ফ্রান্স ও ইতালি থেকে শুরু করে আলবেনিয়া পর্যন্ত ইউরোপের অন্তত নয়টি দেশজুড়ে এক ভয়াবহ সহিংস প্রতিবাদের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে। একই ধরনের ক্ষোভ ও অসন্তোষ নিয়ে বিভিন্ন শহরের বিক্ষোভগুলো সহিংস রূপ নিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ২০১০-১১ সালের আরব বসন্তের সঙ্গে ইউরোপের এই উত্তাল পরিস্থিতির তুলনা করা হচ্ছে, যে গণ-অভ্যুত্থানে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বেশ কয়েকটি স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটেছিল। কিন্তু ইউরোপের রাজপথের এই প্রতিবাদগুলো কি আসলেই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত, নাকি এটি শুধুই এক প্রজন্মগত অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার বহিঃপ্রকাশ?
২০২৬ সালে এসে প্যারিস, মিলান, মাদ্রিদ ও তিরানা থেকে শুরু করে ইউরোপের বড় বড় শহরের তরুণ ও শিক্ষার্থীরা সরকারের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া ব্যয়, মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া আবাসন খরচ, শিক্ষা খাতের বাজেট ছাঁটাই এবং রাজনৈতিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। ফ্রান্স, ইতালি, বেলজিয়াম এবং আলবেনিয়ায় বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। অন্যদিকে স্পেন, পর্তুগাল, গ্রিস, জার্মানি ও অস্ট্রিয়ায় চলছে ধর্মঘট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখল এবং ব্যাপক ছাত্র সংহতি।
বিশেষজ্ঞরা অবশ্য ইউরোপের এই বিক্ষোভকে একটি একক বা সুসংগঠিত বিদ্রোহ হিসেবে দেখতে বারণ করছেন। তাদের মতে, প্রতিটি দেশের ক্ষোভ ও দাবির প্রেক্ষাপট ভিন্ন। স্বৈরাচারী শাসকদের উৎখাতের উদ্দেশ্যে শুরু হওয়া আরব বসন্তের মতো না হয়ে, ইউরোপের এই আন্দোলনগুলো মূলত প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভেতরেই ঘটছে, যেখানে বিক্ষোভকারীরা রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বদলে ফেলার বদলে সুনির্দিষ্ট সংস্কারের দাবি জানাচ্ছেন।
ফ্রান্স থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনের দাবানল
১৬ থেকে ১৮ অক্টোবরের সপ্তাহান্তে ফ্রান্সের রাজপথে লাখ লাখ মানুষ নেমে আসেন, যাকে বলা হচ্ছে এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। প্যারিসসহ বেশ কিছু শহরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ১৭ অক্টোবর ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজের মতে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ মানুষ ১১০টি বিক্ষোভে অংশ নেন, যদিও আয়োজকদের দাবি ছিল এই সংখ্যা ৮ লাখ। লিমোজেস ও মার্সেইতেও সহিংসতা ছড়ায় এবং প্রায় ৪০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এই ‘অনিয়ন্ত্রিত’ সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রশ্ন তোলেন, ফরাসি জনগণ কীভাবে ফ্রান্সের সঙ্গে এমনটি করতে পারে? অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিবাসীদের ওপর দায় চাপিয়ে বলেন, এটি কোনও স্কুল নিয়ে সমস্যা নয়, এটি একসময়ের দুর্দান্ত দেশকে ইসলামের দখল করে নেওয়ার চেষ্টা! ফরাসি উগ্র-ডানপন্থিদের নেতা মারিন ল্য পেনও অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনকে এর জন্য দায়ী করেন।
এইচইসি প্যারিসের ইউরোপীয় ইউনিয়ন আইন ও নীতির অধ্যাপক আলবার্তো আলেমান্নো বলেন, ফ্রান্স এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু এবং এটি এখন ফ্রান্সের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, এগুলো পৃথক আন্দোলন হলেও শিক্ষা খাতে বাজেটের অভাব, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অনিশ্চিত কর্মসংস্থানের মতো কিছু জায়গায় সবার ক্ষোভ একই।
অন্যদিকে, মার্কিন-কুয়েতি সাংবাদিক আহমেদ এলদিন মনে করেন, ইউরোপের এই বিক্ষোভের সঙ্গে আরব বসন্তের গভীর মিল রয়েছে। যুবসমাজ মূলত অর্থনৈতিক সংকট ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে এলিট শ্রেণির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। ভারতীয়-আমেরিকান কংগ্রেসসম্যান রো খান্না মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মন্তব্যের বিরোধিতা করে বলেন, রাজপথের এই ক্ষোভের মূল কারণ বৈষম্য। ভ্যান্স সহিংসতাকে অভিবাসীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু রো খান্না এক্স-এ লিখেছেন, প্যারিসের হাইস্কুল থেকে মাদ্রিদের রাজপথ বা তিরানার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত তরুণরা একই কথা বলছে: ব্যাপক অর্থনৈতিক বৈষম্যের যুগে তারা একটি বিশ্বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ চায়।
