শৈবালের ‘দখলে’ ইসরায়েলের পাঁচটি পানি শোধনাগার

ভূমধ্যসাগরে মাইলের পর মাইলজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ক্ষুদ্র শৈবালের স্তর ইসরায়েলের পাঁচটি বড় লবণাক্ত পানি শোধনাগার সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। এতে দেশটির প্রধান পানীয় জলের উৎস নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইসরায়েলের জাতীয় পানি কোম্পানি মেকোরোট জানিয়েছে, রবিবার দেশটির উপকূলীয় ছয়টি শোধনাগারের মধ্যে পাঁচটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে কয়েকটি আংশিকভাবে চালু হলেও বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মাত্র একটি পূর্ণ সক্ষমতায় চলছিল।

মেকোরোটের মুখপাত্র লিওর গুটম্যান বলেন, ‘ইসরায়েলে এ ধরনের ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। এটি অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা।’ তবে তিনি জানান, প্রায় ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রে পানীয় জলের ঘাটতি হয়নি।

ইসরায়েলের পানীয় জলের অন্তত ৬৫ শতাংশ আসে সমুদ্রের পানি শোধন করে। দেশটি শুষ্ক হওয়ায় বড় নদী বা পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত নেই। ফলে লবণাক্ত পানি শোধন প্রযুক্তির ওপর দেশটির নির্ভরতা অনেক বেশি।

বেন-গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি গবেষণার সহযোগী অধ্যাপক এদো বার-জিভ বলেন, সপ্তাহান্তে ইসরায়েলের উপকূলজুড়ে ‘দূষিত পদার্থের একটি বিচ্ছিন্ন ও বিশাল ঘটনা’ দেখা যায়। পরে গবেষকেরা জানতে পারেন, এটি সূর্যের আলো, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও পানির পুষ্টি উপাদানে বেড়ে ওঠা ক্ষুদ্র শৈবাল।

বার-জিভের ধারণা, অন্তত ১২ মাইলজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই শৈবালের স্তরের উৎপত্তি নীল নদের বদ্বীপ এলাকায়। সমুদ্রস্রোতে তা ইসরায়েলের উপকূলের দিকে এসেছে। ২০ বছর ধরে উপকূলের পানি পরীক্ষা করা এই বিজ্ঞানী বলেন, ‘এত বড় পরিসরে এমন কিছু এই প্রথম দেখলাম।’

ইসরায়েলের শোধনাগারগুলোতে মূলত ‘রিভার্স অসমোসিস’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এতে পানি পরিশোধনের পর বিশেষ ঝিল্লির মাধ্যমে লবণ, ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণু সরিয়ে পানযোগ্য পানি তৈরি করা হয়। তবে শৈবাল ও এর তৈরি পদার্থ এসব ঝিল্লি নষ্ট বা অকার্যকর করতে পারে।

ইউনিভার্সিটি অব ইউটার মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রের পরিচালক মাইকেল ক্রিস্টোফার লো বলেন, পানিতে ভাসমান পদার্থের পরিমাণ বেশি হলে শোধনপ্রক্রিয়া তা সামাল দিতে পারে না।

মেকোরোট জানিয়েছে, শোধনাগার বন্ধ থাকায় পানির ঘাটতি পূরণে গ্যালিলি সাগর থেকে পানি তোলা, ভূগর্ভস্থ কূপ চালু করা এবং জাতীয় মজুত ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু এলাকায় বাগানে পানি দেওয়া ও সুইমিংপুলে পানি ভরার ক্ষেত্রে সাময়িক বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে কৃষকদের ওপর।

সমুদ্রবিজ্ঞানী তামার গাই-হাইম বলেন, পানিতে পুষ্টি উপাদান, তাপমাত্রা, আলো, স্রোত ও পানির মিশ্রণের মতো পরিবেশগত উপাদানের সঠিক সমন্বয় হলে শৈবালের এমন বিস্তার ঘটে।

মেকোরোট বলেছে, সাম্প্রতিক ঘটনাটি ছিল ‘খুবই অস্বাভাবিক কিছু উপাদানের সমন্বয়’। এর মধ্যে ছিল সমুদ্রের ঝড়, যা পানির ঘোলাভাব বাড়িয়েছে এবং সমুদ্রের তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হয়েছে।

বেন-জিভ বলেন, শৈবাল বা জেলিফিশের কারণে আগে শোধনাগার বন্ধ হয়েছে। কিন্তু উপকূলের বড় একটি অংশজুড়ে একাধিক স্থাপনা বন্ধ হওয়া ‘নিঃসন্দেহে অস্বাভাবিক’।  জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমন ঘটনা ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে।

এই ঘটনা সমুদ্রের পানি শোধনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকিও সামনে এনেছে। লো বলেন, ‘এই ঘটনা যথেষ্ট উদ্বেগ তৈরি করেছে এবং ব্যবস্থাটি বড় ধরনের বিঘ্নের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ, এমন সমালোচনাও হচ্ছে।’

সামরিক হামলা, সাইবার হামলা ও তেল ছড়িয়ে পড়ার মতো ঘটনাও শোধনাগারগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বেন-জিভ বলেন, ‘শোধনাগারের আশপাশে তেল ছড়িয়ে পড়বে কি না, প্রশ্নটি তা নয়; প্রশ্ন হলো, কখন ছড়াবে।’ এমন ঘটনা হলে শোধনাগারগুলো এই শৈবালের চেয়ে অনেক বেশি সময় বন্ধ থাকতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে সেটিই অনেক বেশি উদ্বেগের।’

সূত্র: সিএনএন