পোড়ামাটির কারুকাজে ইতিহাসের অনন্য নিদর্শন কান্তজিউ মন্দির

দিনাজপুরের নাম উঠলেই যেসব ঐতিহাসিক স্থাপনার কথা মনে পড়ে, তার মধ্যে অন্যতম কান্তজিউ মন্দির। পোড়ামাটির অপূর্ব টেরাকোটা অলংকরণ, প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী ও ধর্মীয় ইতিহাসের কারণে মন্দিরটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান। ইতিহাস ও স্থাপত্যপ্রেমীদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের কাছেও এটি বেশ জনপ্রিয়।

দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার কান্তনগর এলাকায় অবস্থিত এই মন্দিরটি স্থানীয়ভাবে কান্তজির মন্দির নামেও পরিচিত। এটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান এবং বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থাপত্যের অন্যতম উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।

পোড়ামাটির ফলকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নানা ধরনের দৃশ্য ও কাহিনি।। ছবি: সংগৃহীত

পোড়ামাটির ফলকে ফুটে উঠেছে গল্প

কান্তজিউ মন্দিরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর টেরাকোটা বা পোড়ামাটির অলংকরণ। মন্দিরের দেয়ালজুড়ে থাকা অসংখ্য পোড়ামাটির ফলকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নানা ধরনের দৃশ্য ও কাহিনি।

ধর্মীয় উপাখ্যানের পাশাপাশি এসব কারুকাজে দেখা যায় তৎকালীন মানুষের জীবনযাপন, পোশাক, যুদ্ধ, শিকার, সংগীত, নৃত্য, পশুপাখি ও সামাজিক নানা দৃশ্য। ফলে মন্দিরটি শুধু উপাসনালয় নয়, বরং তৎকালীন সমাজ ও সংস্কৃতির একটি দৃশ্যমান দলিল হিসেবেও বিবেচিত হয়।

মন্দিরের প্রতিটি দেয়াল ও খিলানের দিকে তাকালে চোখে পড়ে সূক্ষ্ম নকশা। পোড়ামাটির ছোট ছোট ফলকে এত নিখুঁতভাবে বিভিন্ন দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে দেখলেও নতুন নতুন নকশা চোখে পড়ে।

এসব কারুকাজে দেখা যায় তৎকালীন মানুষের জীবনযাপন। ছবি: সংগৃহীত

নির্মাণে লেগেছিল দীর্ঘ সময়

কান্তজিউ মন্দিরের নির্মাণকাজ শুরু করেন দিনাজপুরের তৎকালীন জমিদার প্রাণনাথ রায়। তার মৃত্যুর পর দত্তকপুত্র রামনাথ রায় মন্দিরটির নির্মাণকাজ শেষ করেন।

মন্দিরটির নির্মাণকাজ ১৮ শতকে শুরু হয়ে কয়েক দশক ধরে চলে। এর স্থাপত্যে তৎকালীন বাংলার মন্দির নির্মাণশৈলীর সঙ্গে পোড়ামাটির শিল্পের অসাধারণ সমন্বয় দেখা যায়।

একসময় মন্দিরটির চূড়ায় নয়টি চূড়া বা রত্ন ছিল। ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে এসব চূড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে মন্দিরের মূল কাঠামো টিকে থাকলেও আগের সেই চূড়াগুলো আর পুনর্নির্মাণ করা হয়নি।

দেয়াল ও খিলানের দিকে তাকালে চোখে পড়ে সূক্ষ্ম নকশা। ছবি: সংগৃহীত

তিনতলা স্থাপত্যের অনন্য সৌন্দর্য

কান্তজিউ মন্দিরের স্থাপত্যে রয়েছে তিনটি ধাপ বা স্তর। মন্দিরের চারপাশের দেয়াল ও স্তম্ভে টেরাকোটার কাজ এত ঘনভাবে করা হয়েছে যে পুরো স্থাপনাটি যেন একটি বিশাল শিল্পকর্মে পরিণত হয়েছে।

মন্দিরের সামনের অংশে দাঁড়িয়ে এর কারুকাজ দেখলে বোঝা যায়, কয়েক শতাব্দী আগে শিল্পীরা কতটা দক্ষতার সঙ্গে পোড়ামাটিকে ব্যবহার করে স্থাপত্যকে নান্দনিক করে তুলেছিলেন।

বিশেষ করে মন্দিরের বাইরের দেয়ালের টেরাকোটা ফলকগুলো পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে। এগুলোতে রামায়ণ, মহাভারত ও কৃষ্ণকেন্দ্রিক বিভিন্ন কাহিনির পাশাপাশি তৎকালীন বাংলার সামাজিক জীবনের নানা চিত্র ফুটে উঠেছে।

স্তম্ভে টেরাকোটার কাজ। ছবি: সংগৃহীত

রাসমেলা ঘিরে জমে ওঠে উৎসব

কান্তজিউ মন্দির শুধু ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়, এটি ঘিরে রয়েছে দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। প্রতিবছর রাস পূর্ণিমা উপলক্ষে মন্দির প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় বসে ঐতিহ্যবাহী রাসমেলা।

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থী ও ভক্তরা এ সময় কান্তনগরে আসেন। মেলা ঘিরে স্থানীয় এলাকায় তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি মেলায় স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প ও বিভিন্ন পণ্যের দোকানও বসে।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে দিনাজপুর শহরে বাস, ট্রেন কিংবা সড়কপথে যাওয়া যায়। দিনাজপুর শহর থেকে কান্তজিউ মন্দিরের দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। শহর থেকে স্থানীয় বাস, অটোরিকশা, সিএনজি বা অন্যান্য যানবাহনে কাহারোল উপজেলার কান্তনগরে যাওয়া যায়।

দিনাজপুর ভ্রমণের পরিকল্পনা করলে কান্তজিউ মন্দিরের পাশাপাশি আশপাশের অন্যান্য ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থানও ঘুরে দেখা যেতে পারে।

কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে থাকা কান্তজিউ মন্দির বাংলার প্রাচীন শিল্প, স্থাপত্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক জীবনের এক অসাধারণ স্মারক। ইতিহাসের পাতাকে কাছ থেকে দেখতে চাইলে দিনাজপুরের কান্তনগরে এই মন্দির হতে পারে ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ।