ফিলিস্তিনি নারীদের হাতে নম্বর লিখে দিচ্ছে ইসরায়েলি সেনারা

ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেনিন শরণার্থী শিবিরে চলমান অভিযানের সময় ডজনখানেক ফিলিস্তিনি নারীর হাতে নম্বর লিখে চিহ্নিত করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। গত সোমবার এ ঘটনা ঘটে। কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার অধীনে মাত্র ১২০ জন নারীকে তাদের ঘরবাড়ি পরিদর্শন এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহের জন্য শিবিরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তখনই তাদের সঙ্গে এই আচরণ করা হয়। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এ খবর জানিয়েছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে উত্তর পশ্চিম তীরে শুরু হওয়া সামরিক অভিযানের পর জেনিন ও অন্যান্য শিবির থেকে প্রায় ৪০ হাজার ফিলিস্তিনিকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। বর্তমানে শিবিরের একটি বড় অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং অনেক এলাকা এখনও দুর্ভেদ্য। সেখানে স্থায়ীভাবে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

সোমবার যে নারীদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তারা দুই ঘণ্টারও কম সময় সেখানে থাকার সুযোগ পান। এই সময়ের সিংহভাগই ব্যয় হয়েছে তল্লাশি এবং ভারী সামরিক নজরদারিতে নির্দিষ্ট পথ দিয়ে হাঁটার অপেক্ষায়। শিবিরে প্রবেশের আগে তল্লাশির সময় সেনাদের হাতে থাকা কলম দিয়ে নারীদের হাতে বিভিন্ন নম্বর ও অক্ষর লিখে দেওয়া হয়।

উম্মে ফাদি ওয়াহদান নামের এক নারী বলেন, ‘আমাদের বাড়ি কোন এলাকায়, সেই অনুযায়ী তারা আমাদের হাতে নম্বর লিখে দিয়েছিল।’ তিনি আরও জানান, সকালে প্রবেশের খবর পেয়ে তারা পৌঁছালেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা তল্লাশি ও হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। তপ্ত রোদে প্রায় তিন ঘণ্টা তাদের দাঁড়িয়ে রাখা হয়। এমনকি সেনারা ইচ্ছে করে মহল্লার চিহ্ন বদলে দিয়ে তাদের প্রবেশে দেরি করিয়ে দেয়।

শিবিরে প্রবেশের পর ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতা দেখে অনেক নারীই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তারা নিজের এলাকা বা বাড়ি পর্যন্ত চিনতে পারছিলেন না। রাস্তাঘাট ধ্বংস হয়ে গেছে এবং চারদিকে নোংরা আবর্জনা ও পয়োনিষ্কাশনের বর্জ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।

ওয়াহদান আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমি পাড়ায় গিয়ে দেখি আমার পাঁচতলা বাড়িটি সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। ৩০ জন মানুষ সেখানে থাকতাম, কিন্তু ছাই ছাড়া কিছুই খুঁজে পাইনি। মনে হচ্ছিল কেন এখানে এলাম! এই সফর আমাদের পুরোনো ক্ষতকে আবারও জাগিয়ে দিয়েছে।’

ওয়াহদানের জন্য এই শোক আরও গভীর। কারণ ২০২৪ সালের আগস্টে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তার ছেলে সাঈদ নিহত হন। তার আরও এক ছেলে দীর্ঘ সাত বছর ধরে ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি।

জেনিন শরণার্থী শিবিরে নারীদের লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখে ইসরায়েলি সেনারা। ছবি: মিডল ইস্ট আই

বিবস্ত্র করে তল্লাশি

৬০ বছর বয়সী আবির আল-সাব্বাগ জানান, শিবিরে প্রবেশের আগে নারী সেনারা তাদের বিবস্ত্র করে তল্লাশি চালায়। তিনি এই অভিজ্ঞতাকে চূড়ান্ত অবমাননাকর ও মানসিকভাবে কষ্টদায়ক বলে বর্ণনা করেন।

সাব্বাগ বলেন, ‘যখন জানতে পারলাম বিবস্ত্র করে তল্লাশি করা হবে, আমি নারী সেনাকে বলেছিলাম যে আমি ফিরে যেতে চাই, আমার আর দেখার দরকার নেই। কিন্তু সে জবাব দিলো, তুমি ফিরে যেতে চাইলেও তোমাকে এই তল্লাশির মধ্য দিয়েই যেতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটি অত্যন্ত অশালীন ছিল। আমাদের সঙ্গে ২০ বছরের তরুণীরাও ছিল। আমরা জানি না সেখানে কোনও লুকানো ক্যামেরা ছিল কিনা।’

শিবিরের প্রবেশমুখের একটি বাড়ি দখল করে সেনারা সেটি সামরিক চৌকিতে রূপান্তর করেছে এবং সেখানেই এই তল্লাশি চালানো হয়। সাব্বাগের নিজের বাড়িটিও ২০২৩ সালে ইসরায়েলি বোমা হামলায় ধ্বংস হয়েছিল, যেখানে তিনজন নিহত হন। সেদিন অসুস্থ বৃদ্ধা মাকে নিয়ে তিনি পালিয়ে গিয়েছিলেন। পরে তিনি নিজ বাড়ি থেকে দূরে থাকা অবস্থায় মারা যান।

সাব্বাগ বলেন, ‘পুরো শিবিরে এখন আর একটি বাড়িও মানুষের বসবাসের যোগ্য নেই।’