প্রতিবেশী দেশগুলোর বিমানবন্দরে ইরান হামলা চালালে কী ঘটবে?

আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে ইরানি এয়ারলাইনগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে প্রতিবেশী দেশগুলোকে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইরান। এতে প্রায় সাত মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ব্যাহত আঞ্চলিক বিমান চলাচলে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই প্রতিবেশী দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে সহযোগিতা না করার আহ্বান জানিয়েছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে তিনি বলেন, কোনও দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করলে বা তাদের অভিযানে যুক্ত হলে, ওই দেশের বিমানবন্দর থেকে ইরানে কোনও ফ্লাইট চলতে দেওয়া হবে না।

রেজাই আরও বলেন, ইরান এমন ব্যবস্থা নেবে যাতে ইরানি ফ্লাইট বন্ধ করা দেশগুলোর বিমানবন্দর কার্যকর থাকতে না পারে। তবে তেহরান কীভাবে এই হুমকি বাস্তবায়ন করবে, তা তিনি স্পষ্ট করেননি। এটি কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক নাকি সামরিক পদক্ষেপ হবে, তাও জানায়নি ইরান।

এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার হুমকির পর কয়েকটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করেছে ইরানি এয়ারলাইনগুলো। বৃহস্পতিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ইরানের সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানিয়ান স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সি। এর আগে আজারবাইজান ও জর্জিয়া ইরানি ফ্লাইট স্থগিত করার কথা জানিয়েছে। বাগদাদ ও মাসকাটের ফ্লাইটও বন্ধ রয়েছে। তুরস্ক ও চীনের সঙ্গে কিছু বিমান যোগাযোগ চালু থাকলেও অনেক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।

ইরানের বিমান চলাচল খাতকে বিচ্ছিন্ন করতে চলতি মাসের শুরুতে নিষেধাজ্ঞা জোরদার করে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের অবশিষ্ট এয়ারলাইনগুলোর পাশাপাশি তাদের সহযোগিতাকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও মধ্যস্থতাকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। এতে মেহান এয়ারের ওপর থাকা পুরোনো নিষেধাজ্ঞা আরও ২৭টি ইরানি এয়ারলাইন পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সতর্ক করে বলেছেন, ইরানি বিমানকে জ্বালানি, অবতরণ সেবা বা টিকিট বিক্রির মতো সুবিধা দিলে বিমানবন্দর ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

তবে কোনও সার্বভৌম দেশের বিমানবন্দর বন্ধ করে দেওয়ার আইনি ক্ষমতা ইরানের নেই। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও অন্য দেশের আকাশসীমা সরাসরি বন্ধ করতে পারে না। তবে দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে স্থানীয় জ্বালানি সরবরাহকারী, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার ও টিকিট বিক্রিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ইরানি বিমানকে সেবা দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে ওয়াশিংটন।

আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা আইএটিএর হিসাবে, মধ্যপ্রাচ্যের এয়ারলাইনগুলো ২০২৬ সালে সম্মিলিতভাবে ৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের হিসাবে, মার্চে সংঘাতের কারণে অঞ্চলটিতে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের ব্যয় প্রতিদিন প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার কমছিল।

নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুস্তাই বলেছেন, এবার ইরান আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলোতে হামলা চালাবে বলে তিনি মনে করেন না। তার মতে, তুরস্ক, পাকিস্তান ও চীনের মতো দেশ ইরানের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ না করায় মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তাৎক্ষণিক বাস্তব প্রভাব সীমিত হতে পারে। তবে এর মানসিক প্রভাব বেশি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেলে ইরানিরা সরাসরি দেশটির ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা অনুভব করবেন বলে মন্তব্য করেন পুস্তাই।

এদিকে বিমান চলাচল বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের হিসাবে, ২০২৬ সালের আগস্টে এক বছর আগের তুলনায় ইরান থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের আসন সক্ষমতা ৪৯ শতাংশ কমেছে। সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরান থেকে পরিচালিত আন্তর্জাতিক রুটের সংখ্যা আরও কমে গেছে এবং হাজারো যাত্রী তুরস্ক ও আর্মেনিয়াসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর স্থলসীমান্তের দিকে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

বিমান চলাচলে সংকটের প্রভাব ইরানের পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শিল্পেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী চলাচল গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩১ শতাংশ কমেছে।