পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, কমিউনিটি পুলিশিংয়ের চলমান কার্যক্রমকে বাস্তবায়ন করতে দেশব্যাপী ৪০ হাজার ৯০৮টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটিতে ৯ লাখ ৫৮ হাজার ৪৬ জন সদস্য কাজ করছেন। ২০১৫ সাল থেকে ২০১৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত জমিজমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়েছে ৩৭ হাজার ৭২৩টি। এছাড়া, টাকা-পয়সা সংক্রান্ত বিরোধ ২২ হাজার ২১৫টি, স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ ২৪ হাজার ৫৯৬টি, মারামারি সংক্রান্ত ৩৬ হাজার ৫৮টি, পারিবারিক ২৩ হাজার ৯৭৪টি ও অন্যান্য বিষয়ে ৪৪ হাজার ৪৭৯টি বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কমিউনিটি পুলিশিংয়ে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। আস্থা কম থাকায় পুলিশের কোনও আহ্বানে সহজে সাড়া দিতে চায় না জনগণ। পুলিশ ও জনগণ— উভয়ের মধ্যেই পুরানো ধ্যান-ধারণা কাজ করে। কমিউনিটি পুলিশিং নিয়ে স্বচ্ছ ধারণাও নেই অনেকের। জনগণের পক্ষ থেকে স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা করা হয় না পুলিশকে। পুলিশ ইচ্ছা করলে সবই পারে— এমন ধারণাও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের বড় বাধা।
অন্যদিকে রুটিন ডিউটির বাইরে হওয়ায় বাড়তি ঝামেলা মনে করে পুলিশ সদস্যরাও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের ধারণা দিতে এগিয়ে যান না। তাছাড়া এ খাতে কোনও অর্থ বরাদ্দ নেই। জনগণের কাছ থেকে আর্থিক অনুদান নিয়ে এমন কাজ করা অনেক কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে চাঁদাবাজির অভিযোগও উঠে। তাছাড়া জনগণের প্রত্যাশা ও মতামতের মূল্য দিতে চান না অনেক পুলিশ সদস্যই।
পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, ১৯৯৩ সালে ময়মনসিংহে প্রথম পুলিশ জনগণের সহযোগিতায় অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল। ওই সময় ময়মনসিংহ শহরে সম্পত্তি সংশ্লিষ্ট অপরাধ, চুরি ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেজন্য তখন রাতে প্যাট্রল ডিউটির জন্য টাউন ডিফেন্স পার্টি (টিডিপি) গঠন করা হয়। এই কার্যক্রমের উদ্দেশ্য ছিল স্বল্প সময়ের জন্য কিছু অপরাধ দমনে পদক্ষেপ নেওয়া। তারই আদলে ২০০৭ সালে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজির তত্ত্বাবধানে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। ২০০৮ সালে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি এই কার্যক্রম শুরু করেন।
২০১৪ সালে পুলিশ সদর দফতরের অরগানোগ্রামে ডিআইজি’র (অপারেশন্স) অধীনে একজন এআইজি’র তত্ত্বাবধানে পাবলিক সেফটি অ্যান্ড ক্রাইম প্রিভেনশন (পিএস অ্যান্ড সিপি) শাখার কার্যক্রম শুরু হয়। ওই উদ্যোগই বর্তমানে কমিউনিটি পুলিশিং নামে পরিচিত। বর্তমানে দেশের সব জেলাতেই কমিউনিটি পুলিশিং সেল রয়েছে এবং প্রতিটি থানায় রয়েছেন কমিউনিটি পুলিশিং অফিসার। এছাড়া, দেশের প্রতিটি ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলায় কমিউনিটি পুলিশিং কমিটি কার্যকর রয়েছে। সেসব কমিটিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজ, সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তাসহ সমাজের সব স্তরের জনগণের অংশগ্রহণ রয়েছে। সারাদেশে পরিবহন সেক্টরেও কমিউনিটি পুলিশিং কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সালিশের মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসার কাজ পুলিশ করতে পারে কিনা বা এর কোনও আইনগত ভিত্তি আছে কিনা— জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) সহেলী ফেরদৌস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অবশ্যই পারে এবং এর আইনগত ভিত্তিও রয়েছে। হত্যা, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতিসহ আমলযোগ্য অপরাধ ছাড়া আমল অযোগ্য সব ঘটনাই সামাজিকভাবে মীমাংসা করার সুযোগ রয়েছে। কোনও অধ্যাদেশ বা আইনের মাধ্যমে উদ্ভাবন না হলেও প্রচলিত আইনে স্থানীয়ভাবে কমিউনিটি পুলিশের কার্যক্রমে কোনও বাধা নেই।’
সহেলী ফেরদৌস বলেন, ‘পুলিশ রেগুলেশনের ৩২ প্রবিধি মোতাবেক জনসাধারণের প্রতিনিধি হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের পুলিশি কাজে সহায়তা চাওয়ার বিধান আছে। কমিউনিটি পুলিশ হচ্ছে পুলিশকে সহায়তার জন্য জনগণের একটি সংগঠিত শক্তি। সমাজের সালিসি ব্যবস্থা প্রকারান্তরে কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থারই একটি অংশ।’
কমিউনিটি পুলিশিংয়ের কমিটিতে থাকা বিতর্কিত ব্যক্তি ও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রসঙ্গে এআইজি সহেলী ফেরদৌস বলেন, ‘দলীয় আদর্শ যে কারও মধ্যে থাকতেই পারে। তবে এ কমিটির সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে করা হবে— আমরা সেটাই চাই। কেউ প্রভাব খাটাতে চায়— এমন অভিযোগ আমাদের কাছে এলে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সেটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।’ কমিউনিটি পুলিশিংয়ের আওতায় ওপেন হাউজ ডে, মতবিনিময় ও অপরাধ বিরোধ সভা, উঠান বৈঠক এবং দৃশ্যমান টহলের মাধ্যমে অপরাধ প্রবণতা অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।