষ্ঠানে রেখেছে আর ১ হাজার ডলার কর হিসেবে পরিশোধ করেছে। একই সময়ের মধ্যে কোম্পানিগুলো প্রাদেশিক ঋণ, বেলআউট ও ঋণ গ্যারান্টি হিসেবে সম্মিলিতভাবে কোম্পানিগুলো ১১ হাজার ২শ বিলিয়ন ডলার সুবিধা পেয়েছে।
আর ২০০৮ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে কোম্পানিগুলো তাদের ৪ হাজার বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণের মুনাফা থেকে ট্যাক্স হ্যাভেনে অর্থ জমা রাখার কারণে করের হার ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৬.৫ শতাংশ দিয়েই ছাড় পেয়ে যায় প্রতিষ্ঠানগুলো। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে তদবিরের জন্য ২০০৮ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ৫০টি কোম্পানি ২.৬ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। অক্সফামের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘তদবিরের জন্য খরচ করা প্রতি এক ডলারের বিনিময়ে কোম্পানিগুলো ১৩০ ডলার কর মওকুফ পেয়েছে এবং প্রাদেশিক ঋণ, ঋণ গ্যারান্টি ও বেলআউট বাবদ ৪ হাজার ডলারেরও বেশি সুবিধা পেয়েছে।’
অক্সফামের জ্যেষ্ঠ কর উপদেষ্টা রবি সিলভারম্যান বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে কর ব্যবস্থায় ব্যাপক অনিয়মের প্রমাণ আমাদের কাছে আছে। যতদিন পর্যন্ত ধনী ও ক্ষমতাশালীরা তাদের কর যথাযথভাবে পরিশোধ করবেন না, ততোদিন পরিস্থিতি কাটানো যাবে না। ট্যাক্স হ্যাভেনের যুগের সমাপ্তি ঘটাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারের একত্রিত হওয়া প্রয়োজন।’
পরিস্থিতি ঠেকাতে ট্যাক্স হ্যাভেনের অনিয়ম বন্ধকরণ আইন প্রনয়ন করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে অক্সফাম।
আরও পড়ুন: 'পানামা পেপারস প্রকাশ করা হয়েছে জনস্বার্থে'
উল্লেখ্য, গোপনীয়তা রক্ষাকারী হিসেবে স্বীকৃত পৃথিবীর অন্যতম প্রতিষ্ঠান মোস্যাক ফনসেকা, যেটি পানামার একটি আইনি প্রতিষ্ঠান, সেখান থেকেই সম্প্রতি ফাঁস হয়েছে ১১ মিলিয়ন নথিপত্র। ওই নথিপত্রগুলোকেই বলা হচ্ছে পানামা পেপারস। ফাঁস হওয়া নথিগুলোতে দেখা যাচ্ছে, কিভাবে গোপনীয়তার আড়ালে ল’ ফার্মটি বিশ্বনেতাদের অর্থপাচার, নিষেধাজ্ঞা এড়ানো এবং কর ফাঁকিতে সহযোগিতা করেছে। এতে আরও উঠে এসেছে, স্বৈরশাসকসহ বিশ্বের সাবেক ও বর্তমান ৭২ জন রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের নিজেদের দেশ থেকে অর্থ লোপাটের ভয়াবহ চিত্র। তবে মোস্যাক ফনসেকা বলছে, কোনও রকম প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই তারা গত ৪০ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে আসছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
/এফইউ/বিএ/