ইউরোপে একের পর এক তীব্র তাপপ্রবাহ, দাবানল ও খরার প্রভাব এখন শুধু পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নেই, বদলে দিচ্ছে পর্যটকদের ভ্রমণের সময়, গন্তব্য ও পরিকল্পনা। কেউ নির্ধারিত সফর সংক্ষিপ্ত করছেন, কেউ জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান বাদ দিচ্ছেন, আবার কেউ গ্রীষ্মের ছুটি সরিয়ে নিচ্ছেন তুলনামূলক শীতল অঞ্চল কিংবা বছরের অন্য সময়ে।
দক্ষিণ ফ্রান্সের দাবানল, ইউরোপের নদীগুলোর পানির স্তর কমে যাওয়া এবং ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার পূর্বাভাসের কারণে এবারের গ্রীষ্মের ইউরোপ ভ্রমণ অনেকের কাছেই আনন্দের বদলে হয়ে উঠেছে নিরাপত্তা ও পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পরীক্ষা।
ছুটির মাঝেই দাবানলের আতঙ্ক
জুলাইয়ের শেষ দিকে দক্ষিণ ফ্রান্সের একটি হ্রদে প্যাডেল বোর্ডে ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক ক্রিসি হোয়াইটহার্স্ট। হঠাৎ আকাশে ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী দেখতে পান তিনি। কয়েক মাইল দূরে তখন ছড়িয়ে পড়ছিল গিরোন্দের ভয়াবহ দাবানল।
স্বামী ও দুই ছোট সন্তানকে নিয়ে আটলান্টিক উপকূলের একটি জনপ্রিয় ক্যাম্পগ্রাউন্ডে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন হোয়াইটহার্স্ট। বাইরে থেকে ফিরে তিনি দেখেন, আকাশ কালো ও লালচে ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে, চারপাশে ঝরছে ছাই।
পরিস্থিতি দেখে সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। পরবর্তী পাঁচ দিন পরিবারটি নিয়মিত খবরের আপডেট নিতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১০ দিনের ছুটির মাঝপথেই তাদের ক্যাম্পগ্রাউন্ড ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়।
১৩ লাখ একরের বেশি এলাকা পুড়েছে
ইউরোপের গ্রীষ্মের প্রথমার্ধে একের পর এক তাপপ্রবাহ ও দাবানল পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নজুড়ে দাবানলে ১৩ লাখ একরেরও বেশি এলাকা পুড়ে গেছে।
দীর্ঘস্থায়ী গরম ও খরার কারণে ডানিউব ও রাইন নদীর পানির স্তরও রেকর্ড নিম্নে নেমেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে নদীপথের পর্যটনে। বেশ কিছু রিভার ক্রুজের যাত্রাপথ বাতিল বা পরিবর্তন করতে হয়েছে। কোথাও কোথাও পর্যটকদের বাসে করে বিকল্প পথে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং অতিরিক্ত হোটেল থাকার ব্যবস্থাও করতে হয়েছে।
৪০ ডিগ্রি পেরোতে পারে তাপমাত্রা
পশ্চিম ইউরোপে জুন থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়টি রেকর্ড উষ্ণ থাকার পর মে মাস থেকে এবার পঞ্চম দফার তাপপ্রবাহ দেখা দিয়েছে।
ফ্রান্স, স্পেন ও ইতালির বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হতে পারে। পরে এই তীব্র গরম ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে মধ্য ইউরোপেও। চেক প্রজাতন্ত্র, জার্মানি ও পোল্যান্ডে বিশেষভাবে উচ্চ তাপমাত্রার পূর্বাভাস রয়েছে।
ফলে পর্যটকদের অনেকেই ভ্রমণসূচি বদলাচ্ছেন। কেউ সফরের তারিখ পিছিয়ে দিচ্ছেন, কেউ রোমের কলোসিয়ামের মতো খোলা আকাশের নিচে থাকা দর্শনীয় স্থান ঘোরার পরিকল্পনা বাতিল করছেন। আবার কেউ নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফিরছেন।
