গ্রেনফেল টাওয়ার ট্র্যাজেডি

পুলিশের নথিপত্র প্রসিকিউশনে, মৌলভীবাজারের হোসনার পরিবার কি বিচার পাবে?

২০১৭ সালের ভয়াবহ গ্রেনফেল টাওয়ার অগ্নিকাণ্ডের দীর্ঘ ৯ বছর পর অবশেষে অপরাধমূলক তদন্তের পূর্ণাঙ্গ নথি ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিসের (সিপিএস) কাছে হস্তান্তর করেছে যুক্তরাজ্যের মেট্রোপলিটন পুলিশ। তদন্তকারী দল ৫৪ জন ব্যক্তি ও ২০টি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে করপোরেট নরহত্যা, চরম অবহেলাজনিত নরহত্যা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘন এবং জালিয়াতিসহ একাধিক ফৌজদারি অভিযোগ বিবেচনা করার অনুরোধ জানিয়েছে। ব্রিটিশ বিচার বিভাগ নিশ্চিত করেছে যে ২০২৭ সালের জুনে অগ্নিকাণ্ডের দশম বার্ষিকীর আগেই এসব অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে।

পশ্চিম লন্ডনের উত্তর কেনসিংটনের ২৪ তলা বিশিষ্ট ভবনটিতে অগ্নিকাণ্ডে মোট ৭২ জনের প্রাণহানি ঘটে এবং ৭০ জনের বেশি আহত হন। মর্মান্তিক এই ট্র্যাজেডিতে সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে এসেছিল ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের ওপর। ভবনের ১৭ তলার ফ্ল্যাটে একসঙ্গে প্রাণ হারিয়েছিলেন বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার সদর উপজেলার বরইনবাদ গ্রামের এক পরিবারের পাঁচ সদস্য। তাদের মধ্যে ছিলেন, ৮২ বছর বয়সী কমরু মিয়া, তার স্ত্রী রাবেয়া বেগম (৬৪), তাদের দুই ছেলে আব্দুল হামিদ (২৯) ও আব্দুল হানিফ (২৬) এবং সর্বকনিষ্ঠ কন্যা হোসনা বেগম (২২)।

হোসনার বিয়ের দিন নির্ধারিত ছিল ২০১৭ সালের ২৯ জুলাই। বিয়ের শাড়িসহ যাবতীয় কেনাকাটা ও কমিউনিটি হল বুকিং সম্পন্ন হলেও বিয়ের পিঁড়িতে আর বসা হয়নি তার। সেহরি ও ফজরের নামাজের পর যখন আগুন ও বিষাক্ত ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছিল, তখন চাইলে তরুণ ভাইবোনেরা নিচে নেমে জীবন বাঁচাতে পারতেন; কিন্তু অসুস্থ ও বৃদ্ধ মা-বাবাকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ফেলে তারা যেতে চাননি। বাইরে থাকা অন্য এক ভাইয়ের সঙ্গে ফোনে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে হোসনা শেষবার কান্নাজড়িত কণ্ঠে দোয়া চেয়েছিলেন, যাতে মৃত্যুর যন্ত্রণা কিছুটা কম হয়।

মেট্রোপলিটন পুলিশের ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার কেভিন সাউথওয়ার্থ বুধবার জানান, ২২০ জন বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তার একটি দল দীর্ঘ নয় বছর ধরে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ এবং ৭০০ প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা খতিয়ে দেখেছে। তদন্তে প্রায় ১৪ হাজার ৭০০ জনের জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে এবং ১২ হাজার ৬০০ পৃষ্ঠার নথিপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। ক্ল্যাডিং, ইনসুলেশন ও কাঠামোগত যন্ত্রাংশসহ ২৭ হাজারেরও বেশি আলামত সংরক্ষণ করা হয়েছে। এমনকি আদালতের কার্যক্রমে প্রমাণের জন্য দুই মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করে টাওয়ারটির একটি হুবহু রেপ্লিকা তৈরি করা হয়েছে।

সিপিএসের বিশেষ অপরাধ ও সন্ত্রাস দমন বিভাগের প্রধান ফ্রাঙ্ক ফার্গুসন জানিয়েছেন, পুলিশের জমা দেওয়া প্রমাণাদি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করেই অভিযোগ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এর আগে ২০২৪ সালে প্রকাশিত সাবেক বিচারপতি স্যার মার্টিন মুর-বিকের নেতৃত্বাধীন গণতদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, কয়েক দশকের ব্যর্থতা, সরকারি অবহেলা এবং ভবন নির্মাণে ব্যবহৃত উপাদানের প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর চরম অসততার কারণেই এই অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল।

স্বজন হারানোর দীর্ঘ নয় বছর পর লন্ডন থেকে মৌলভীবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এখন বিচারের আশায় প্রহর গুনছে। কেনসিংটন ও বেইজওয়াটারের স্থানীয় ব্রিটিশ এমপি জো পাওয়েল জোর দিয়ে বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো বিচারের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করছে। তাই কালক্ষেপণ না করে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।