যুক্তরাষ্ট্রে সহিংস অপরাধ কমার নেপথ্যে অ্যালকোহল, এআই নাকি বয়সের প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্রে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে তীব্র ও ব্যাপক অপরাধ হ্রাসের এক অভাবনীয় চিত্র দেখা যাচ্ছে। তবে ঠিক কী কারণে সহিংস অপরাধ এভাবে নিম্নমুখী, তা নিয়ে অপরাধবিজ্ঞানীরা শতভাগ নিশ্চিত হতে না পারলেও বেশ কয়েকটি বড় কারণ সামনে নিয়ে এসেছেন।

গবেষকদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, করোনা মহামারির পর অ্যালকোহল ও মাদকের ব্যবহার কমে যাওয়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক আধুনিক পুলিশিং প্রযুক্তি, জনসংখ্যার গড় বয়স বৃদ্ধি এবং কঠোর প্রসিকিউশনসহ নানা উপাদানের সম্মিলিত প্রভাবেই এই পরিবর্তন আসছে।

এফবিআই-এর গত ৯০ বছরের জাতীয় হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সহিংস অপরাধের হার এক বছরে রেকর্ড ৯.৭ শতাংশ কমেছে। এর মধ্যে হত্যাকাণ্ডের হার ১৮.৫ শতাংশ কমে প্রতি ১ লাখ মানুষে ৪.১-এ নেমে এসেছে, যা ১৯৫৫ ও ১৯৫৬ সালের পর সর্বনিম্ন। আর এই পতনের ধারা থেমে নেই, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধেও বড় শহরগুলোতে সহিংস অপরাধ আরও কমেছে বলে ডেটা বিশ্লেষণে দেখা গেছে।

মহামারি-পরবর্তী সময়ে অ্যালকোহল, অবৈধ ওষুধ ও অস্ত্র কেনাকাটা কমে আসা অপরাধ দমনে বড় প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি বিধিনিষেধ উঠে গিয়ে মানুষের কর্মসংস্থান ও সামাজিক জীবনযাত্রা স্থিতিশীল হওয়ায় তরুণরা অপরাধ থেকে দূরে থাকছে। আধুনিক পুলিশ বাহিনীও এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রেডিক্টিভ অ্যানালিটিক্স এবং প্যালানটির গথাম-এর মতো সফটওয়্যার ব্যবহার করে অপরাধের হটস্পট ও আসামিদের দ্রুত শনাক্ত করছে।

যুক্তরাষ্ট্রে কম বয়সীদের অনুপাত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হ্রাস পাচ্ছে। যেহেতু তরুণরাই ঐতিহাসিকভাবে স্ট্রিট ক্রাইমের সঙ্গে বেশি যুক্ত থাকে, তাই এই ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তন অপরাধ কমাতে বড় ভূমিকা রাখছে।

এছাড়া একটি চিকিৎসাগত দিকও গবেষকদের নজর কেড়েছে। ওজেমপিক-এর মতো জিএলপি-১ গোত্রের ওজন কমানোর ওষুধের ব্যাপক ব্যবহার মানুষের অ্যালকোহল আসক্তি এবং হঠাৎ আবেগের বশে কোনও অপরাধ করে ফেলার প্রবণতা কমাতে সাহায্য করছে বলে চিকিৎসাবিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণায় দেখা গেছে।

মার্কিন বিচার বিভাগের সাবেক শীর্ষ পরিসংখ্যান বিশেষজ্ঞ লিওনার্ড অ্যাডাম সাইপস জুনিয়র জানান, অ্যালকোহল ব্যবহার কমে যাওয়া এবং দেশের মানুষের গড় বয়স বাড়ার বিষয়টি অপরাধ কমার পেছনে স্পষ্ট অবদান রাখছে। তবে ড্রোন কিংবা অটোমেটিক লাইসেন্স প্লেট রিডারের মতো প্রযুক্তি কাজ করলেও সব নতুন প্রযুক্তির সার্বিক প্রভাব জানার সময় এখনও আসেনি।

অন্যদিকে ভেরা ইনস্টিটিউট অব জাস্টিস-এর প্রেসিডেন্ট ইনশা রহমান মনে করেন, এটি কেবল কোভিডের পর স্বাভাবিক ধারায় ফেরার বিষয় নয়। শিকাগো, বাল্টিমোর, ডেট্রয়েট ও লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো শহরগুলো তরুণদের জন্য গ্রীষ্মকালীন কর্মসংস্থান, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা এবং অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোয় পুলিশ ও সামাজিক কর্মীদের সমন্বিত পদক্ষেপের পেছনে যে বিনিয়োগ করেছে, তার ফল মিলছে।

যদিও ট্রাম্প প্রশাসন ওয়াশিংটন ডিসি ও মেমফিস শহরে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন এবং কঠোর প্রসিকিউশনকে এই সাফল্যের কারণ হিসেবে দাবি করেছিল। তবে সাইপস ও ইনশা রহমান উভয়ই এই দাবি খারিজ করে জানান, যেসব শহরে ন্যাশনাল গার্ড পাঠানো হয়নি বা আইনি কঠোরতা বাড়ানো হয়নি, সেখানেও অপরাধ সমানভাবে কমেছে।

তবে আগামী দিনে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে কিংবা মহামারি-পরবর্তী কেন্দ্রীয় তহবিল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে অপরাধ দমনের এই ইতিবাচক ধারা বজায় রাখা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সূত্র: অ্যাক্সিওস