সৌদি-হুথি পাল্টাপাল্টি হামলায় নতুন রণক্ষেত্র লোহিত সাগর

লোহিত সাগর উপকূলবর্তী সৌদি আরবের দুটি বন্দরের তেল স্থাপনায় শনিবার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। এর জবাবে হুথিদের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি সমর্থিত বাহিনীগুলো। এর মধ্য দিয়ে পারস্য উপসাগরে শুরু হওয়া যুদ্ধ এবার বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় একটি  রণক্ষেত্রে রূপ নিলো।

হুথি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানিয়েছেন, জিযান ও ইয়ানবু বন্দরে অবস্থিত সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে তারা সফলভাবে হামলা চালিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এবং ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স দ্বারা যাচাইকৃত ভিডিওতে দেখা গেছে, জিযানে অবস্থিত আরামকো শোধনাগারের দিক থেকে ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী উঠছে।

এশিয়ায় দুটি বাণিজ্যিক সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, জিযানে জ্বালানি ও তেল মজুত রাখার স্থানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাব্য তথ্যের কথা তাদের জানানো হয়েছে। তবে আরামকো কর্তৃপক্ষ এ ঘটনা নিয়ে কোনও মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

অন্যদিকে গ্রিক নিরাপত্তাসূত্র রয়টার্সকে জানায়, ইয়ানবু বন্দরে তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করেছে গ্রিসের সামরিক বাহিনী। রিয়াদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী সৌদিতে পরিচালিত মার্কিন তৈরি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে এ হামলা ব্যর্থ করে দেওয়া হয়।

ইয়ানবু সৌদি আরবের প্রধান লোহিত সাগরীয় তেল বন্দর, যেখান থেকে দিনে লাখ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়। হরমুজ প্রণালি ইরান কর্তৃক অবরুদ্ধ হওয়ার পর এটি সৌদি তেলের মূল বিকল্প পথ হয়ে উঠেছে। আর ইয়েমেন সীমান্তসংলগ্ন জিযানে দৈনিক ৪ লাখ ব্যারেল সক্ষমতার একটি তেল শোধনাগার রয়েছে।

ইয়েমেনের প্রশাসনিক তথ্য উল্লেখ করে কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, সৌদির নেতৃত্বাধীন ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সরকারের বিমানবাহিনী মারিব ও আল-জাউফ প্রদেশে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং অস্ত্রাগারে বিমান হামলা চালিয়েছে।

এর আগে লোহিত সাগর উপকূলবর্তী হুথি নিয়ন্ত্রিত হোদেইদাহ বন্দরের সামরিক অবস্থানগুলোতে শুক্রবার বোমা হামলা চালায় সৌদি জোট। ইয়েমেনি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গৃহযুদ্ধের দুই পক্ষই এখন যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা ও সামরিক শক্তি জোরদার করছে।

ইয়েমেনের রাজধানী সানা এবং উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলীয় লোহিত সাগর উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা ইরান সমর্থিত হুথিরা দখল করে নেওয়ার পর এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন আরব জোট। লড়াই ও দুর্ভিক্ষের কারণে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটা এই গৃহযুদ্ধে ২০২২ সাল থেকে যুদ্ধবিরতি থাকলেও চলতি মাসে তা ভেঙে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর হুথিরা মূলত তাদের ইরানি মিত্রদের শুরু করা এই বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধে যোগ দিয়েছে।

গত সপ্তাহে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে হুথি নেতা আব্দুল মালেক আল-হুথি জানান, রিয়াদ এই সংঘাতে যুক্ত হলে সৌদির সব তেল স্থাপনায় আঘাত হানা হবে। এই পদক্ষেপের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের বিঘ্ন আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা বিগত কয়েক দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু-হু করে বাড়িয়ে দিয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার লোহিত সাগরে দুটি সৌদি তেল ট্যাঙ্কারে হুথিরা হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করার পর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার তেহরান ও হুথিদের বিরুদ্ধে ‘কঠোর সামরিক শাস্তি’র হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

সৌদি জোট জানিয়েছে, তাদের জাহাজ ও সৌদি স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ অব্যাহত রাখা হবে এবং হুথিরা শত্রুভাবাপন্ন আচরণ বজায় রাখলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।