আবু সাঈদ হত্যা: ময়নাতদন্ত, জাতিসংঘের প্রতিবেদন ও ট্রাইব্যুনালের রায়ে কী প্রতিষ্ঠিত হলো

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ড। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই মামলার রায়ে চিকিৎসা-প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, আলামত, ভিডিওচিত্র এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয়ের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্ট পর্যালোচনা করে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে।

মামলার বিবরণী থেকে জানা গেছে, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে সারা দেশে যখন আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই দুপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পার্ক মোড়ে গুলিবিদ্ধ হন আবু সাঈদ। ২৫ বছর বয়সী আবু সাঈদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন।

ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২০২৫ সালের ২৪ জুন ৩০ জনকে আসামি করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। পরে ৬ আগস্ট আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর বিচার শেষে গত ৯ এপ্রিল এ মামলার রায় ঘোষণা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল।

গত ১৪ জুন এ মামলার ৮০৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সে রায়ে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তর্কিত আবু সাঈদের মৃত্যুর বিস্তর বর্ণনা তুলে আনেন ট্রাইব্যুনাল। 

মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত

ট্রাইব্যুনাল সর্বপ্রথম আবু সাঈদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণকে মামলার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। ট্রাইব্যুনাল বলেন, ময়নাতদন্ত করা চিকিৎসক, তদন্ত কর্মকর্তা, সুরতহাল প্রতিবেদন, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট, আলোকচিত্র এবং অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের সম্মিলিত মূল্যায়নে এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে আবু সাঈদের মৃত্যু বন্দুক থেকে ছোড়া গুলির আঘাতে সৃষ্ট একাধিক পূর্ব-আঘাতজনিত ক্ষত, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং শকের কারণে সংঘটিত হয়েছে।

ময়নাতদন্ত করা চিকিৎসক আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে জানান, নিহতের মাথা, মুখমণ্ডল, বুক, পেট ও উরুসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে বহু প্রবেশকারী ক্ষত, শরীরের ভেতরে ধাতব পেলেট, বক্ষ ও উদর গহ্বরে জমাট রক্ত এবং অভ্যন্তরীণ অঙ্গ ও রক্তনালীর মারাত্মক ক্ষতি পাওয়া যায়—যা আগ্নেয়াস্ত্রের গুলির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আসামিপক্ষের আপত্তি গ্রহণ করেনি ট্রাইব্যুনাল

আসামিপক্ষ দাবি করেছিল যে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে সিভিল সার্জনের স্বাক্ষর ছিল না এবং এক্স-রে পরীক্ষা করা হয়নি। তবে ট্রাইব্যুনাল মত দেন, এসব বিষয় প্রক্রিয়াগত ত্রুটি হলেও এগুলো চিকিৎসা-প্রমাণকে অগ্রহণযোগ্য বা অবিশ্বস্ত করে না। ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেন, জেরার সময়ও আসামিপক্ষ চিকিৎসকের সাক্ষ্যে কোনও গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি প্রমাণ করতে পারেনি।

একইভাবে সুরতহাল প্রতিবেদনে আগ্নেয়াস্ত্রের আঘাত স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলেও ট্রাইব্যুনাল বলেন, সুরতহাল একটি প্রাথমিক নথি, এটি কখনোই ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানকে অতিক্রম করতে পারে না।

পোশাকে গুলির চিহ্ন না থাকলেও প্রমাণ দুর্বল হয়নি

জব্দ করা টি-শার্টের অংশে দৃশ্যমান গুলির চিহ্ন না থাকায় আসামিপক্ষ প্রশ্ন তুললেও ট্রাইব্যুনাল তা গ্রহণ করেননি। ট্রাইব্যুনাল বলেন, উদ্ধার করা কাপড়টি পুরো পোশাকের অংশ ছিল না এবং তা গুলির প্রবেশস্থলকেই প্রতিনিধিত্ব করে—এমন কোনও প্রমাণ নেই।

বরং, ময়নাতদন্তে শরীরে একাধিক প্রবেশকারী ক্ষত ও ধাতব প্লেট পাওয়ার বিষয়টি অধিক নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা-প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

পুলিশের গুলিতেই নিহত হন আবু সাঈদ

প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য, আলোকচিত্র, ভিডিও এবং অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করে ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের সময় আবু সাঈদ প্রাণঘাতী গুলিবিদ্ধ হন।

আদালতের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাকালে তিনি আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে ছিলেন না, বরং দুই হাত প্রসারিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, এবং সেই অবস্থায় পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন।

জুলাই-আগস্ট ছিল সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত নাগরিক আন্দোলন

