জানেন কি, কোন শহর ‘প্রাচ্যের লন্ডন’ নামে পরিচিত?

ঔপনিবেশিক আমলের বিশাল সব স্থাপনা, পুরোনো রাস্তা, ঐতিহ্যবাহী বাজার আর নদীর পাড়ের ব্যস্ত জীবন সব মিলিয়ে একটি শহরের রয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। ব্রিটিশ শাসনের নানা স্মৃতি আজও ছড়িয়ে রয়েছে শহরটির আনাচকানাচে। পুরোনো ভবন, গির্জা, জাদুঘর ও ঐতিহাসিক স্থাপত্যের কারণে শহরটিকে অনেকে ‘প্রাচ্যের লন্ডন’ বলেও অভিহিত করেন। বলছি ভারতের কলকাতার কথা। বাংলাদেশের পর্যটকদের কাছেও পরিচিত এই শহর ইতিহাস, সংস্কৃতি, কেনাকাটা ও খাবারের স্বাদ নেওয়ার জন্য।

কেন কলকাতাকে ‘ভারতের লন্ডন’ বলা হয়?

কলকাতার সঙ্গে ব্রিটিশ শাসনামলের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। সেই সময়ের স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনার প্রভাব আজও শহরের বিভিন্ন এলাকায় স্পষ্ট। একসময় কলকাতার নাম ছিল ক্যালকাটা। ১৯১১ সাল পর্যন্ত এটি ছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। ওই সময়ে নির্মিত বহু প্রশাসনিক ভবন, গির্জা, স্মৃতিসৌধ ও অন্যান্য স্থাপনা আজও শহরের ঐতিহাসিক পরিচয় বহন করছে। কলকাতার পুরোনো এলাকায় ঘুরলে চোখে পড়বে ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্যশৈলীর নানা নিদর্শন।

কলকাতায় ঘুরে দেখবেন যে ৪ দর্শনীয় স্থান

কলকাতার ঐতিহাসিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে খুব বেশি পরিকল্পনার প্রয়োজন নেই। কয়েকটি পরিচিত দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার পাশাপাশি আশপাশের পুরোনো রাস্তাগুলোতেও সময় কাটাতে পারেন।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল (ছবি: সংগৃহীত)

১. ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল

কলকাতার অন্যতম পরিচিত স্থাপনা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। ব্রিটেনের রানি ভিক্টোরিয়ার স্মৃতিতে নির্মিত সাদা মার্বেলের এই সৌধ শহরের প্রধান আকর্ষণগুলোর একটি। বিশাল গম্বুজ, নান্দনিক স্থাপত্য আর চারপাশের সবুজ বাগান পর্যটকদের মুগ্ধ করে। ভবনের ভিতরে রয়েছে জাদুঘর। সেখানে সংরক্ষিত আছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন, ছবি ও শিল্পকর্ম। বাগানে কিছুটা সময় কাটানো কিংবা সৌধের সামনে ছবি তোলার জন্যও জায়গাটি বেশ জনপ্রিয়।

সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল (ছবি: সংগৃহীত)

২. সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের কাছেই অবস্থিত সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল। উনিশ শতকে নির্মিত এই গির্জাটি গথিক স্থাপত্যশৈলীর জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। উঁচু মিনার, সুন্দর খিলান ও রঙিন কাচের জানালা এর সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। কলকাতার ঔপনিবেশিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। ইতিহাস ও স্থাপত্যপ্রেমীদের জন্য জায়গাটি অবশ্যই দেখার মতো।

রাতের হাওড়া ব্রিজ (ছবি: সংগৃহীত)

৩. হাওড়া ব্রিজ

হুগলি নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা হাওড়া ব্রিজ কলকাতার অন্যতম পরিচিত প্রতীক। এই সেতু কলকাতা ও হাওড়া শহরকে যুক্ত করেছে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ও যানবাহন এই সেতু দিয়ে যাতায়াত করেন। বিশাল ইস্পাতের কাঠামো সেতুটিকে স্থাপত্যের দিক থেকেও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। হুগলি নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সেতুর দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন। বিশেষ করে সন্ধ্যার আলোয় সেতু ও নদীর পরিবেশ হয়ে ওঠে আরও মনোরম।

জেনারেল পোস্ট অফিস (জিপিও) (ছবি: সংগৃহীত)

৪. জেনারেল পোস্ট অফিস (জিপিও)

কলকাতার বিবিডি বাগ এলাকায় অবস্থিত জেনারেল পোস্ট অফিস বা জিপিও। বিশাল গম্বুজ, সাদা রঙের ভবন এবং ঔপনিবেশিক স্থাপত্যশৈলীর কারণে দূর থেকেই নজর কাড়ে এটি। শহরের অন্যতম ঐতিহাসিক ভবন হলেও আজও এখানে ডাকঘরের কাজ চলে। পুরোনো কলকাতার স্থাপত্য ও ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চাইলে এই জায়গাটিও ঘুরে দেখতে পারেন।

পুরোনো কলকাতার অলিগলিতেও রয়েছে আকর্ষণ

কলকাতাকে শুধু কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে শহরটির আসল স্বাদ পাওয়া যাবে না। শহরের অলিগলি, পুরোনো বাজার, বইপাড়া আর খাবারের দোকানেও রয়েছে আলাদা আকর্ষণ। রেস্তরাঁ ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পরিচিত পার্ক স্ট্রিটে ঘুরে দেখতে পারেন। বইপ্রেমীদের জন্য কলেজ স্ট্রিট বিশেষ আকর্ষণের জায়গা। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি বইয়ের দোকান, পুরোনো বইয়ের সম্ভার আর কলেজ স্ট্রিট কফি হাউস—সব মিলিয়ে জায়গাটির পরিবেশ অন্য রকম।

কলকাতায় গেলে কাটি রোল, ফুচকা ও রসগোল্লার মতো স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিতে ভুলবেন না। আর দুর্গাপুজোর সময়ে শহরে গেলে চোখে পড়বে বর্ণাঢ্য মণ্ডপ, আলোকসজ্জা ও উৎসবের আমেজ। এই সময় কলকাতার সাংস্কৃতিক জীবনকে আরও কাছ থেকে দেখার সুযোগ মেলে।

কীভাবে ঘুরবেন কলকাতা?

বাংলাদেশের পর্যটকেরা ঢাকা থেকে বিমান বা স্থলপথে কলকাতায় যেতে পারেন। শহরের ভেতরে চলাচলের জন্য মেট্রো, ট্যাক্সি এবং অ্যাপভিত্তিক ক্যাবের সুবিধা রয়েছে। এক দিনে ঘুরতে চাইলে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ও সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল দিয়ে শুরু করে বিবিডি বাগ এবং হুগলি নদীর পাড় ঘুরে দেখতে পারেন। হাতে আরও সময় থাকলে পার্ক স্ট্রিট ও কলেজ স্ট্রিটের জন্য আলাদা সময় রাখুন।

কলকাতার পরিচিতি শুধু ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্যে সীমাবদ্ধ নয়। শহরটির খাবার, বইপাড়া, বাজার, উৎসব ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। তাই ইতিহাসের খোঁজে হোক কিংবা কয়েক দিনের ছুটি কাটাতে, কলকাতা ভ্রমণে একসঙ্গে পাওয়া যায় অতীত ও বর্তমানের নানা স্বাদ।