ধ্বংসস্তূপের মাঝে গাজার শিশু-কিশোরদের বেঁচে থাকার আশ্রয় যখন শিল্পকলা

একটি সাদা কাগজের মুখোমুখি বসে আছে মারিয়াম। হাতে পেন্সিল উঁচিয়ে সে তার প্রথম রেখাটি টানতে শুরু করেছে। শান্ত হাতে পেন্সিল চললেও তার চোখ দুটো নিবদ্ধ ছবির সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর বিষয়ে। 

ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ যখন গাজার দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটা পরতে নিজেকে চাপিয়ে দিয়েছে, সেই নির্মম বাস্তবতার ভেতরেও ১৬ বছর বয়সী মারিয়াম নিজের জন্য অন্যরকম এক পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করছে। অন্তত কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও। এই কাগজ আর পেন্সিল তাকে চারপাশের বীভৎস দৃশ্যপট থেকে দূরে সরে গিয়ে নিজের চেনা ও ভালোবাসার জগতে ফিরে যাওয়ার একটা সুযোগ করে দেয়।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বোমার আঘাতে মারিয়ামদের বাড়িটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। বর্তমানে সে দেইর আল-বালাহে তার নানির বাড়িতে থাকছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা ইসরায়েলি হামলায়, যেখানে ৭৩,০০০-এরও বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন, সেখানে সে হারিয়েছে তার অনেক বন্ধু ও কাছের মানুষদের, যাদের মধ্যে তার চাচা-মামারাও রয়েছেন।

দেইর আল-বালাহের সৈকতসংলগ্ন একটি ক্যাফেতে গড়ে ওঠা শিল্পের এই মুক্তাঙ্গনটি এখন তার একমাত্র আশ্রয়স্থল।

“এই জায়গাটা আমাকে নিজের ভেতরে ফিরে আসতে এবং আঁকাআঁকির প্রতি আমার যে ভালোবাসা ছিল, তা নতুন করে খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে,” বলে মারিয়াম।

মারিয়ামের কাছে ছবি আঁকা কেবল কোনও শখ বা বিনোদন নয়; এটি তার অনুভূতিগুলোকে কাগজের পাতায় ফুটিয়ে তোলার মাধ্যম। বিশেষ করে সেই অনুভূতিগুলো, যা ভাষায় প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব।

“আমি মানসিকভাবে দারুণ এক হালকা অনুভব করি। মনে হয় বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা অনুভূতিগুলো ভেতরে আটকে না রেখে কাগজের ওপর ঢেলে দিতে পারছি,” মারিয়াম বলে। 

সে আরও বলে, “প্রতিটি ছবি আমাকে অনুভব করায় যে, আমি যা অনুভব করি তার একটা অংশ হলেও নিজের মতো করে মানুষের কাছে প্রকাশ করতে পেরেছি; এমনকি যেসব বিষয় নিয়ে আমি হয়তো মুখে কখনো কথাই বলতে পারি না, সেগুলোও।” 

আশার আলো জ্বালানোর প্রয়াস 

মারিয়াম সেই ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকে, কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিলে এই আর্ট স্পেসটি গড়ে ওঠার পর থেকেই সে এখানে নিয়মিত আসা শুরু করে।

সে জানায়, প্রতিটি আঁকা ছবি শেষ করার পর তার মধ্যে এক ধরনের সাফল্য অর্জনের আনন্দ কাজ করে এবং ভারী হয়ে থাকা দিনগুলোর মাঝে আশার এক চিলতে আলো ছড়িয়ে দেয়।

“এটি আমাকে প্রতিদিন এক নতুন উদ্দীপনা নিয়ে ঘুম থেকে উঠতে সাহায্য করে। ছবি আঁকা এখন আমার দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন একটা নতুন ছবি আঁকা শেষ হলে তা আমার মনে নতুন আশার বীজ বুনে দেয়,” মারিয়াম বলে। 

তার ভাষায়, “যদি আমি ছবি না আঁকতাম, তবে হয়তো বিষণ্ণতা আর এই কঠিন পরিস্থিতির কাছে আত্মসমর্পণ করে বসতাম। কিন্তু আমি আবারও নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছি এবং প্রতিদিন নতুন কিছু না কিছু আঁকা শিখছি।” 