রায়ে ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৭ ও ৩৮ অনুচ্ছেদের আলোকে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠন করার মৌলিক অধিকারের বিষয়টি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

আদালত বলেন, জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর আন্দোলন মূলত শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি নাগরিক আন্দোলন, যার উদ্দেশ্য ছিল বৈষম্যবিরোধী দাবি ও কোটা সংস্কার।

শুধু কিছু বিক্ষোভকারীর হাতে লাঠি বা আত্মরক্ষামূলক বস্তু থাকার কারণে এই আন্দোলনকে সশস্ত্র বিদ্রোহ বা সামরিক অভিযান হিসেবে গণ্য করা যায় না।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনকে গুরুত্ব দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল

২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয়ের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টকে ট্রাইব্যুনাল একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, নিরপেক্ষ ও উচ্চ প্রমাণমূল্যসম্পন্ন সহায়ক দলিল হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

রায়ে উল্লেখ করা হয়, ভিডিও ফুটেজ, স্থানের অবস্থান নির্ণয়, ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে জাতিসংঘের তদন্তে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া হয়েছে যে আবু সাঈদকে প্রায় ১৪ মিটার দূরত্ব থেকে ধাতব পেলেটযুক্ত শটগান দিয়ে অন্তত দুইবার গুলি করা হয়েছিল এবং এটি ছিল পুলিশের ইচ্ছাকৃত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড।

হত্যাকাণ্ডকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে অভিহিত

সবশেষে ট্রাইব্যুনাল বলেন, উপস্থাপিত চিকিৎসা-প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, ভিডিও, আলামত এবং জাতিসংঘের প্রতিবেদনের সম্মিলিত মূল্যায়নে এটি প্রমাণিত হয়েছে যে আবু সাঈদকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হয়েছে।

আদালতের মতে, এই হত্যাকাণ্ড কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; বরং বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে পরিচালিত ব্যাপক ও পরিকল্পিত আক্রমণের অংশ, যা আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ধারা ৩(২)(ক) অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে ‘হত্যা’-এর সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে।

রায়ে আরও বলা হয়, ঘটনাকালে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের কোনও আইনসম্মত বা আনুপাতিক প্রয়োজনীয়তা ছিল না। ফলে আবু সাঈদের হত্যাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর অধীনে ‘হত্যা’ হিসেবে গণ্য করার জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান আদালতের কাছে প্রমাণিত হয়েছে।

আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়ে সন্তুষ্ট কিনা এ বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ নেবে কিনা, সে বিষয়ে জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমি রায়টি পড়েছি। আমি ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কোনও প্রয়োজন দেখছি না। আমি মনে করি, এটি যথাযথ রায় হয়েছে। তাই আপিল করে শুধু শুধু রায়টি স্থগিতের (আপিলের দায়েরের কারণে) দিকে নিয়ে যাওয়ার কোনও কারণ দেখছি না।’’

আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ে দুজনকে মৃত্যুদণ্ড, তিন জনকে যাবজ্জীবন, পাঁচ জনকে ১০ বছর, আট জনকে ৫ বছর ও ১১ জনকে ৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একইসঙ্গে একজনের হাজতবাসকে সাজার মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে বলে গণ্য করা হয়।

সাজাপ্রাপ্ত হলেন যারা

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন—রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। আর যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত তিন জন হলেন—সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন ও বেরোবির সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব।

১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন—রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. হাসিবুর রশিদ ওরফে বাচ্চু, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, বেরোবির গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোক-প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল ওরফে আসাদ ও ছাত্রলীগের বেরোবি শাখার সভাপতি পোমেল বড়ুয়া। তারা সবাই পলাতক।

৫ বছরের কারাদণ্ড পাওয়া আসামিরা হলেন— আরএমপির সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু, সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ ওরফে দিশা, ছাত্রলীগের বেরোবি শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ, বেরোবির অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. সারোয়ার হোসেন ওরফে চন্দন।

তিন বছরের সাজা পেয়েছেন বেরোবির সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান, সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ, বেরোবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, সহ-সভাপতি ফজলে রাব্বী ওরফে গ্লোরিয়াস ফজলে রাব্বী, সহ-সভাপতি আখতার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ ওরফে আরিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার ওরফে টগর, দফতর সম্পাদক বাবুল হোসেন, বেরোবির এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মণ্ডল, এমএলএসএস একেএম আমির হোসেন ওরফে আমু ও সিকিউরিটি গার্ড নূর আলম মিয়া।

এছাড়া বেরোবির প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ ওরফে আপেলের হাজতবাসকে সাজার মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে বলে গণ্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।