যেখানে গন্তব্যের চেয়ে পথই বেশি সুন্দর

শীতের ছুটিতে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন? ভারতের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে এমন কিছু রাস্তা, যেখানে পাহাড়, সমুদ্র, বনভূমি কিংবা মরুভূমির রূপ দেখতে দেখতে কেটে যায় সফরের সময়। গাড়ি বা বাইকে লং ড্রাইভের অভিজ্ঞতা নিতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন এই ১১টি পথে।

শীতকাল লং ড্রাইভের আদর্শ সময়। কোথাও কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ি পথ, কোথাও সবুজ বনভূমি, আবার কোথাও সমুদ্রের পাশ দিয়ে চলে গিয়েছে মসৃণ হাইওয়ে। গাড়ি বা বাইকে চেপে এই রাস্তাগুলিতে সফর করতে করতে বদলে যায় চারপাশের দৃশ্য। শীতের ছুটিতে ঘুরে আসতে পারেন এমনই ১১টি পথে।

দিল্লি থেকে মানালি যাওয়ার রাস্তা (ছবি: সংগৃহীত)

দিল্লি থেকে মানালি যেতে প্রায় ৫৩০-৫৮০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। পানিপত, আম্বালা, চণ্ডীগড়, বিলাসপুর, মান্ডি ও কুল্লু হয়ে পৌঁছোনো যায় হিমাচল প্রদেশের এই পাহাড়ি শহরে। হাইওয়ে পেরিয়ে পাহাড়ি পথে উঠতে উঠতে চোখে পড়বে সবুজ উপত্যকা এবং বিপাশা নদী। বন্ধুদের সঙ্গে লং ড্রাইভ কিংবা পরিবারের সঙ্গে ছুটির সফরের জন্য এই পথ বেছে নিতে পারেন।

মুম্বাই থেকে গোয়া যাওয়ার পথ (ছবি: সংগৃহীত)

সমুদ্রের পাশ দিয়ে গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা পেতে পারেন মুম্বাই থেকে গোয়া যাওয়ার পথে। প্রায় ৫৫০-৬০০ কিলোমিটারের এই সফরে কোঙ্কণ উপকূলের সবুজ পাহাড়, ধানখেত, নারকেল গাছ ও ছোট ছোট গ্রাম চোখে পড়বে। শীতের তুলনামূলক আরামদায়ক আবহাওয়ায় এই পথ ধরে সফর বেশ উপভোগ্য। তাড়াহুড়ো না করে পথে কয়েকটি জায়গায় থামলে সফরের আনন্দ বাড়বে।

জয়পুর থেকে পুষ্কর যেতে চোখে পড়বে এই সৌন্দর্য (ছবি: সংগৃহীত)

রাজস্থানের মরুপ্রকৃতি দেখতে চাইলে জয়পুর থেকে পুষ্কর যেতে পারেন। প্রায় ১৪৩-১৪৮ কিলোমিটারের এই পথে রয়েছে অরাবলী পর্বতমালার শুষ্ক পাহাড়ি দৃশ্য। পুষ্করে পৌঁছে ঘুরে দেখতে পারেন হ্রদের ঘাট, রঙিন বাজার ও ছোট ক্যাফে। শীতের বিকেলে সূর্যাস্তের দৃশ্যও উপভোগ করতে পারেন।

বেঙ্গালুরু থেকে কুর্গের পথ (ছবি: সংগৃহীত)

বেঙ্গালুরু থেকে কুর্গের দূরত্ব প্রায় ২৫০-২৭০ কিলোমিটার। মাইসুরু হয়ে এই পথে এগোলে শহরের ব্যস্ততা ছেড়ে ধীরে ধীরে পৌঁছে যাবেন কফি বাগান, ঘন বনভূমি ও কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ের কাছে। কুর্গে গিয়ে কফি বাগান ঘুরে দেখা কিংবা প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানোর সুযোগ রয়েছে। শীতের নরম রোদে পাহাড়ি পথের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।

চেন্নাই থেকে পুদুচেরি যাওয়ার পথে দেখতে পারবেন বঙ্গোপসাগরের সৌন্দর্য (ছবি: সংগৃহীত)

চেন্নাই থেকে পুদুচেরির দূরত্ব প্রায় ১৫০ কিলোমিটার। ইস্ট কোস্ট রোড ধরে বঙ্গোপসাগরের পাশ দিয়ে এগোতে এগোতে দেখা মিলবে সমুদ্র, সৈকত ও উপকূলীয় জনপদের। পথের দু’পাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন যে সময় কেটে যাবে, তা টেরও পাবেন না। পুদুচেরিতে পৌঁছে ঘুরে দেখতে পারেন ফরাসি ঔপনিবেশিক আমলের স্থাপত্য, পুরনো রাস্তা ও সমুদ্রতীর।

গুয়াহাটি থেকে শিলং রোডের পাশে থাকা বনভূমি (ছবি: সংগৃহীত)

উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি পরিবেশ উপভোগ করতে গুয়াহাটি থেকে শিলংয়ের প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারেন। রাস্তার দু’পাশে পাইন গাছ, পাহাড়ি বাঁক ও মেঘের আনাগোনা এই সফরের সঙ্গী। পথে উমিয়াম হ্রদের কাছে কিছুক্ষণ সময় কাটানো যায়। শিলংয়ে পৌঁছে স্থানীয় খাবার, ক্যাফে ও পাহাড়ি পরিবেশ উপভোগ করতে পারেন।

