মরুভূমির বুকে বিস্তীর্ণ লবণভূমি, চারদিকে খাঁ খাঁ প্রান্তর, দূরে পাহাড়ের সারির দৃশ্যপটে যেন অন্য এক পৃথিবী। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত ডেথ ভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক প্রকৃতিপ্রেমী ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালেই রয়েছে প্রকৃতির ভয়ংকর এক রূপ। বিশ্বের উষ্ণতম স্থান হিসেবে পরিচিত এই উপত্যকায় গ্রীষ্মে তাপমাত্রা ৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপর উঠে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
সাম্প্রতিক এক মর্মান্তিক ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে ডেথ ভ্যালির বিপজ্জনক দিক। ১৭ আগস্ট ২০২৬, ৬৮ বছর বয়সী ফরাসি পর্যটক পিয়ের মিশেল ফরমোস এবং তার এক সফরসঙ্গী পার্কের দুর্গম ওয়েস্ট সাইড রোড দিয়ে যাওয়ার সময় কাদায় গাড়ি আটকে পড়েন। সেদিন সেখানে তাপমাত্রা উঠেছিল ১১৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
গাড়ি আটকে যাওয়ার পর কাছাকাছি আর কোনও যানবাহন না থাকায় দুজন সাহায্যের সন্ধানে লবণভূমির ওপর দিয়ে হেঁটে ব্যাডওয়াটার রোডের দিকে রওনা দেন। প্রায় ১ দশমিক ৩ মাইল হাঁটার পর ফরমোস আর এগোতে পারেননি। তার সফরসঙ্গী সাহায্য চাইতে এগিয়ে যান এবং পরে একটি গাড়ির চালকের সহায়তায় বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানান। উদ্ধারকারী দল ও হাইওয়ে প্যাট্রোলের হেলিকপ্টার তাকে খুঁজে পেলেও ঘটনাস্থলেই তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ তদন্তাধীন।
এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, ডেথ ভ্যালি শুধু একটি দর্শনীয় স্থান নয়, এটি একই সঙ্গে অত্যন্ত প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ।
কেন এত গরম ডেথ ভ্যালি?
ডেথ ভ্যালির ভৌগোলিক অবস্থানই এর চরম উষ্ণতার অন্যতম কারণ। উপত্যকার তলদেশ সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে এবং চারদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা। সূর্যের তাপে উত্তপ্ত বাতাস ওপরে উঠলেও পাহাড়ের কারণে সহজে বের হতে পারে না। ফলে একই উষ্ণ বাতাস বারবার ঘুরে আরও উত্তপ্ত হয়।
১৯১৩ সালের ১০ জুলাই ফার্নেস ক্রিকে ১৩৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৫৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়, যা পৃথিবীর সর্বোচ্চ নথিভুক্ত বায়ুর তাপমাত্রার রেকর্ড হিসেবে পরিচিত। ২০২০ ও ২০২১ সালেও সেখানে ১৩০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের কাছাকাছি তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে।
শুধু তাপমাত্রাই নয়, ডেথ ভ্যালি উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে নিচু ও শুষ্ক অঞ্চলগুলোর একটি। ব্যাডওয়াটার বেসিনের অবস্থান সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ২৮২ ফুট নিচে।
তাহলে কেন যাবেন ডেথ ভ্যালিতে?
চরম আবহাওয়ার পাশাপাশি ডেথ ভ্যালির প্রাকৃতিক দৃশ্যও অসাধারণ। বিশাল লবণভূমি, মরুভূমির বালিয়াড়ি, রঙিন পাথুরে পাহাড় ও বিস্তীর্ণ উপত্যকা ভ্রমণকারীদের আকর্ষণ করে। শীত ও বসন্তে এখানকার আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে আরামদায়ক হওয়ায় সে সময় ভ্রমণ অনেক বেশি উপযোগী।
তবে গ্রীষ্মে এই পার্কে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা জরুরি। বিশেষ করে নিচু এলাকায় দিনের বেলা হাঁটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
ভ্রমণে গেলে যা মনে রাখা জরুরি
ডেথ ভ্যালিতে ভ্রমণের আগে আবহাওয়া ও রাস্তার পরিস্থিতি সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেওয়া জরুরি। পার্ক কর্তৃপক্ষের পরামর্শ অনুযায়ী, গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে নিচু এলাকায় হাঁটা এড়িয়ে চলা এবং পাকা সড়কে অবস্থান করাই নিরাপদ। পর্যাপ্ত পানি ও জরুরি সরঞ্জাম সঙ্গে রাখা উচিত।
দুর্গম পথে যাওয়ার ক্ষেত্রে গাড়িটি সেই রাস্তার উপযোগী কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। অনেক দুর্গম সড়কে উচ্চ-গ্রাউন্ড-ক্লিয়ারেন্স বা চার চাকার গাড়ির প্রয়োজন হতে পারে। মোবাইল নেটওয়ার্ক না-ও থাকতে পারে, তাই প্রয়োজনে স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা বা জরুরি সংকেত পাঠানোর যন্ত্র সঙ্গে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, দুর্গম এলাকায় গাড়ি বিকল হয়ে গেলে গাড়ি ছেড়ে হেঁটে বের হওয়ার পরিবর্তে সাধারণত গাড়ির কাছেই অবস্থান করা নিরাপদ। কারণ গাড়ি ছায়া ও আশ্রয় দিতে পারে এবং খোলা মরুভূমিতে হেঁটে যাওয়া মানুষের তুলনায় উদ্ধারকারী দলের পক্ষে গাড়িকে খুঁজে পাওয়া সহজ।
ডেথ ভ্যালি তাই একই সঙ্গে বিস্ময় ও সতর্কতার জায়গা। প্রকৃতির অসাধারণ সৌন্দর্য উপভোগ করতে এখানে আসা যায়, কিন্তু সেই সৌন্দর্যের কাছে যাওয়ার আগে জানতে হবে তার কঠিন নিয়মগুলোও। সঠিক সময়, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি এবং নিরাপত্তাবিধি মেনে চললেই ডেথ ভ্যালির ভয়ংকর উষ্ণতার মাঝেও উপভোগ করা সম্ভব এক অনন্য মরুভূমি-অভিজ্ঞতা।