শিশু ও বয়স্ক ভ্রমণসঙ্গীদের নিয়ে সমস্যায় পড়ার কথাও জানিয়েছেন অনেকে। কোথাও পর্যাপ্ত শীতাতপনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকায় অতিরিক্ত গরম সামলানোও কঠিন হয়ে উঠেছে।
কলোরাডোর রেবেকা হয়ট জুলাইয়ের শুরুতে দক্ষিণ স্পেন ও ফ্রান্স ভ্রমণ করেছিলেন। তার ভাষায়, অসহনীয় গরম পুরো ভ্রমণটাকেই বদলে দিয়েছিল। সুন্দর গন্তব্য উপভোগের বদলে সেটি যেন টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছিল। এই অভিজ্ঞতার পর আগামী গ্রীষ্মে ইউরোপে না ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
শীতল স্থানের দিকে ঝুঁকছেন পর্যটকরা
ইউরোপীয় পর্যটন কমিশনের মতে, জলবায়ু পরিস্থিতি ক্রমেই প্রভাব ফেলছে ইউরোপীয়দের কোথায় এবং কখন ভ্রমণ করবেন এই সিদ্ধান্তে।
পর্যটন কমিশনের প্রধান নির্বাহী এদুয়ার্দো সান্তান্দের মনে করেন, পর্যটন খাতকে ভবিষ্যতে মৌসুমি ভ্রমণের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। একই সঙ্গে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা, সংকটকালীন প্রস্তুতি এবং পর্যটকদের সঙ্গে দ্রুত ও পরিষ্কার যোগাযোগ বাড়ানো জরুরি।
তবে পর্যটকরা এখনো দক্ষিণ ইউরোপের জনপ্রিয় গন্তব্যগুলো পুরোপুরি এড়িয়ে যাচ্ছেন না। বরং পরিবর্তনটি হচ্ছে ধীরে ধীরে। জুনে ভ্রমণের আগ্রহ কিছুটা বাড়ার পাশাপাশি দক্ষিণ ইউরোপে শীত ও বসন্তের পর্যটন বাড়ছে। অন্যদিকে নর্ডিক অঞ্চলগুলোতে পর্যটকের আগমন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে।
অর্থাৎ, গরম এড়াতে অনেকেই ইউরোপ ভ্রমণ বাদ না দিয়ে সময় ও গন্তব্য বদলে নিচ্ছেন।
পাহাড় ও উত্তরের অঞ্চল জনপ্রিয় হচ্ছে
ফ্রান্সের হোটেল বাজারেও পরিবর্তনের কিছু ইঙ্গিত মিলছে। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমকেজি গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে ফ্রান্সের উপকূলের তুলনায় পাহাড়ি অঞ্চলে হোটেল দখলের হার দ্রুত বেড়েছিল।
ইংলিশ চ্যানেলের উত্তর উপকূল ও ব্রিটানিতেও হোটেল আয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, পর্যটকদের একটি অংশ প্রচণ্ড গরমের সময় অপেক্ষাকৃত শীতল পরিবেশের দিকে ঝুঁকছেন।
গ্রিসের ক্রিট দ্বীপেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পর্যটন ব্যবসায়ী ভিটোরাকিস মিখাইল জানান, গত তিন-চার বছরে ক্রমেই বেশি পর্যটক জুলাই-আগস্টের বদলে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ক্রিটে আসছেন।
দাবানলের প্রভাব আগুনের বাইরেও
গিরোন্দের দাবানল পর্যটন খাতে আরেকটি বাস্তবতা সামনে এনেছে। আগুন সরাসরি যে এলাকায় পৌঁছেছে, তার বাইরেও পর্যটকদের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
হোটেল বুকিং কমে যায় এমন এলাকাতেও, যেগুলো দাবানল থেকে ৫০ মাইলেরও বেশি দূরে। সাঁ-এমিলিয়ঁর মতো বিখ্যাত পর্যটন ও মদ উৎপাদন অঞ্চলও এর প্রভাব থেকে রেহাই পায়নি।
এর সঙ্গে যোগ হয় যোগাযোগব্যবস্থার সমস্যা। বোর্দোর দক্ষিণে রেল চলাচল ও একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক কয়েক দিনের জন্য বন্ধ থাকায় দাবানল থেকে দূরে থাকা আর্কাশোঁর মতো শহরেও পর্যটকদের যাতায়াত ব্যাহত হয়।
আর্কাশোঁর এক হোটেল ম্যানেজার জিল দেলপো বলেন, তিনি আশা করছেন কয়েক দিনের মধ্যে আবার পর্যটকদের ফোন আসতে শুরু করবে। বুকিং বাতিলের চাপ সামলাতে তাকে কয়েকজন কর্মীকেও ছুটিতে পাঠাতে হয়েছে।
‘দ্বিতীয় সংকট’ নিয়ে উদ্বেগ