মারিয়ামের মতো শিশুদের সাহায্য করাই ৩৫ বছর বয়সী আবদুল্লাহ আল-গাফরির এই আর্ট স্পেসটি গড়ে তোলার মূল উদ্দেশ্য। চড়া ভাড়ার কারণে বিনিয়োগকারীর খোঁজে নিরন্তর দৌড়ঝাঁপ করতে হলেও কেন্দ্রটি চালু রাখতে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

“প্রয়োজন আর এই কঠিন বাস্তবতার তাকিদেই ধারণাটার জন্ম,” বলেন আল-গাফরি। তিনি আরও বলেন, “গাজার বেশিরভাগ শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বোমার আঘাতে ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তরুণ ও শিশুদের ভেতরের প্রতিভাগুলোকে ধারণ করার মতো কোনও জায়গা আমরা পাচ্ছিলাম না।” 

“মূল লক্ষ্য হলো অংশগ্রহণকারীদের এই যুদ্ধ আর ধ্বংসের পরিবেশ থেকে বের করে আনা,” যোগ করেন আল-গাফরি। “এবং এমন একটি স্থান তৈরি করা যেখানে তারা ভেতরের জমানো ঋণাত্মক বা নেতিবাচক শক্তি বের করে দিয়ে ইতিবাচক শক্তি ও আশার আলো দিয়ে নিজেদের ভরিয়ে তুলতে পারে।” 

মানসিক ধাক্কা সামলানোর উপায়

মনোবিজ্ঞানী আসিল আবু শাবিশের মতে, যেকোনও বড় ধরনের মানসিক ট্রমা বা আঘাতের পর শিশুরা যখন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন শিল্পকর্ম তাদের মানসিক অনুভূতি প্রকাশের পথ তৈরি করে দেয়।

“একটি শিশু যখন ছবি আঁকে, গান গায় কিংবা কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজায়, তখন সে মূলত তার ভেতরে জমে থাকা মানসিক চাপ ও অনুভূতির কিছু অংশ হলেও বাইরে বের করে দেয়,” তিনি বলেন।

আবু শাবিশ ব্যাখ্যা করেন যে, নিরন্তর পরিবর্তনশীল ও অনিশ্চিত পরিস্থিতির মাঝে শিশুদের শিল্পচর্চায় যুক্ত রাখার জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে তা তাদের মানসিক স্থিরতা প্রদান করে। 

তিনি বলেন, “একটি শিশু যখন কোনও নিরাপদ স্থানে প্রবেশ করে এবং জানে যে ছবি আঁকা বা গান শেখার জন্য তার নির্দিষ্ট কিছুটা সময় আছে, তখন তা তাদের অনুভব করতে সাহায্য করে যে, জীবনের অন্তত একটা অংশ হলেও এখনও তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আছে। মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে এই অনুভূতিটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” 

আনুষ্ঠানিক ‘যুদ্ধবিরতি’ সত্ত্বেও যুদ্ধ থামেনি, যার ফলে শিশুরা প্রতিনিয়ত চরম ভয়, মানসিক চাপ ও স্বজন হারানোর বেদনা সহ্য করে যাচ্ছে। তাই আবু শাবিশ মনে করেন, এসব অনুভূতিকে আরও নিরাপদ উপায়ে সামলানোর সুযোগ করে দেয় শিল্পচর্চা। 

তার ভাষায়, “শিল্পকলা হয়তো যুদ্ধের রেখে যাওয়া সমস্ত মানসিক ক্ষতের শতভাগ চিকিৎসা নয়, তবে এটি মনের জমে থাকা অনুভূতি প্রকাশের এবং বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে; বিশেষ করে যখন কর্মকাণ্ডগুলো শিশুর বয়সোপযোগী হয় এবং তাদের সহায়তায় দক্ষ বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।” 

তিনি জানান, এসব কর্মকাণ্ডের সুফল সেশনের সময়ও সরাসরি প্রত্যক্ষ করা যায়। যেমন শিশুদের পরস্পরের প্রতি মিথস্ক্রিয়া, মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা এবং কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে।

“আমরা প্রায়ই লক্ষ্য করি যে, শান্ত কিংবা গুটিয়ে থাকা কোনও শিশুও ছবি আঁকা বা সংগীতের মাধ্যমে দলের সঙ্গে মিশতে শুরু করেছে। এই শিল্পচর্চাই পরবর্তীতে কোনও একটি নতুন সম্পর্ক, সংলাপ কিংবা সুরক্ষার অনুভূতি তৈরির মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়ায়,” যোগ করেন তিনি। 

