আইএলআর নীতিমালায় বড় পরিবর্তন: ১০ বছরের শর্তে বিপাকে হাজারো বাংলাদেশি পরিবার

যুক্তরাজ্যের স্থায়ী বসবাস বা ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেন (আইএলআর)-এর নিয়মকানুন ও ইনকাম থ্রেশহোল্ডে যুগান্তকারী ও কঠোর পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ। হাউস অব কমন্সে পেশ করা সরকারের নতুন ‘আর্নড সেটলমেন্ট’ কাঠামোর ফলে বৈধভাবে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত প্রায় ৫ লাখ অভিবাসীর স্থায়ীভাবে বসবাসের পথ দীর্ঘায়িত হতে চলেছে। বিশেষ করে স্কিলড ওয়ার্কার ও বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হাজার হাজার বাংলাদেশি অভিবাসী ও তাদের পরিবার এর ফলে মারাত্মক অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আকস্মিক এই নীতিমালার ফলে বহু অভিবাসী দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বেন। সরকারের পক্ষ থেকে একে ন্যায্য ও সুশৃঙ্খল অভিবাসন নীতি হিসেবে দাবি করা হলেও অভিবাসী সংগঠনগুলো এর বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আইনি লড়াইয়ে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

১০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি শর্ত ও কিছু ক্ষেত্রে ছাড় নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য ডিফল্ট কোয়ালিফাইং সময়সীমা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে সরাসরি ১০ বছর করা হয়েছে। এতদিন ৫ বছর পূর্ণ হলেই নির্দিষ্ট শর্তে সেটলমেন্টের আবেদন করা যেত।

তবে সরকার উচ্চ আয় এবং বিশেষ কিছু পেশার জন্য কিছু ছাড় রেখেছে। যাদের বার্ষিক আয় ১ লাখ ২৫ হাজার ১৪১ পাউন্ডের বেশি কিংবা যারা গ্লোবাল ট্যালেন্ট বা ইনোভেটর ফাউন্ডার রুটে আছেন, তারা ৩ বছরের মাথায় স্থায়ী বসবাসের আবেদন করতে পারবেন।

অন্যদিকে, উচ্চ করদাতা (যাদের আয় ৫০ হাজার ২৭৬ পাউন্ডের বেশি) এবং এনএইচএস-এর ডাক্তার, নার্স ও শিক্ষকসহ নির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক সেক্টর পেশাজীবীরা ৫ বছরের পথেই সেটলমেন্টের সুবিধা পাবেন। তবে এই ক্যাটাগরিগুলোর বাইরে থাকা সাধারণ দক্ষ কর্মীরা এই ছাড়ের আওতাধীন না থাকায় তাদের ১০ বছর অপেক্ষা করতে হবে।

প্রাথমিকভাবে কেয়ার ওয়ার্কারদের স্থায়ী হওয়ার মেয়াদ ১৫ বছর করার প্রস্তাব করা হলেও সমালোচনার মুখে তাতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। বার্ষিক কমপক্ষে ২৫ হাজার পাউন্ড আয়ের শর্ত পূরণ সাপেক্ষে কেয়ার ওয়ার্কাররা ৫ বছরের পুরনো পথেই স্থায়ী বসবাস পেতে পারবেন। তবে কেয়ার সেক্টরের বাইরের অন্যান্য খাতের হাজার হাজার অভিবাসী কর্মীর জন্য এই ছাড় প্রযোজ্য নয়।

আইনি সতর্কতা ও অভিবাসীদের ওপর আর্থিক চাপ এই নিয়মের ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিবাসী অধিকারকর্মী ও পাবলিক ল’ ব্যারিস্টাররা। ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আশায় যুক্তরাজ্যে আসা অভিবাসীরা এখন বিপাকে পড়েছেন। ৫ বছরের জায়গায় ১০ বছর অপেক্ষা করতে হওয়ায় পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত ভিসা ফি, প্রতি বছর ইমিগ্রেশন হেলথ সারচার্জ এবং নবায়ন বাবদ হাজার হাজার পাউন্ড গচ্চা দিতে হবে। চার সদস্যের একটি পরিবারের ক্ষেত্রে এই বর্ধিত প্রক্রিয়া ও ফি মেটাতে গিয়ে ২৫ হাজার পাউন্ডের বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। এছাড়া ইংরেজি ভাষার মানদণ্ড আরও কঠোর করা হয়েছে এবং স্বেচ্ছাসেবা বা ভলান্টিয়ার কাজের মাধ্যমে সময় কমিয়ে আনার সুযোগ পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে।

বাংলাদেশি কমিউনিটি ও দক্ষ কর্মীদের ওপর প্রভাব যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসীদের একটি বড় অংশ কেয়ার ওয়ার্কার, বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য স্কিলড ওয়ার্কার ভিসায় অবস্থান করছেন।

ব্যারিস্টার সালাহ উদ্দীন সুমন বলেন, কেয়ার সেক্টরের বাইরে থাকা সাধারণ স্কিলড পেশাজীবী ও গ্র্যাজুয়েট রুট থেকে ওয়ার্ক পারমিটে যাওয়া অভিবাসীরা এই ১০ বছরের বেড়াজালে আটকে গেছেন। বহু পরিবার যারা স্থায়ীভাবে শিকড় গাড়ার স্বপ্ন দেখছিলেন এবং যাদের ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছিল, তাদের মেয়াদ এখন হঠাৎ করেই দীর্ঘায়িত হওয়ায় মানসিক ও অর্থনৈতিক উভয় চাপই বহুগুণ বেড়ে গেছে।