ফ্রান্সের আতিথেয়তা খাতের সংগঠনগুলোর মতে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাগুলোর বেশিরভাগই ছোট ও স্বাধীনভাবে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান। সারা বছর টিকে থাকার জন্য তারা জুলাই-আগস্টের আয়ের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।
তাই দাবানলের পাশাপাশি পর্যটকদের আতঙ্কও তাদের জন্য বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে। এ কারণেই পর্যটন খাতের সংগঠনগুলো ‘আমাদের পরিত্যাগ করবেন না!’ নামে প্রচারাভিযান শুরু করেছে, যাতে নিরাপদ এলাকায় পর্যটকদের ফিরে আসতে উৎসাহিত করা যায়।
ফরাসি পর্যটনমন্ত্রী সের্ঝ পাপাঁও আগুনের প্রভাবমুক্ত এলাকায় যারা আগস্টের ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা করেছেন, তাদের ভ্রমণ বাতিল না করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বার্তা, পর্যটন মৌসুম এখনও শেষ হয়ে যায়নি।
তবে পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, ঝুঁকির তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে ভারসাম্য জরুরি। হসপিটালিটি ইউনিয়নের লঁদ বিভাগের সভাপতি আর্থার লাবোর্দে বলেন, প্রকৃত ঝুঁকি সম্পর্কে পর্যটকদের স্বচ্ছভাবে জানানো দরকার। কিন্তু প্রয়োজনের চেয়ে বড় এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখালে নিরাপদ এলাকাতেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে পারে। তখন তৈরি হতে পারে ‘দ্বিতীয় সংকট’ অর্থনৈতিক।
পর্যটকদের সিদ্ধান্তেও জলবায়ুর ছাপ
ক্যালিফোর্নিয়ার ৭১ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত ওয়েন্ডি স্মিথ আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে ব্রিটানি থেকে বিয়ারিৎস পর্যন্ত ফ্রান্সের আটলান্টিক উপকূল ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন।
দাবানলের পর তিনি তিনটি উপকূলীয় শহরের ট্রেনের টিকিট ও অ্যাপার্টমেন্টের বুকিং বাতিল করেন। এরপর প্যারিস থেকে সরাসরি ফ্রান্সের দক্ষিণ প্রান্তে উড়ে যান।
তার যুক্তি ছিল, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় একজন অতিরিক্ত পর্যটকের উপস্থিতিও সেখানকার পরিস্থিতিতে কোনও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে না।
এই সিদ্ধান্ত শুধু একজন পর্যটকের ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, বরং ইউরোপের পর্যটনে তৈরি হওয়া নতুন বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি।
সামনে কী?
ইউরোপের পর্যটন এখনও শক্তিশালী। মাদ্রিদে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের ব্যয় ১০ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি। ভ্যালেন্সিয়া ও মুরসিয়াতেও পর্যটন আয়ে প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা রয়েছে।
তাই তীব্র গরম এখনই ইউরোপের পর্যটনকে থামিয়ে দিচ্ছে এমনটা বলা যাচ্ছে না। তবে পর্যটকদের আচরণে পরিবর্তনের লক্ষণ স্পষ্ট। গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়ের বদলে বসন্ত, শরৎ বা শীতকে বেছে নেওয়া, উত্তরের দেশ কিংবা পাহাড়ি অঞ্চলে যাওয়া এবং ভ্রমণের আগে আবহাওয়া ও দুর্যোগ পরিস্থিতি যাচাই করে ভ্রমণ করতে পারেন।
সূত্র: দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস

হ্রদের দেশে ‘হিটেড রাইভ্যালরি’র কটেজের খোঁজে







