ইরানের অতি-সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক কেন্দ্র পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে ‘খুব শিগগির’ হামলা চালানো হতে পারে বলে নতুন করে হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত নাতানজ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের পাশেই এই পাহাড়টির অবস্থান। এই হুমকির মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই খারাগ দ্বীপের কাছে একটি ইরানি তেল ট্যাঙ্কারে চারটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে জানিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যম খবর ফৌরি। উল্লেখ্য খারাগ দ্বীপ ইরানের তেল রফতানির প্রধান কেন্দ্র, যা দেশটির মোট তেল রফতানির প্রায় ৯০ শতাংশ পরিচালনা করে।
শুক্রবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পিকঅ্যাক্স পাহাড়ের ওপর এই আক্রমণের হুমকি দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, পিকঅ্যাক্স এবং পুরো ইরানজুড়ে কাদের আনাগোনা রয়েছে, তার সবই আমেরিকার জানা আছে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যটি মূলত জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে দেওয়া একটি হুমকিরই পুনরাবৃত্তি। সে সময় এক সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, আমরা পিকঅ্যাক্স পাহাড় উড়িয়ে দেব। ইরানিদের প্রস্তুত থাকতে বলুন... আমরা সম্ভবত খুব শিগগির পিকঅ্যাক্সে আঘাত হানব।
আমেরিকা ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার ছয় মাসেরও বেশি সময় পর এই নতুন হুমকি এলো। যদিও সংঘাতের বিষয়বস্তু নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে পরস্পরবিরোধী বার্তা পাওয়া যাচ্ছে।
শুক্রবার ট্রাম্প ইরান যুদ্ধকে একটি ‘ছোটখাটো বিষয়’ হিসেবে অভিহিত করে গুরুত্ব কমানোর চেষ্টা করেছেন। অথচ এর একদিন আগেই হোয়াইট হাউসের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইঙ্গিত দেন যে সংঘাত কিছুটা স্তিমিত হয়েছে। দক্ষিণ ইরানে একটি বিয়েবাড়িতে মার্কিন হামলার অভিযোগকেও তিনি উড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘কখনও কখনও এমন ঘটনা ঘটে যায়’। এমনকি চলতি সপ্তাহে অপর এক ব্রিফিংয়ে ভ্যান্স বলেন, আমি এটিকে যুদ্ধ বলব না এবং এই মুহূর্তে সেখানে সরাসরি কোনও গোলাগুলি চলছে না।
তবে ভ্যান্সের এমন দাবি সত্ত্বেও চলতি সপ্তাহেও আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা অব্যাহত ছিল, যার মধ্যে খার্গ দ্বীপে ইরানের তেল অবকাঠামোর কাছে মার্কিন হামলা অন্যতম। অন্যদিকে মধ্য-আগস্টে ৬০ দিনের আলোচনার মেয়াদ চুক্তি ছাড়া শেষ হওয়ার পর থেকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত আলোচনা স্থগিত হয়ে আছে।
ইরান জানিয়েছে, নাতানজ পারমাণবিক কেন্দ্রে তারা কোনও কাজ করছে না। তবে তাদের খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সামরিক সদর দফতর সতর্ক করে বলেছে, পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে বোমা হামলা পুরো অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করার সামিল হবে।
কী এই পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
ইরানে এটি ‘কোহ-ই কোলং গাজ লা’ নামে পরিচিত। রাজধানী তেহরান থেকে প্রায় ২২০ কিলোমিটার দক্ষিণে ইসফাহান প্রদেশে এবং নাতানজ সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর রিপোর্ট অনুযায়ী, বাঙ্কার ধ্বংসকারী শক্তিশালী বোমার হাত থেকে রক্ষা করতে শত শত মিটার শক্ত গ্রানাইট পাথরের নিচে, পাহাড়ের গভীর অভ্যন্তরে এই কেন্দ্রটি খোদাই করা হয়েছে। এর প্রধান কক্ষগুলো ভূগর্ভস্থ থেকে অন্তত ১০০ মিটার গভীরে অবস্থিত।
কিছু পশ্চিমা বিশ্লেষক ধারণা করছেন, নাতানজ বা অন্যান্য পরিচিত কেন্দ্রে হামলা হলে তার বিকল্প বা সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে এখানে একটি অপ্রকাশিত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল। তবে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সাইটটি পর্যবেক্ষণকারী ‘ইনস্টিটিউট ফর সাইন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি’ জানিয়েছে, এটি এখনও নির্মাণাধীন এবং পুরোপুরি কার্যকর নয়। অন্যদিকে ইরান শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্দেশ্যে এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনও পরিকল্পনা তাদের নেই।
পিকঅ্যাক্স পাহাড় এখনও অক্ষত রয়েছে বলেই এটি ট্রাম্পের নজর কেড়েছে। ২০২৫ সালের জুনে ফোরদো, নাতানজ ও ইসফাহানে মার্কিন হামলার সময় এবং চলমান যুদ্ধেও এই পাহাড়টি প্রায় অক্ষত রয়ে গেছে। যুদ্ধে অন্যান্য সাইটের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উপাদান তৈরি, যন্ত্রাংশ সংযোজন বা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের জন্য তেহরানের পুনর্গঠনের সবচেয়ে সম্ভাব্য স্থান এই টানেলগুলোই।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জুলাই মাসে রিপোর্ট করেছিল যে ইসরায়েল ওয়াশিংটনকে কিছু গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছে, যা ইঙ্গিত করে যে গত বছরের শেষের দিকে হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজ এই কেন্দ্রের ভেতরে সরানো হয়েছিল যদিও আমেরিকা এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোর কতটা ক্ষতি হয়েছে?
বেশিরভাগ হিসেব অনুযায়ী, ইরানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ‘ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস’-এর মতে, ২০২৫ সালের হামলায় নাতানজ এবং ফোরদো কেন্দ্রে চালু থাকা প্রায় ১৮,০০০ সেন্ট্রিফিউজের বেশিরভাগই ধ্বংস হয়ে যায়। তবে ইনস্টল করা কিন্তু অকার্যকর থাকা প্রায় ৪,০০০ সেন্ট্রিফিউজ হয়তো বেঁচে গিয়েছিল।
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির অধ্যাপক নাদের হাশেমি জানান, এই মুহূর্তে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রকৃত অবস্থা ঠিক কী, তা কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না। ধারণা করা হয়, ইরানের কাছে বর্তমানে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে। তবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য সেই ইউরেনিয়ামকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করতে হবে, যার জন্য সেন্ট্রিফিউজ প্রয়োজন। কিন্তু সেই সেন্ট্রিফিউজগুলো কতটা অক্ষত আছে তা অজ্ঞাত।
সব বিতর্ক সত্ত্বেও শুক্রবার ট্রাম্প ফের দাবি করেন যে, আমেরিকা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত রেখেছে। অন্যদিকে তেহরান জোর দিয়ে বলেছে, তাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং পিকঅ্যাক্স পাহাড়কে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটনের এই তোড়জোড় আক্রমণের একটি মনগড়া অজুহাত মাত্র।
সূত্র: আল জাজিরা

‘সব আছে, কিন্তু বাংলা কোথায়?’: পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন ভিডিও নিয়ে ট্রল
‘ইরান যুদ্ধ তুচ্ছ ঘটনা’: পারমাণবিক ঘাঁটি ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে’ হামলার হুমকি ট্রাম্পের
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আমাদের থামাতে পারবে না: ইরান






