থাইল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলীয় একটি জাতীয় উদ্যানের বনাঞ্চলে পাতাহীন নতুন প্রজাতির এক সপুষ্পক উদ্ভিদের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষকদের মতে, নতুন এই উদ্ভিদটি ‘দিসমিয়া’ গণের অন্তর্ভুক্ত, যা ‘ফেরি ল্যান্টার্ন’ বা পরীর প্রদীপ নামেও পরিচিত। এই উদ্ভিদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এদের দেহে কোনও ক্লোরোফিল থাকে না এবং এরা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেয় না। এর পরিবর্তে মাটির তলদেশে থাকা ছত্রাক থেকে এরা খাদ্য তৈরি করে এবং জীবনের প্রায় পুরোটা সময়ই ঝরা পাতার স্তূপের নিচে লুকিয়ে থাকে।
চুলালংকর্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রিন্স অব সংখলা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা থং ফা ভূম জাতীয় উদ্যানে জরিপ চালানোর সময় এই নতুন প্রজাতিটি আবিষ্কার করেন। উদ্ভিদটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,০০০ মিটার উঁচুতে আবিষ্কৃত হয়েছে যা এই প্রজাতির উদ্ভিদের জন্য অস্বাভাবিক রকমের উঁচু ও শুষ্ক একটি পরিবেশ।
প্রিন্স অব সংখলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. সাহুত চান্তানাওরাপিন্ত বলেন, থং ফা ভূম জাতীয় উদ্যানে ‘দিসমিয়া ডেমনের’ বা শয়তান ফুলের সন্ধান পাওয়া সত্যিই একটি বড় বিস্ময় ছিল। সাধারণত দিসমিয়া প্রজাতির উদ্ভিদ সারাবছর আর্দ্র থাকা নিচু ভূমির রেইনফরেস্টে জন্মায়। তবে এই প্রজাতিটির দেখা মিলেছে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,০০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত ঋতুভিত্তিক পার্বত্য চিরহরিৎ বনে।
নতুন এই উদ্ভিদ আবিষ্কার এই গোষ্ঠীর উদ্ভিদের বিস্তৃতি সম্পর্কেও বিজ্ঞানীদের ধারণা বদলে দিয়েছে। দিসমিয়া ডেমন হলো দিসমিয়ার ‘জিওমিত্রা’ শাখার অংশ, যা ইতোপূর্বে কেবল পেনিনসুলার মালয়েশিয়া, বোর্নিও এবং সুমাত্রায় পাওয়া যেত। থাইল্যান্ডে এর সন্ধান পাওয়ার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো এই শাখার ভৌগোলিক সীমা আরও উত্তরের দিকে প্রসারিত হলো।
উদ্ভিদটির এমন চমকপ্রদ নামকরণের কারণ এর অদ্ভুত বাহ্যিক চেহারা। এর ফুলগুলো প্রধানত কালো রঙের, যার গম্বুজাকৃতির ‘মাইটার’ থেকে শিংয়ের মতো অংশ বের হয়ে এসেছে। এছাড়া বোঁটার কাছাকাছি উজ্জ্বল লালচে-কমলা ছোপ রয়েছে, যা দেখতে জ্বলন্ত চোখের মতো, যা উদ্ভিদটিকে এক ধরণের দানবীয় বা দৈত্যের রূপ দেয়।
ড. চান্তানাওরাপিন্ত বলেন, মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা এর রহস্যময় জীবনযাত্রার সাথে মিলিয়ে আমাদের পুরো দল একমত হয়েছে যে, ‘দিসমিয়া ডেমন’ নামটি এর রহস্যময় ও দানবীয় রূপকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন যে, নতুন আবিষ্কৃত এই প্রজাতিটির অস্তিত্ব এখন চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে। তাই সাময়িকভাবে এটিকে ‘গুরুতর বিপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর জবাবে ড. চান্তানাওরাপিন্ত বিশ্বাস করেন, পার্শ্ববর্তী স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণই এই উদ্ভিদ এবং এর সংবেদনশীল বাসস্থান রক্ষায় সহায়তা করতে পারে।
ড. চান্তানাওরাপিন্ত আরও বলেন, আমাদের পরবর্তী প্রধান পদক্ষেপ হলো ইউনেস্কোর ‘ম্যান অ্যান্ড দ্য বায়োস্ফিয়ার’ ধারণার সাথে মিল রেখে একটি টেকসই সংরক্ষণ পদ্ধতি গ্রহণ করা যেখানে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সাথে মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। স্থানীয় মানুষকে তাদের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত হতে অনুপ্রাণিত করা গেলে কেবল এর ক্ষুদ্র আবাস্থলই সংরক্ষিত হবে না, বরং স্থানীয়দের চালিত টেকসই পরিবেশবান্ধব পর্যটনও জোরদার হবে।
সূত্র: উইয়ন নিউজ