দীর্ঘায়িত যুদ্ধের মুখে অভ্যন্তরীণ চাপে থাকা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মধ্য এশিয়ায় চীন ও ভারতের নেতাদের সঙ্গে সম্মেলনে মিলিত হচ্ছেন। সোমবার ১০ সদস্যের রাজনৈতিক ও সামরিক জোট সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও)-এর দুদিনব্যাপী সম্মেলনে অংশ নিতে তারা কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে পৌঁছান। পশ্চিমারা যখন রাশিয়া ও ইরানকে একঘরে করার চেষ্টা করছে, তখন এই জোটকে বিকল্প সমর্থনের ক্ষেত্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে চাইছে দেশ দুটি।
পূর্বে কেবল রাশিয়া, চীন এবং চার কেন্দ্রীয় এশীয় দেশকে নিয়ে গঠিত এই জোট ২০১৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানকে যুক্ত করে। সম্প্রতি বেলারুশ ও ইরান যুক্ত হওয়ায় এটি পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে এক শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
এই আয়োজনের মূল কেন্দ্রে রয়েছেন সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। অশোধিত তেলের বৃহত্তম আমদানিকারক ও ভোক্তা পণ্যের রফতানিকারক হিসেবে তার বিশাল ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণে ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের মধ্যেও অর্থনৈতিকভাবে টিকে রয়েছে রাশিয়া ও ইরান। যুদ্ধগুলোর কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নজর অন্যদিকে সরে যাওয়ায় বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে শি জিনপিংয়ের প্রভাব আরও বেড়েছে। ট্রাম্পের অর্থনৈতিক হুমকির মুখেও তেহরানকে সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছেন তিনি।
ইউক্রেনে পঞ্চম বছরে পড়া রুশ আক্রমণ টিকিয়ে রাখতে এসসিওভুক্ত দেশগুলোর ভূমিকা রয়েছে। ইরান রাশিয়াকে ড্রোন ও প্রযুক্তিসহ নানা সরঞ্জাম দিচ্ছে, আর মধ্য এশিয়ার দেশগুলো রাশিয়ার আমদানি ও লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে কাজ করছে। অন্যদিকে ইউক্রেনীয় হামলায় রাশিয়ার তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভারত, কাজাখস্তান ও বেলারুশ রাশিয়াকে পেট্রোল সরবরাহ করছে। যুক্তরাষ্ট্র নতুন নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর ভারত সাময়িকভাবে রুশ তেল আমদানি কমালেও ইরানে মার্কিন যুদ্ধের ধাক্কায় আবারও রাশিয়ার কাছ থেকে তেল নিতে শুরু করেছে। চীনও ছাড় মূল্যে রাশিয়া থেকে জ্বালানি কিনে মজুত করছে এবং মস্কোকে প্রয়োজনীয় ইলেকট্রনিক্স ও নানাবিধ পণ্য সরবরাহ করছে।
সম্মেলনের স্থান কিরগিজস্তান একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ থাকলেও সম্প্রতি সেখানে চীনের প্রভাব স্পষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। কিরগিজ প্রেসিডেন্ট সাদির জাপারভের সঙ্গে সাক্ষাতে শি জিনপিং মন্তব্য করেছেন, দুই দেশের সম্পর্ক এক বিশাল লাফ দিয়েছে এবং সব ক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শি জিনপিংয়ের মূল লক্ষ্য অ-পশ্চিমা বিশ্বের নেতা হিসেবে নিজের অবস্থানকে উজ্জ্বল করা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভঙ্গুর অর্থনৈতিক যুদ্ধবিরতির মধ্যে ওয়াশিংটন সফরের মাত্র এক মাস আগে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অতিরিক্ত উসকানি দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষক ও বাইডেন প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তা জুলিয়ান গেউইর্টজের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যখন তাদের মিত্রদের হাতছাড়া করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে চীন নিজের বন্ধুদের অবস্থান স্পষ্ট করছে এবং ইউরেশিয়ায় তাদের প্রভাব দৃঢ় করে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার টেবিল প্রস্তুত করতে চাইছে।
সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস