‘যুদ্ধবিরতির’ এক বছরে গাজায় শিশুসহ ১৪০০ ফিলিস্তিনি নিহত

যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে গাজায় তথাকথিত যুদ্ধবিরতি হওয়ার এক বছর পার হয়েছে। ১০০-এর বেশি মানবিক, মানবাধিকার ও সুশীল সমাজের সংগঠনের মতে, এই যুদ্ধবিরতি শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।

শুক্রবার সংগঠনগুলোর এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, যুদ্ধবিরতি শুধু নামেই আছে। ইসরায়েলি বাহিনী প্রতিদিন ফিলিস্তিনিদের হত্যা ও আহত করছে। ত্রাণ, সরঞ্জাম ও পুনর্নির্মাণসামগ্রীর ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে পরিবারগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল, সেভ দ্য চিলড্রেন, অক্সফাম, গ্রিনপিসসহ কয়েক ডজন আন্তর্জাতিক সংগঠন জানায়, গাজা বোর্ড অব পিস কাঠামোর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সংঘাত বন্ধে চুক্তির ঘোষণা দেওয়ার পর এক বছরে অঞ্চলটিতে ইসরায়েলি হামলায় ১ হাজার ৪০০-র বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ৩২৭ জন শিশু।

যৌথ বিবৃতিতে নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের মহাসচিব ইয়ান এগেল্যান্ড বলেন, যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরের পুরো এক বছর পরও গাজার ফিলিস্তিনিদের পরিস্থিতির এত সামান্য উন্নতি হওয়া সম্পূর্ণ লজ্জাজনক। সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রধান নির্বাহী ইঙ্গার অ্যাশিং বলেন, শিশুরা এখনও নিহত হলে এবং পরিবারগুলো নিজেদের জীবন নতুন করে গড়তে না পারলে যুদ্ধবিরতির কোনও অর্থ নেই। তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে প্রায় প্রতিদিন একটি করে শিশু নিহত হয়েছে।

২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরুর পর তিন বছরে ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত ও ১ লাখ ৭৫ হাজার আহত হয়েছেন। অর্থাৎ গাজার প্রতি ১৩ জনে একজন আহত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে, আহতদের প্রায় ২৪ শতাংশ জীবন বদলে দেওয়া আঘাত নিয়ে বেঁচে আছেন, যাদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন প্রয়োজন। তাদের এক-চতুর্থাংশ শিশু। শুক্রবারের মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, গাজার অল্প কিছু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র চাপে রয়েছে এবং সরবরাহ কমে আসছে। ৩৬টি হাসপাতালের একটিও পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না। ওষুধ, সরঞ্জাম ও জ্বালানির ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অন্তত ৪ হাজার শিশুসহ ১৮ হাজার ৫০০-র বেশি রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বাইরে নেওয়া প্রয়োজন। অপেক্ষায় থেকে মারা গেছেন ১ হাজারের বেশি। প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনির জরুরি আশ্রয় দরকার, যেখানে ৮০ শতাংশ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত।

এগেল্যান্ড সতর্ক করেন, সরঞ্জাম ও নির্মাণসামগ্রীর ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞা এখনও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বা সামগ্রী ঢুকতে দিচ্ছে না, অথচ জনগোষ্ঠীগুলোর জীবন নতুন করে গড়ার একমাত্র উপায় এগুলোই। একই সঙ্গে গাজার ১৪ লাখ মানুষ বছরের শেষ পর্যন্ত সংকটপর্যায়ের বা তার চেয়েও খারাপ ক্ষুধার মুখোমুখি, বলা হয়েছে বিবৃতিতে।

শুক্রবার গাজায় ইসরায়েলি বাহিনী কেন্দ্রীয় অংশের আল-মুসাদ্দার, মাগাজি ও বুরেইজ শরণার্থী শিবির এলাকায় বেসামরিক মানুষের ওপর গুলি চালিয়ে অন্তত একজন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। ওই এলাকায় ইসরায়েলি গোলাবর্ষণও হয়েছে। দক্ষিণের খান ইউনিসে ইসরায়েলি ট্যাংক বনি সুহেইলা চত্বরের দিকে ভারী চালায়। এতে বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পওয়া গেছে।

শুক্রবারের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, যুদ্ধবিরতি কাঠামোর অংশ হিসেবে ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত এলাকা ও ফিলিস্তিনিদের পৃথক করতে বাফার হিসেবে গড়া তথাকথিত ইয়েলো লাইন খেয়ালখুশিমতো সরিয়ে ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে আরও কোনঠাঁসা পরিবেশে ঠেলে দিয়েছে।

২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হয়। এরপর থেকে ইসরায়েল অন্তত ১ হাজার ৪৭১ ফিলিস্তিনিকে হত্যা এবং ৫ হাজার ১৮৯ জনকে আহত করেছে। তিন বছরের ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৭৪ হাজার ২৫৪ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ২১ হাজার শিশু। এটি যুদ্ধের আগের জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি ৩০ জনে একজন।

ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শুধু হাসপাতালে নথিভুক্ত বা সরকারিভাবে নিবন্ধিত মৃত্যুর হিসাব রাখে। ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের নিচে চাপা পড়া বা নিখোঁজ হাজারো মানুষ এতে ধরা হয়নি, তাই প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত অনেক বেশি।