দীর্ঘ ২৫০ দিন ধূসর রঙের ইস্পাতের যুদ্ধজাহাজে বন্দি জীবন কাটানোর পর থাইল্যান্ডের পাতায়া সৈকতে পা রেখেছেন মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এর প্রায় পাঁচ হাজার সেনা। তবে পাতায়ায় নেমেই সরাসরি কোনও বার বা মদের দোকানে না ছুটে প্রথম কয়েক ঘণ্টা কেনাকাটাতেই মন দিয়েছেন সিংহভাগ নাবিক। হার্ড রক হোটেলের সামনে কেনাকাটার ব্যাগ হাতে ঘুরতে দেখা গেছে তাদের।
সামরিক কাট ছাঁটের চুল, গোঁফ ও নৌবাহিনীর টি-শার্ট পরা এই সেনাসদস্যদের শর্টস ও বিচওয়্যার পরা সাধারণ পর্যটকদের ভিড়ে সহজেই আলাদা করা যাচ্ছিল। তবে রাত বাড়তেই নিয়ন আলো, বিকট শব্দ আর বারগুলোর ঝলকানিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পাতায়া। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে থাইল্যান্ডের পর্যটন ব্যবসা সম্প্রতি মন্দার মুখে পড়েছিল। ফলে দীর্ঘ ৯ মাসের জমে থাকা বেতন নিয়ে আসা আমেরিকান নাবিকদের আগমন স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মুখে নতুন আশার আলো ফুটিয়েছে। শহরের বিখ্যাত ওয়াকিং স্ট্রিট-এর প্রবেশপথে বিশাল আলোকসজ্জিত সাইনবোর্ডে তাদের স্বাগতম জানানো হয়।
নাবিকদের জন্য থাইল্যান্ডের পতিতাবৃত্তি সম্পর্কিত নিষিদ্ধ আইনি বার্তা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলেও মদের জোয়ার থমকে থাকেনি। মধ্যরাতেই অনেক তরুণ নাবিককে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় একে অপরকে ধরে হাঁটতে দেখা যায়। সাউন্ড সিস্টেমের বিকট শব্দের ভিড়ে এক প্রবীণ নাবিক বলেন, সংবাদে বলা হচ্ছে আমরা ৯ মাস ধরে সমুদ্রে আছি। সত্যি বলতে আমি সময়ের হিসাবই হারিয়ে ফেলেছি। জাহাজে আর ভালো লাগছিল না। বহু মানুষের সঙ্গে শেয়ার করে থাকার পর জাহাজটিকে খুব ছোট মনে হতো। নিজ অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়ায় ফিরতে কত দিন লাগবে জানতে চাইলে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘অনেক দিন’।
রেস্তোরাঁ মালিক কোসোল হোমখুনথড জানান, মার্কিন নাবিকদের আগমনে থমকে যাওয়া ব্যবসায় নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে সৈকতে আনন্দঘন পরিবেশে সেনাদের আড্ডা দেখে এক পর্যটক মন্তব্য করেন, সব দিন এমন দৃশ্য দেখা যায় না। তবে কাস্তা সেঙ্কলা নামের এক বার মালিক অভিযোগ করে বলেন, তারা আগের বছরগুলোর মতো টাকা খরচ করছে না, বারে না ঢুকে বেশিরভাগই শুধু হেঁটে বেড়াচ্ছে।
দীর্ঘ অভিযানের কারণে মাঝপথে সেনাদের মনোবল ভেঙে পড়ার খবর জানালেও ২৫ বছর বয়সী নাবিক জাদা ফেয়ারফ্যাক্সের মা শাকাইরা ফেয়ারফ্যাক্স বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সময়টা খুব অনিশ্চিত ও ভীতিপ্রদ ছিল। এখন শুধু মেয়ের মুখে ‘মা’ ডাক শোনার অপেক্ষায় আছি।
ইন্টারনেটে নানা সমালোচনা থাকলেও জাহাজের ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে সেনাসদস্যরা মুখ খোলেননি। সেনাদের শৃঙ্খলা রক্ষা ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য শহরে বিশেষ শোর লিয়াজোঁ গ্রুপ (এসএলজি)-এর সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে। মার্কিন নৌবাহিনীর অ্যাটাশে ক্রিস্টোফার রবিনসন জানান, সেনারা মার্কিন আইন, নৌবাহিনীর নিয়ম এবং থাইল্যান্ডের আইন মেনে চলেই এখানে সময় কাটাচ্ছেন। দীর্ঘ ও কঠিন মিশন শেষে নিজ দেশে ফেরার পথে এই বিরতি সেনাসদস্যদের ক্লান্তি কাটাতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি