নেপালের রসুয়া জেলায় প্রলয়ংকরী ঢলের পর চার দিন ধরে ২১ বছর বয়সী আয়ুষ খড়কার খোঁজে ছুটেছেন স্বজনেরা। সরকারি চাকরিজীবী এই তরুণ বেঁচে আছেন, এমন সামান্য একটি সংকেতের আশায় চরম উৎকণ্ঠায় কেটেছে পরিবারের প্রতিটি মুহূর্ত।
নেপাল-চীন সীমান্তজুড়ে উপত্যকার শহর ও গ্রামগুলোতে হিমবাহ ধসে আসা বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের মধ্যে নিখোঁজ স্বজনদের জীবিত পাওয়ার আশায় থাকা হাজারো পরিবারের একটি ছিল খড়কা পরিবার।
বন্যার আগের রাতেও আয়ুষ স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। এমনকি পরদিন সকালেও তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট ‘অনলাইন’ দেখাচ্ছিল। এতে পরিবারের সদস্যদের মনে আশা জেগেছিল, আয়ুষ হয়তো বেঁচে আছেন।
২৬ আগস্ট ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই স্বজনেরা তার খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। উদ্ধার অভিযানের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র নওয়াকোটের নেপালি সেনাবাহিনীর মৈথালি ব্যারাকের কাছে টানা দুই দিন অপেক্ষা করেন আয়ুষের কাকা গণেশ খড়কা।
গণেশ জানান, কর্মকর্তাদের কাছে আয়ুষের নাম, কর্মস্থল ও সর্বশেষ অবস্থান তিমুরে বলে জানানোর পরও তারা খুব সামান্য তথ্য পেয়েছিলেন।
সালয়ান জেলার বাড়ি থেকে বহু কিলোমিটার দূরে বন্যাদুর্গত তিমুরে শহরে কর্মরত ছিলেন আয়ুষ। তার খোঁজে স্বজনেরা তিমুরে যাওয়ার চেষ্টা করলেও বন্যায় রাস্তাঘাট ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। আবার সব বেসরকারি হেলিকপ্টার সরকার উদ্ধারকাজে অধিগ্রহণ করেছিল।
অন্যদিকে, তিমুরে থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে চিতওয়ানে আয়ুষকে খুঁজছিলেন তার খালা লক্ষ্মী থাপা। সেখানে বানের পানিতে ভেসে আসা মরদেহ উদ্ধার করা হচ্ছিল।
পরিবারের অজান্তেই দুর্যোগের দিন কর্তৃপক্ষ এক তরুণের মরদেহ উদ্ধার করেছিল, যা আয়ুষের বলে ধারণা করা হচ্ছিল। এই দুর্যোগে ইতোমধ্যে সহস্রাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ৪ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
২৭ আগস্ট লক্ষ্মী একটি অস্থায়ী কেন্দ্রে যান। সেখানে শনাক্তকরণের জন্য উদ্ধার হওয়া মরদেহের ছবি টেলিভিশনে দেখানো হচ্ছিল। একটি ছবি দেখে তিনি থমকে যান।
লক্ষ্মী বলেন, ‘আমি প্রায় ৭০ শতাংশ নিশ্চিত ছিলাম যে এটাই সে।’
ছবিটি পাঠানোর পর কাকা গণেশসহ অন্য স্বজনেরা সেটি বিচার-বিশ্লেষণ শুরু করেন। তবে আয়ুষের ভেঙে পড়া মা মুনা খড়কাকে ছবিটি দেওয়া হয়নি। থুতনির বাঁ পাশের তিল, দাড়ি এবং বাঁ হাতে পরা কালো ধর্মীয় ধাগা বা ‘বুটি’ দেখে তারা মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেন। তবু পুরোপুরি নিশ্চিত হতে না পেরে আরও কয়েক দিন খোঁজ চালিয়ে যান।
সালয়ান, কাঠমান্ডু, নওয়াকোট, চিতওয়ান ও দুর্ঘটনাকবলিত সীমান্ত এলাকার মধ্যে দূরত্বের কারণে সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। অনিশ্চয়তা আরও বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে যখন কর্তৃপক্ষ পরিচয়হীন মরদেহগুলোর গণকবর দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকে। দূরবর্তী এলাকার স্বজনেরা পৌঁছানোর আগেই মরদেহগুলো দাফন হয়ে যেতে পারে, এমন আশঙ্কায় ছিলেন তারা।
বন্যার চার দিন পর, ৩০ আগস্ট আয়ুষের দাফন চূড়ান্ত হওয়ার আগে স্বজনেরা তার মাকে মৃত্যুর খবর জানান। পরদিন রাত ১টায় সালয়ান থেকে রওনা দিয়ে সকাল ৮টায় চিতওয়ানে পৌঁছায় পরিবারটি। মরদেহ দেখে দীর্ঘ অনুসন্ধানের করুণ পরিণতি নিশ্চিত করেন তারা।
এর প্রায় এক ঘণ্টা পর নারায়ণী নদীর তীরে আয়ুষের শেষকৃত্যে জড়ো হন প্রায় ৩৫ জন স্বজন। অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে খালা লক্ষ্মী বলেন, ‘যখন তার জন্ম হয়েছিল আমরা খুব খুশি হয়েছিলাম, আর এত কম বয়সে যখন সে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল তখনও সমপরিমাণ আনন্দিত হয়েছিলাম। আর আজ সে আমাদের চোখের জলে ভাসিয়ে চলে গেল।’
সূত্র: রয়টার্স