তিনি বিশ্বাস করেন, অনেক শিশু মুখের ভাষার চেয়ে শিল্পকলার ভাষাকে অনুভূতির প্রকাশের জন্য সহজ মাধ্যম বলে মনে করে।

তিনি বলেন, “সব শিশুর পক্ষে হয়তো বলা সম্ভব হয় না যে, ‘আমি ভয় পাচ্ছি’, ‘আমার খুব কষ্ট হচ্ছে’ কিংবা ‘আমি আমার আপনজনকে হারিয়েছি’। কিন্তু তারা হয়তো সেই অনুভূতিটি এঁকে ফেলে, তা প্রকাশ করে এমন কোনও গান বেছে নেয় কিংবা বাদ্যযন্ত্রে সুর তুলে মনকে হালকা করে।” 

তাই শিল্পকলা কেবল বিনোদন নয়, বরং প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যখন এটি দীর্ঘ মেয়াদে অব্যাহত থাকে এবং শিশুর জীবনের অংশে পরিণত হয়। 

সংগীতের মাধ্যমে নিরাময়

নুসেইরাতের ‘প্যালেস্টাইন স্টুডেন্ট কেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’-এ জাবর থাবেত ‘এডওয়ার্ড সাইদ ন্যাশনাল কনজারভেটরি অব মিউজিক’-এর কার্যক্রমের সমন্বয় করছেন। সেখানে শিশুরা বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ঘিরে একত্র হয়, গান গায় এবং সুর শেখে। 

কনজারভেটরির গাজা শাখার প্রজেক্টস অ্যান্ড ভেন্যু কোঅর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন থাবেত। তিনি বলেন, “আমরা চেষ্টা করছি শিশুদের কাছে গান পৌঁছে দিতে। তারা যেখানেই থাকুক না কেন, কেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কিংবা জায়গা বদলে গেলেও।” 

“আমরা শুধু তাদের গান শেখাচ্ছি না; তাদের এমন একটি পরিবেশ দেওয়ার চেষ্টা করছি যেখানে তারা স্বাভাবিক জীবনের সামান্য অনুভূতি পাবে, একটু আনন্দ পাবে এবং তাদের মতো অন্যান্য শিশুদের সঙ্গে মেলামেশা করতে পারবে,” যোগ করেন তিনি। 

গাজা সিটিতে অবস্থিত কনজারভেটরির মূল ভবনটি যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এর শিক্ষকরা নুসেইরাত, দেইর আল-বালাহ এবং স্বয়ং গাজা সিটির মতো বাস্তুচ্যুত এলাকাগুলোতে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন।

কাজের সেশনগুলোতে থাবেত শিশুদের আসা থেকে শুরু করে মহড়ার শেষ পর্যন্ত সুরের প্রতি তাদের এই অনুরাগ খুব কাছ থেকে দেখেন। তিনি বলেন, “যে জিনিসটা আমাকে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করে, তা হলো তাদের অগাধ উৎসাহ। একটি শিশু নতুন কিছু শেখার আগ্রহ নিয়ে ক্লাসে আসে এবং সেশন শেষে এই ব্যাকুলতা নিয়ে বাড়ি ফেরে যে কখন সে আবার এখানে ফিরে আসতে পারবে।” 

তার মতে, “সংগীত একটি শিশুকে তার ভেতরের গুমরে মরা কথাগুলোকে ভিন্ন উপায়ে ফুটিয়ে তোলার সুযোগ দেয়। একটি শিশু হয়তো মুখে বলতে পারে না, কিন্তু সে গান গাইতে পারে কিংবা সুর তুলতে পারে।” 

থাবেত যোগ করেন, “আমাদের কাছে শিল্পকলা হলো টিকে থাকার বা প্রতিরোধের এক অনন্য রূপ। চারপাশের এই চরম ধ্বংসস্তূপের মাঝেও যখন একটি শিশু গান গাইতে পারে, বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারে এবং সুন্দর কিছু সৃষ্টি করতে পারে, তখন সে মূলত নিজের সত্তা ও জীবনের একটা অংশকে বাঁচিয়ে রাখে।”