ইরানের টিকে থাকাই কি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের পরাজয়?

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ গড়িয়েছে চতুর্থ সপ্তাহে। এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে এখন এক নতুন বিতর্ক দানা বাঁধছে। একদিকে হোয়াইট হাউসের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের দাবি, অন্যদিকে তেহরানের ‘টিকে থাকার’ রণকৌশল। কিন্তু খোদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকরাই এখন প্রশ্ন তুলছেন যে, মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ কি ওয়াশিংটনকে আরেকটি ভিয়েতনাম বা ইরাকের মতো বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে?

নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সম্পাদকীয় বোর্ড এক নিবন্ধে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে বলেছে, যুদ্ধ নিয়ে মিথ্যা বলা জয়কে আরও কঠিন করে তোলে। ইতিহাস সাক্ষী, ইরাক ও ভিয়েতনাম যুদ্ধে সত্যকে এড়িয়ে যাওয়ার চরম মূল্য দিতে হয়েছিল মার্কিনিদের। বর্তমান যুদ্ধ শুরুর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টাদের সতর্কতা কানে তোলেননি। উপদেষ্টারা জানিয়েছিলেন, ইরান চাইলে হরমজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে; কিন্তু অতি-আত্মবিশ্বাসী ট্রাম্প সেই শঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছিলেন। এখন বিশ্ব অর্থনীতি সেই ভুলের মাশুল দিচ্ছে।

নিবন্ধে সতর্ক করে বলা হয়েছে, লিন্ডন জনসন বা জর্জ ডব্লিউ বুশের মতো ট্রাম্পকেও হয়তো একদিন যুদ্ধ নিয়ে মিথ্যার জন্য ব্যক্তিগত মূল্য দিতে হবে। কারণ, যুদ্ধের মতো গুরুতর সিদ্ধান্ত বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া উচিত, বিশেষ করে যখন হাজার হাজার সেনার জীবন এর সঙ্গে জড়িত।

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ত্রাস ছড়াচ্ছে ইরানি ড্রোন। ফাইল ছবি: এপি

ইস্তাম্বুল জাইম ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইসলাম অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স-এর পরিচালক সামি আল-আরিয়ান মনে করেন, এই যুদ্ধে দুই পক্ষের লক্ষ্য সম্পূর্ণ বিপরীত এবং এই অসামঞ্জস্যই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার মূল কারণ।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে জায়নবাদী আধিপত্যের পথে বাধা হিসেবে পরিচিত ইরানকে পুরোপুরি নির্মূল করা। এর জন্য হয় ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার পতন ঘটাতে হবে, না হয় অঞ্চলজুড়ে তাদের প্রভাব শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে।

এর বিপরীতে ইরানের লক্ষ্য অত্যন্ত সহজ। আল-আরিয়ান বলেন, “ইরানকে সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করতে হবে না, কিংবা ইসরায়েলের সরকারকে এই মুহূর্তে ক্ষমতাচ্যুত করারও প্রয়োজন নেই। ইরানের শুধু ‘টিকে থাকা’ প্রয়োজন।” যদি ইরানি রাষ্ট্র কাঠামো অক্ষত থাকে এবং তাদের আঞ্চলিক জোটগুলো সক্রিয় থাকে, তবেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অক্ষশক্তির মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। কৌশলগতভাবে যার লক্ষ্য যত সহজ, জয়ের সম্ভাবনা তার তত বেশি।

যুদ্ধের কৌশলেও দুই পক্ষের মধ্যে বিস্তর ফারাক দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আকাশপথের আধিপত্যে বিশ্বাসী। তারা মনে করে, বিধ্বংসী বোমা হামলা এবং শীর্ষ নেতাদের হত্যার মাধ্যমে শত্রুকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা যাবে।

ইরানে ভূ-গর্ভস্থ মিসাইল সিটি। ফাইল ছবি

অন্যদিকে ইরান বেছে নিয়েছে টিকে থাকার জন্য উত্তেজনার বিস্তৃতি। তারা সরাসরি আমেরিকার আকাশশক্তির মোকাবিলা না করে যুদ্ধের ময়দানকে ভৌগোলিকভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে। ইসরায়েলের ভেতরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে চাপ সৃষ্টি এবং জ্বালানি বাজার ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার মাধ্যমে তারা এই সংঘাতকে একটি আঞ্চলিক সংকটে রূপান্তর করছে। পেন্টাগন ইরানের আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও অঞ্চলের সামগ্রিক কৌশলগত ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান সেথ জি জোনস মনে করেন, এই যুদ্ধ মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। জাপানে বা ফিলিপাইনে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো এখন ইরানের মতো অন্যান্য প্রতিপক্ষের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে।

সামি আল-আরিয়ান আরও সতর্ক করে বলেছেন, এক অঞ্চলের সংকট অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগর বা তাইওয়ান প্রণালিতে কোনও ভুল পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুনের সঙ্গে মিশে গিয়ে বিশ্বজুড়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

এই ধরনের সংঘাত সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে শেষ হয় না; বরং একপক্ষ যখন বুঝতে পারে যে তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করা অসম্ভব, তখনই এর সমাপ্তি ঘটে। আল-আরিয়ান বলেছেন, “ইরান যদি টিকে থাকে, তবেই তাদের জয়। ইসরায়েল হয়তো প্রমাণ করবে যে তারা ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু তারা কাউকে আত্মসমর্পণ করাতে পারে না।”

সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, মিডল ইস্ট আই