অন্য রকম অভিজ্ঞতার জন্য যেতে পারেন গুজরাতের কচ্ছের রণে। আমদাবাদ থেকে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে পৌঁছোনো যায় সাদা লবণের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে। শীতকালে এখানকার আবহাওয়া তুলনামূলক আরামদায়ক থাকে। মরুভূমির রাত, স্থানীয় লোকশিল্প এবং পূর্ণিমার আলোয় সাদা লবণের প্রান্তর দেখার অভিজ্ঞতা মনে রাখার মতো। তবে সফরের আগে রাস্তার অবস্থা ও স্থানীয় যাতায়াতের নিয়ম জেনে নেওয়া জরুরি।

দিল্লি থেকে মুসৌরি রোডে দেখা মিলবে পাহাড় ও পাইনগাছের সারি (ছবি: সংগৃহীত)

দিল্লি থেকে মুসৌরির দূরত্ব প্রায় ২৭০-৩০০ কিলোমিটার। গাড়িতে যেতে সময় লাগতে পারে পাঁচ থেকে সাড়ে সাত ঘণ্টা, যদিও যানজট ও রাস্তার পরিস্থিতির উপর সময় নির্ভর করবে। দেরাদুন পেরিয়ে পাহাড়ি পথে উঠতে উঠতে দেখা যায় পাইন গাছের সারি, উপত্যকা ও মেঘে ঢাকা পাহাড়। মুসৌরিতে পৌঁছে ল্যান্ডোরের পুরনো রাস্তা, ছোট ক্যাফে ও পাহাড়ের উপর থেকে সূর্যাস্ত উপভোগ করতে পারেন।

অপূর্ব সুন্দর বেঙ্গালুরু থেকে উটি রোড (ছবি: সংগৃহীত)

বেঙ্গালুরু থেকে উটির দূরত্ব প্রায় ২৭০-২৮০ কিলোমিটার। নীলগিরির পথে এই সফরে দেখা মিলবে চা-বাগান, কুয়াশায় ঢাকা পাহাড় ও আঁকাবাঁকা রাস্তার। উটিতে পৌঁছে চা-বাগান ঘুরে দেখা এবং নিরিবিলি পরিবেশে সময় কাটানোর সুযোগ রয়েছে। পাহাড়ি পথে একাধিক বাঁক থাকায় গাড়ি চালানোর সময় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

কলকাতা থেকে ঝাড়গ্রাম জেলার বেলপাহাড়ির আমলাশোলে যাওয়ার পতে পড়বে এই ঘন বন (ছবি: সংগৃহীত)

কলকাতা থেকে প্রায় ছয়-সাত ঘণ্টার সফরে পৌঁছোনো যায় বেঙ্গালুরু থেকে উটি। ঘন সবুজ বনভূমির মধ্যে দিয়ে চলে গিয়েছে কালো পিচের রাস্তা। পথে দেখা মিলবে অরণ্য, ছোট পাহাড় ও গ্রামাঞ্চলের। ঘাটশিলা হয়ে কিংবা লোধাশুলি, ঝাড়গ্রাম ও বেলপাহাড়ি দিয়ে আমলাশোলে যাওয়া যায়। শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে কিছুটা সময় কাটাতে চাইলে শীতের ছুটিতে এই পথে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তে পারেন।

বাঙালির শীতের বেড়ানোর তালিকায় পুরীও রয়েছে। কলকাতা থেকে গাড়িতে ওড়িশার এই উপকূলীয় শহরে যেতে পারেন। পথ দীর্ঘ হওয়ায় মাঝপথে বিশ্রামের পরিকল্পনা রাখা ভাল। পুরীতে সমুদ্রসৈকত, জগন্নাথ মন্দির ও স্থানীয় খাবার উপভোগ করার পাশাপাশি হাতে সময় থাকলে ঘুরে আসতে পারেন কোনার্ক সূর্যমন্দির থেকেও।

সড়ক সফরে বেরোনোর আগে গাড়ির অবস্থা, টায়ার, জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরীক্ষা করে নিন। পাহাড়ি পথে কুয়াশা, তুষারপাত কিংবা বরফ জমার কারণে যাতায়াতে সমস্যা হতে পারে। কোথাও রাস্তা মেরামতির কাজ চললে সফরের সময়ও বেড়ে যেতে পারে। তাই বেরোনোর আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ জেনে নিন।

একটানা দীর্ঘক্ষণ গাড়ি চালানো এড়িয়ে নিয়মিত বিরতি নিন। পাহাড়ি ও দুর্গম পথে অভিজ্ঞ চালকের সাহায্য নেওয়া ভাল। রাস্তার সৌন্দর্য দেখতে গিয়ে যেন নিরাপত্তার সঙ্গে আপস না হয়। কারণ, দীর্ঘ সড়ক সফরে অনেক সময় গন্তব্যে পৌঁছোনোর পাশাপাশি মাঝপথের অচেনা দৃশ্যও হয়ে ওঠে বেড়ানোর স্মরণীয় অংশ।