কী, কেন, কীভাবে

হরমুজের নিয়ন্ত্রণই কি ইরানের ‘বিজয়ের চাবিকাঠি’

হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে রেখে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের শর্ত মানতে বাধ্য করার কৌশল নিয়েছে ইরান। দেশটির নেতৃত্বের ধারণা, সামরিক চাপ অব্যাহত রাখলে শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে বাধ্য হবে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের মতে, সময়ও এখন তাদের পক্ষেই। কৌশলটির পেছনে ইরানের যুক্তি হলো- যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অস্ত্র, বিশেষ করে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার মজুত কমছে। একই সঙ্গে যুদ্ধটি মার্কিন জনগণের কাছে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালি অনেকাংশে বন্ধ থাকলে গ্যাস ও অন্যান্য পণ্যের দামও উচ্চ থাকবে, যা নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মার্কিন কংগ্রেস নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়াতে পারে।

ইরানের হিসাব অনুযায়ী, জোর করে হরমুজ খুলতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের ব্যয় করতে হবে এবং সেখানে মার্কিন স্থলবাহিনীও পাঠানোর প্রয়োজন হতে পারে। ইয়েমেনে ইরানের মিত্র হুথিরাও যুদ্ধ আরও বিস্তৃত করে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। এসব বিবেচনায় ট্রাম্পের সামনে শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করা ছাড়া কোনও পথ থাকবে না এমনটাই মনে করছে ইরান।

তবে ইরানের এই কৌশল ঝুঁকিমুক্ত নয়। যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়লেও ইরানেই এর আঘাত সবচেয়ে তীব্র। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটির শিল্পভিত্তি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কিন অবরোধে দেশটির তেল রফতানির বড় অংশ বন্ধ হয়ে গেছে। ইরানিরা তিন অঙ্কের খাদ্য মূল্যস্ফীতির সঙ্গে লড়ছেন। এ ছাড়া বেসামরিক অবকাঠামো, যেমন পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় ধরনের হামলার হুমকিও বারবার দিয়েছেন ট্রাম্প।

ইরানের মধ্যপন্থি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ঘনিষ্ঠ অনেকেই আশঙ্কা করছেন, দেশটি হয়তো অতিরিক্ত ঝুঁকি নিচ্ছে।

২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাভাদ জারিফ সম্প্রতি এক নিবন্ধে লিখেছেন, যুদ্ধে ইরানের অর্জন কূটনীতির জন্য ‘ব্যতিক্রমী সুযোগ’ তৈরি করেছে। তবে দ্রুত কোনও চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে উঠবে এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বা নতুন করে আগ্রাসনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না, বিশেষ করে মার্কিন নির্বাচনের পর।

ইরান বলছে, ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে তারা। দুই দেশের মধ্যবর্তী এই জলপথ পরিচালনার বিষয়ে চুক্তিটি কার্যকর হতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে অবরোধ তুলে নিতে হবে। ফলে সরাসরি কোনও আলোচনা না হলেও, ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তির অনুমোদন দিতে হবে ট্রাম্পকেই। চুক্তিতে ইরানকে কোনও ধরনের ফি আদায়ের সুযোগ দেওয়া হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে এটি কার্যকর হলে যুদ্ধের আগে আন্তর্জাতিকভাবে উন্মুক্ত থাকা একটি জলপথের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ আনুষ্ঠানিক রূপ পাবে। 

তেহরানের একসময়কার প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের উপদেষ্টা আবদোলরেজা দাভারি বলেন, হরমুজের ওপর ইরানের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনায় তাদের প্রভাব বাড়িয়েছে এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সুবিধা দিয়েছে। তিনি বলেন, হরমুজ থেকে রাজস্ব আয়ের চেয়ে ইরানের কাছে প্রণালিটির ব্যবস্থাপনা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রণালিটির অন্তত একটি অংশের ওপর আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ইরানের জন্য বড় বিজয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরাজয় হিসেবে দেখা হবে। কারণ যুদ্ধের বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যগুলোর কিছু এখনও অর্জিত হয়নি। 

ট্রাম্পের ভূরাজনৈতিক তত্ত্বের ভাষা ধার করে বলা যায়, ইরানের বিশ্বাস- তাদের হাতেই এখন তাস। ইরানের প্রধান আলোচকের উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, যুদ্ধ শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, কিন্তু এর সমাপ্তি কখন হবে তা তাদের হাতে ছিল না। ইরান নিজেই ঠিক করবে কখন যুদ্ধ শেষ হবে। তিনি জানান, ইরান কোনও চুক্তির জন্য নয়, শত্রুর পরাজয়ের জন্য এগোচ্ছে।

তিনি আরও দাবি করেন, জুলাইয়ে জর্ডানে ইরানের আকস্মিক হামলা তেলের দাম কমে যাওয়ার প্রভাব ‘পুষিয়ে দিয়েছে’। এর ফলে জুনে হওয়া একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি ভেঙে পড়ে। ওই চুক্তিতে ইরানকে উল্লেখযোগ্য কিছু ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। এর মধ্যে ছিল আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় এবং আরও ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের প্রতিশ্রুতি।

ইরান বারবার বলেছে, হরমুজ প্রণালি আর আগের মতো উন্মুক্ত জলপথে ফিরে যাবে না। তাদের অনুমতি ছাড়া প্রণালি দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করা জাহাজে হামলা অব্যাহত রাখারও হুমকি দিয়েছে তারা। ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড একে ‘লাল রেখা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

তেহরানভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মোস্তফা নাজাফি বলেন, ইরানের কাছে হরমুজ প্রণালি এখন প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখা এবং পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তাব্যবস্থার নিয়ম নতুন করে সাজানোর কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এটি যুদ্ধ শেষ করার পথে বড় বাধা তৈরি করছে। একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিল বিরোধের সমাধানও কঠিন করে তুলছে।

ইরানভিত্তিক বিশ্লেষক রহমান ঘাহরেমানপুর বলেন, হরমুজের সংঘাতের কারণে পারমাণবিক ইস্যুটি এখন কিছুটা আড়ালে চলে গেছে, যা বাস্তবে ইরানের স্বার্থেই যাচ্ছে। তার মতে, প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পারমাণবিক আলোচনা আবার শুরু হলে ইরানকে বাড়তি দর-কষাকষির ক্ষমতা দেবে।

তবে এই কৌশল উল্টো ফলও দিতে পারে। ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতারও সীমা রয়েছে এবং অর্থনৈতিক ধস নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। ঘাহরেমানপুর বলেন, ইরান চিরকাল এই কৌশল চালিয়ে যেতে পারবে না। একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের চুক্তিতে পৌঁছাতেই হবে।

সূত্র: গালফ নিউজ