সবুজে ঢাকা পাহাড়, পাথরের বুক ছুঁয়ে বয়ে চলা স্বচ্ছ জলধারা, নাম না-জানা বনফুলের সুবাস আর পাখির ডাক। প্রকৃতির এমন নিবিড় সান্নিধ্য পেতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন মৌলভীবাজারের পাথারিয়া পাহাড় থেকে। বড়লেখা উপজেলায় অবস্থিত এই পাহাড়ের আগের নাম ছিল আদম আইল। এখানকার পাহাড়ি ঝরনা ও সবুজ অরণ্য প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক অন্যরকম আকর্ষণ।
পাথারিয়া পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা জলধারাই তৈরি করেছে বিখ্যাত মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত। তবে শুধু মাধবকুণ্ড নয়, পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে আরও কয়েকটি ঝরনা। ঝেরঝেরি, কাখড়া ছড়ি, ফুল ঢালনি ঝেরঝেরি এবং ইটাউরি ফুলবাগিচা—স্থানীয় মানুষের দেওয়া এমন মিষ্টি নামেই পরিচিত ঝরনাগুলি। পাহাড়ের উঁচু-নিচু টিলা, ঘন গাছপালা আর পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলা জলধারা মিলিয়ে জায়গাটির সৌন্দর্য যেন আরও বেড়ে গিয়েছে।
ঝরনার কাছে পৌঁছনোর পথ অবশ্য খুব সহজ নয়। দুর্গম পাহাড়ি ছড়া ধরে হেঁটে যেতে হয়। কোথাও ছোট-বড় পাথর, কোথাও সরু জলধারা। তবে পথের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয় চারপাশের প্রকৃতি। স্বচ্ছ শীতল পানির শব্দ, সবুজ বনভূমি, বনফুলের সুবাস, পাখির ডাক আর ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজ সব মিলিয়ে এক শান্ত পরিবেশের দেখা মেলে।
প্রায় ২৪ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত পাথারিয়া পাহাড় বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তবর্তী খাসিয়া-জয়ন্তিয়া পাহাড়ি অঞ্চলের একটি বর্ধিত অংশ। এর অপর অংশ ভারতের আসামে বিস্তৃত। পাহাড়ের উঁচু জায়গা থেকে আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে ভারতের করিমগঞ্জ জেলার দৃশ্যও চোখে পড়ে।
একসময় এই অঞ্চল ঘন অরণ্যে ঢাকা ছিল। স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, প্রায় এক হাজার বছর আগে এখানে পাথরি নামে নাগা জনগোষ্ঠীর একটি শাখার বসবাস ছিল। তাদের নাম থেকেই এলাকার নাম পাথারিয়া হয়েছে বলে মনে করা হয়। একসময় পাহাড়ে প্রচুর কমলালেবুর গাছ দেখা যেত। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমেছে। তবে আগর-আতর গাছের জন্য এখনও পরিচিত এই বনাঞ্চল। নাগকেশর, বাঁশ, বেত-সহ নানা ধরনের উদ্ভিদও রয়েছে এখানে।
পাথারিয়ার আর একটি কৌতূহলোদ্দীপক ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে একটি পরিত্যক্ত তেলকূপকে ঘিরে। ১৯৩৩ সালে তৎকালীন সরকার বার্মা অয়েল কোম্পানির মাধ্যমে এখানে তেল উত্তোলনের উদ্যোগ নিয়েছিল। পরে পাইপ ফেটে যাওয়ায় এলাকায় তেল ছড়িয়ে পড়ে বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। বর্তমানে কূপটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই পুরনো তেলকূপও জায়গাটির ইতিহাসে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।
কী ভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাস অথবা ট্রেনে মৌলভীবাজারের বড়লেখায় যাওয়া যায়। ট্রেনে যেতে চাইলে কমলাপুর থেকে সিলেটগামী আন্তঃনগর ট্রেনে কুলাউড়া নেমে সেখান থেকে বাস বা সিএনজিতে বড়লেখা যেতে পারেন। বড়লেখা থেকে ডিমাই হয়ে পাথারিয়া পাহাড়ের দিকে যাওয়া যায়। বাসে যেতে চাইলে ফকিরাপুল বা সায়েদাবাদ থেকে রূপসী বাংলা ও শ্যামলী পরিবহণ এবং মহাখালী থেকে এনা পরিবহণের বাস পাওয়া যায়। যাত্রার আগে বাস ও ট্রেনের সময়সূচি এবং স্থানীয় যাতায়াতের ব্যবস্থা জেনে নেওয়া ভালো।
কোথায় থাকবেন
পাথারিয়া এলাকায় জেলা পরিষদের বাংলো এবং স্থানীয় আবাসিক হোটেলে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানা যায়। তবে আগে থেকে বুকিং ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া জরুরি। চাইলে মৌলভীবাজার বা সিলেট শহরের হোটেলেও থাকতে পারেন। পাহাড়ি পথে হাঁটার জন্য উপযুক্ত জুতো, পানীয় জল ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখুন। স্থানীয় পরিবেশ পরিষ্কার রাখুন এবং ঝরনা বা ছড়ায় নামার আগে পানির গভীরতা ও স্রোত সম্পর্কে সতর্ক থাকুন।