ইতালি, বেলজিয়াম ও আলবেনিয়ার সহিংস রূপ
ইতালিতে ১৬ অক্টোবর ‘নো মেলোনি ডে’ পালনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা খাতের বাজেট হ্রাস ও ক্লাসরুমে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশে সীমিত করার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায়। রোম ও তুরিনে শিক্ষার্থীরা ফরাসিদের মতো স্কুল দখল করে এবং স্লোগান তোলে, স্কুলে কেউ বিদেশি নয়। ১৭ অক্টোবর মিলানে মাস্ক পরা বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ে এবং ব্যারিকেডে আগুন দেয়।
বেলজিয়ামে শিক্ষা খাতের বাজেট ছাঁটাই ও অতিরিক্ত ফি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলাকালীন লিয়েজ শহরে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। বেলজিয়ামের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নার্ড কুইন্টিন এই ঘটনাগুলোকে বিশুদ্ধ সহিংসতা বলে অভিহিত করেছেন।
আলবেনিয়ায় বিক্ষোভের রূপটি কিছুটা ভিন্ন ও রাজনৈতিক। সেখানে অর্থকষ্টের চেয়েও সরকারের দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং প্রধানমন্ত্রী এদি রামাজ পদত্যাগের দাবিই মুখ্য। ১৭ অক্টোবর তিরানায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনে হাজার হাজার তরুণ বিক্ষোভ দেখায়। সেখানে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের একটি বিতর্কিত উপকূলীয় উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। আন্দোলনকারীরা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করলেও এদি রামা পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে অভিযোগ করেছেন, বিরোধীরা অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে আন্দোলনকে ব্যবহার করছে।
আবাসন সংকট ও অন্যান্য দেশের প্রতিবাদ
স্পেন ও পর্তুগালে তরুণদের প্রধান ক্ষোভ আবাসন সংকট নিয়ে। স্পেনে ৮৭ বছর বয়সী মারিকোরমেন আব্যাসকালকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের পর তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোস্ট্যাটের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপের ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের ২৬.৯ শতাংশ বা চারজনের মধ্যে একজন অপরিসর ও গাদাগাদি করা বাড়ৈতে বাস করতে বাধ্য হন। পর্তুগালের লিসবন ও পর্তোতে উচ্চ বাড়িভাড়া ও কম বেতনের বিরুদ্ধে বিশাল বিক্ষোভ হয়। ১৪ অক্টোবর রাতে পর্তোতে বিক্ষোভকারীদের তাঁবু তোলার সময় পুলিশের লাঠিচার্জে ৩৭ জন আহত হন, যার তদন্ত দাবি করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
এ ছাড়া জার্মানির বার্লিনে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে এবং ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের সমর্থনে আন্দোলন চলছে। অস্ট্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ছাঁটাই এবং গ্রিসে আবাসন সংকট ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা সোচ্চার হয়েছেন।
ইউরোপের জন্য এটি কি সত্যিই ‘আরব বসন্ত’?
সাংবাদিক আহমেদ এলদিন তার নিবন্ধে ইউরোপের পরিস্থিতিকে ২০১১ সালের আরব বসন্তের সঙ্গে তুলনা করে সতর্ক করেছেন, বিদ্রোহ দমানোর জন্য ইউরোপীয় সরকারগুলোর কাছে ট্যাংকের চেয়েও নিরবচ্ছিন্ন কিছু উপায় রয়েছে।
উদ্যোক্তা হ্যারি হালপিন এবং পডকাস্টার পিটার ম্যাককরম্যাকও একমত হয়ে বলেছেন যে, আমলাতন্ত্র, মূল্যস্ফীতি এবং জেন-জি’র ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ বিশ্বজুড়ে এমন আন্দোলনের জন্ম দিচ্ছে।
২০২৬ সালের জুনে ডাচ টিইউআই ফাউন্ডেশনের ৮ হাজার ২৪ জন ইউরোপীয় তরুণের ওপর করা এক জরিপে দেখা গেছে, ৫২ শতাংশ তরুণ বিশ্বাস করেন তাদের ভবিষ্যৎ তাদের বাবা-মায়ের প্রজন্মের চেয়েও খারাপ হবে। মাত্র ২৫ শতাংশ ভালো ভবিষ্যতের আশা করেন।
তবে আপাতত ইউরোপের এই বিক্ষোভকে পুরোপুরি ‘আরব বসন্ত’ বলা যায় না। কারণ ২০১১ সালের স্বৈরাচারী ব্যবস্থার মতো নয়, ইউরোপের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরেই ভোটের মাধ্যমে সরকার ও নীতি পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, রাজপথের ক্ষুব্ধ তরুণরা কি কেবল ব্যবস্থার ভেতরের সেই সংস্কারে সন্তুষ্ট হবেন?
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে