এক পথেই সবুজ পাহাড়, বরফ আর মরুভূমি!

ফিচার ডেস্ক
০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১০:১০ আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১০:১০

হিমাচল প্রদেশের হামতা পাস ট্রেক হিমালয়ের অন্যতম আকর্ষণীয় অভিযান। প্রায় ১৪ হাজার ফুট উচ্চতার এই গিরিপথ একদিকে সবুজে ঘেরা কুলু উপত্যকা, অন্যদিকে রুক্ষ ও শুষ্ক লাহুল অঞ্চলের মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছে। কয়েক দিনের এই যাত্রায় হিমালয়ের প্রকৃতির নানা রূপ দেখার সুযোগ মেলে। তবে সৌন্দর্যের পাশাপাশি রয়েছে শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক দৃঢ়তার কঠিন পরীক্ষা।

ট্রেকের শুরু মানালি থেকে। সেখান থেকে জোবরার ঘন জঙ্গলের পথ পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় চিক্কা ও বালু কা ঘেরার বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে। এরপর পথ আরও দুর্গম হয়ে ওঠে। বরফে ঢাকা ও পাথুরে পথ ধরে এগিয়ে যেতে হয় শিয়া গোরুর উঁচু তৃণভূমির দিকে। প্রতিটি ধাপে বদলে যায় চারপাশের দৃশ্য।

পাথুরে ও বরফে ঢাকা পাহাড় (ছবি: পেক্সেলস)

সবুজ উপত্যকা থেকে বরফঢাকা পাহাড়

হামতা পাস ট্রেকের প্রথম পর্ব কুলু উপত্যকা। দেওদার, ওক ও পাইন গাছে ঘেরা এই পথে রয়েছে সবুজ তৃণভূমি, ছোট ছোট জলধারা এবং কাঠের সেতু। ফুলে ঢাকা পাহাড়ি পথ আর মৃদু বাতাসে হাঁটতে হাঁটতে প্রকৃতির কাছাকাছি পৌঁছে যান ট্রেকাররা।

উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পথ কঠিন হতে থাকে। হামতা পাসের দিকে এগোতে গেলে খাড়া ঢাল, বরফের আস্তরণ এবং সরু পাহাড়ি পথ পেরোতে হয়। একসময় সবুজ উপত্যকার জায়গা নেয় পাথুরে ও বরফে ঢাকা পাহাড়। গিরিপথের উপর থেকে চারপাশের সুউচ্চ হিমালয় শৃঙ্গের দৃশ্য মন ভরিয়ে দেয়।

হামতা পাস পেরিয়ে স্পিতি উপত্যকার দিকে নামতে শুরু করলেই বদলে যায় প্রকৃতি। সবুজের বদলে চোখে পড়ে রুক্ষ পাহাড়, পাথুরে ঢাল আর শুষ্ক প্রান্তর। প্রথম দেখায় এই পরিবেশ কিছুটা নির্জীব মনে হলেও এর নিজস্ব সৌন্দর্য রয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই প্রকৃতির এত রকম রূপ দেখার সুযোগ এই ট্রেককে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

এখানে তাঁবু টাঙিয়ে রাত কাটাতে পারবেন (ছবি: পেক্সেলস)

চ্যালেঞ্জের মুখে ট্রেকাররা

হামতা পাস ট্রেক শুধু মনোরম দৃশ্যের জন্য নয়, কঠিন পথের জন্যও পরিচিত। উঁচুতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে আসে। ফলে ক্লান্তি বাড়তে পারে, এমনকি উচ্চতাজনিত অসুস্থতার ঝুঁকিও থাকে। তাই ধীরে হাঁটা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া এবং শরীরের পরিস্থিতির দিকে নজর রাখা জরুরি।

গ্রীষ্মের শুরুতে পথের বিভিন্ন অংশে বরফ জমে থাকে। কোথাও সরু পাহাড়ি খাঁজ, কোথাও পিচ্ছিল ঢাল, আবার কোথাও পাথর ও বড় বড় নুড়ি পেরোতে হয়। হিমবাহ থেকে নেমে আসা বরফশীতল জলধারা পার হওয়াও এই অভিযানের অন্যতম কঠিন অভিজ্ঞতা। তাই ভালো গ্রিপযুক্ত ট্রেকিং জুতো এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম থাকা জরুরি।

হামতা পাস ট্রেকের সবুজ উপত্যকায় ফুটে থাকা রডোডেনড্রন (ছবি: পেক্সেলস)

হিমালয়ের উদ্ভিদ ও প্রাণিজগত

পাহাড়ের সৌন্দর্যের পাশাপাশি হামতা পাস ট্রেকে দেখা মেলে নানা ধরনের গাছপালা ও বন্যপ্রাণীর। নিচু এলাকার সবুজ তৃণভূমিতে ফুটে থাকতে পারে রডোডেনড্রন, অর্কিড এবং হিমালয়ের নীল পপি। উচ্চতা বাড়লে গাছপালার ধরনও বদলে যায়। প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে পারে এমন ছোট গুল্ম ও শ্যাওলা চোখে পড়ে।

ভাগ্য ভালো থাকলে পাহাড়ি পথে দেখা মিলতে পারে হিমালয়ান শিয়াল, মারমট এবং নীল ভেড়া বা ভরলের। পাথুরে ঢালে চড়ে বেড়াতে দেখা যায় এই বন্যপ্রাণীদের। কখনও বরফের উপর তুষারচিতার পায়ের ছাপও চোখে পড়তে পারে। এ ছাড়া পাহাড়ের খাঁজে বয়ে চলা স্বচ্ছ হিমবাহের জলধারা ও নির্জন পাথুরে পরিবেশ প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করে।

ট্রেকের শেষ আকর্ষণ চন্দ্রতাল

হামতা পাস ট্রেকের অন্যতম বড় আকর্ষণ চন্দ্রতাল হ্রদ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪,২৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই হ্রদের নামের অর্থ ‘চাঁদের হ্রদ’। হিন্দু পুরাণের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে এই জলাশয়ের নাম। কথিত আছে, দেবরাজ ইন্দ্রের রথ এই হ্রদের কাছেই এসে থেমেছিল।

চন্দ্রতালের জল দিনের বিভিন্ন সময়ে নানা রং ধারণ করে। সকালে গাঢ় নীল, আবার দুপুরের দিকে কখনও পান্নার মতো সবুজ দেখায়। চারপাশের বরফঢাকা পাহাড়ের প্রতিবিম্ব স্বচ্ছ জলে ফুটে ওঠে। দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর ট্রেকের শেষে এমন দৃশ্যের সামনে দাঁড়ানো নিঃসন্দেহে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।

হ্রদের আশপাশের নির্জন পরিবেশ এবং রাতে আকাশভরা তারা প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করে। ব্যস্ত জনজীবন থেকে দূরে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগও মেলে এখানে।

কখন যাবেন, কী প্রস্তুতি প্রয়োজন?

জুন থেকে সেপ্টেম্বর—বর্ষার সময় হামতা পাসের চারপাশ সবুজে ভরে ওঠে। তৃণভূমিতে ফুল ফোটে, জলধারাগুলিও প্রাণ ফিরে পায়। তবে এই সময়ে বৃষ্টি, পিচ্ছিল পথ এবং রাতের ঠান্ডা ট্রেককে কঠিন করে তুলতে পারে। তাই যাত্রার আগে শারীরিক প্রস্তুতি নেওয়া, আবহাওয়ার পূর্বাভাস জেনে রাখা এবং অভিজ্ঞ গাইডের সাহায্য নেওয়া জরুরি।

যারা হিমালয়ের বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি কাছ থেকে দেখতে চান এবং একই সঙ্গে রোমাঞ্চকর অভিযানের স্বাদ পেতে চান, তাঁদের জন্য হামতা পাস ট্রেক হতে পারে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। তবে উচ্চতা ও দুর্গম পথের কথা মাথায় রেখে যথাযথ প্রস্তুতি নিয়েই এই যাত্রায় বেরোনো উচিত।

/এমএএল/
সম্পর্কিত
অযোধ্যা-জনকপুর যাতায়াত সহজ করতে চালু হচ্ছে ট্রেন
নামেও মায়া, রূপেও অনন্য পাথারিয়া পাহাড়
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
সর্বশেষ খবর
আন্দোলন-উত্তেজনা পেরিয়ে কর্মচঞ্চল সাভার-আশুলিয়া
আন্দোলন-উত্তেজনা পেরিয়ে কর্মচঞ্চল সাভার-আশুলিয়া
‘আমরা সবজির ওপরই নির্ভরশীল, মাছ-মাংস জোটে কালেভদ্রে’
‘আমরা সবজির ওপরই নির্ভরশীল, মাছ-মাংস জোটে কালেভদ্রে’
খুলনা নগরীতে ৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খুন চলতি বছরে, কারণ কী
খুলনা নগরীতে ৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খুন চলতি বছরে, কারণ কী
রোনালদোর বিদায়ে মেসির নীরবতা জন্ম দিয়েছে আলোচনার
রোনালদোর বিদায়ে মেসির নীরবতা জন্ম দিয়েছে আলোচনার
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রাম, সিলেট, নোয়াখালী ফিরিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে: বিজেপি এমপি নিশিকান্ত
চট্টগ্রাম, সিলেট, নোয়াখালী ফিরিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে: বিজেপি এমপি নিশিকান্ত
আ.লীগের মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলা, ওসিসহ ৬ সদস্য আহত
আ.লীগের মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলা, ওসিসহ ৬ সদস্য আহত
পেঁয়াজের দাম কমেছে কেজিতে ১৫ টাকা
পেঁয়াজের দাম কমেছে কেজিতে ১৫ টাকা
সুন্দরবনের জলদস্যু জোনাব বাহিনীর প্রধানকে যেভাবে গ্রেফতার করলো এসআরবি
সুন্দরবনের জলদস্যু জোনাব বাহিনীর প্রধানকে যেভাবে গ্রেফতার করলো এসআরবি
বিমানযাত্রীর ব্যাগে ১৩০০ গৌরী ক্রিম, পাকিস্তান থেকে দুবাই হয়ে এলো বাংলাদেশে
বিমানযাত্রীর ব্যাগে ১৩০০ গৌরী ক্রিম, পাকিস্তান থেকে দুবাই হয়ে এলো বাংলাদেশে