গুলশানে স্পার আড়ালে ‘অনৈতিক কারবার’, নেপথ্যে কারা

রাজধানীর গুলশান ও বনানীর অভিজাত এলাকায় স্পা সেন্টারের আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মাদকের কারবার চলছে- এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব স্পা পরিচালনায় রয়েছে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। থানা পুলিশসহ পুলিশের বিভিন্ন উইং এবং স্থানীয় সন্ত্রাসীদের ‘ম্যানেজ’ করেই তারা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি এসব স্পা সেন্টারে ধারাবাহিক অভিযানে প্রায় শতাধিক নারী-পুরুষ গ্রেফতারের পর নেপথ্যের এই সিন্ডিকেটের কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র, পুলিশ ও নিজস্ব অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন—বাহার, কুদ্দুস, নুরুল ইসলাম, হিরা, পায়েল, শাহ আলম, পান্নু, বাবুল, দিপু, জনি, ফয়সাল, রবিন, এরশাদ, হুমায়ুন, মিরাজ ও মেঘলা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সূত্রের মাধ্যমেও এসব নাম নিশ্চিত হওয়া গেছে। কারও কারও সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেও তারা এ কারবারে যুক্ত বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে সাংবাদিক পরিচয় শোনার পর তারা এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন।

গুলশান-বনানীতে অর্ধশতাধিক স্পা

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গুলশান-১, গুলশান-২ ও বনানীতে অর্ধশতাধিক ছোট-বড় স্পা রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব স্পা অনৈতিক কারবার ও মাদকের নিরাপদ আখড়া হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, অভিজাত এলাকার এটি একটি কালো দিক।

গুলশান-১-এর মোড় সংলগ্ন খুশবু রেস্টুরেন্ট, রবি টাওয়ার, গুলশান-২-এর ২৪, ৫৫, ৯৫ ও ৯৯ নম্বর রোড এবং বনানীর স্টার কাবাব সংলগ্ন এলাকা ও আওয়াল টাওয়ারে স্পা সেন্টার রয়েছে বলে জানা যায়।

এসব প্রতিষ্ঠানের কোনও ধরনের সাইনবোর্ড নেই। বাইরে থেকে দেখেও ভেতরে এ ধরনের অনৈতিক ও মাদকের কারবার চলে বলে বোঝার উপায় নেই।

বনানীর স্পা চালান শাওন

গুলশান-বনানী রোডের ব্রিজ পার হয়ে বনানীর দিকে হাতের বাঁ পাশে একটি ভবনে ঢাকা ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সকাল থেকে প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত এলাকাটি কোলাহলপূর্ণ থাকে। ভবনটির সাত তলায় রয়েছে একটি স্পা সেন্টার।

স্থানীয়দের অভিযোগ, স্পা সেবার আড়ালে সেখানে অনৈতিক কারবার চলে। তাদের দাবি, শাওন নামের এক ব্যক্তি ওই স্পা সেন্টারের মালিক। অদৃশ্য এক শক্তির বলে তিনি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করেও কোনও ফল হয়নি। উল্টো হুমকি দেওয়া হয় বলে জানান তারা।

অভিযোগের বিষয়ে শাওনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি ‘ব্যস্ত আছি’ বলে লাইন কেটে দেন। পরে তিনি আর ফোন ধরেননি।

গুলশান-২-এ রত্নার বিরুদ্ধে অভিযোগ

গুলশান-২ গোলচত্বরের পাশের একটি ভবনের নিচে রয়েছে রেস্টুরেন্ট। সেখানে কিংফিশার নামের বার ও ‘এইচ হোটেল’ নামে একটি আবাসিক হোটেল রয়েছে। জনসমাগমপূর্ণ ওই ভবনেই স্পার আড়ালে অনৈতিক কারবার চলার অভিযোগ রয়েছে।

রত্না নামের এক নারী এই কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তাদের দাবি, কেউ এ বিষয়ে কথা বললে হুমকি দেওয়া হয়। তার ছত্রছায়ায় থাকা সহযোগীরা অনেককে মারধরও করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে রত্নার কাছে জানতে চাইলে তিনি স্পা পরিচালনার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘অন্যরা যেভাবে পরিচালনা করছে, আমিও সেভাবে চালাই।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কোনটা নৈতিক আর কোনটা অনৈতিক জেনেই এই ব্যবসা করছি।’

কবরস্থানের উল্টো পাশেও স্পা

বনানী কবরস্থানের রাস্তার পূর্ব পাশে কবরস্থান এবং পশ্চিম পাশে আবাসিক বাড়িঘর। কবরস্থানের ঠিক উল্টো পাশেই একটি স্পা সেন্টার রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানেও প্রকাশ্যেই অনৈতিক কারবার চলে।

তাদের দাবি, শহীদ নামের এক ব্যক্তি বছরের পর বছর এ কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন। কবরস্থান ও আবাসিক এলাকা হওয়ায় স্থানীয় পুলিশকে একাধিকবার জানানো হলেও কোনো কাজ হয়নি। উল্টো শহীদ আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ তাদের।

অভিযোগের বিষয়ে শহীদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পরপরই তিনি ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার কল করলেও তিনি আর ফোন ধরেননি।

অনলাইনে প্রচারণা, অফলাইনে গ্রাহক সংগ্রহে এজেন্ট

‘ঢাকা ডায়মন্ড স্পা’ সেন্টারের নিজস্ব ওয়েবসাইট রয়েছে। সেখানে থাই ম্যাসাজ, সুইডিশ ম্যাসাজ, পায়ের ম্যাসাজ, মাথার ম্যাসাজ, ড্রাই ম্যাসাজ, হট অয়েল ম্যাসাজ, ডিপ টিস্যু ম্যাসাজ, স্ক্রাব থেরাপি, ফুল বডি ম্যাসাজ, ফোর হ্যান্ড ম্যাসাজ, অ্যারোমা ম্যাসাজ ও হট স্টোন থেরাপিসহ বিভিন্ন সেবার কথা বলা হয়েছে।

‘ঢাকা ডায়মন্ড স্পা’ সেন্টারের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া ছবি

ওয়েবসাইটে এসব সেবার প্রচারণায় নারীদের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। স্পাটির তথ্য অনুযায়ী, হেড ম্যাসাজের খরচ ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা, সুইডিশ ম্যাসাজ ৮ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকা, ডিপ টিস্যু ম্যাসাজ ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা, হট অয়েল ম্যাসাজ ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা, ড্রাই ম্যাসাজ ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা, ব্যাক ম্যাসাজ ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা, বডি স্ক্রাব ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা এবং হট স্টোন থেরাপির খরচ ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা।

ওয়েবসাইটে ‘সাগর ভাই’ নামে একজনের নম্বর দেওয়া রয়েছে। ওই নম্বরে ফোন করে সার্ভিস সম্পর্কে জানতে চাইলে সাগর নামে পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি বিভিন্ন সার্ভিসের কথা জানান। পরে সাংবাদিক পরিচয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই ব্যবসা তিনি আর করছেন না।

ওয়েবসাইট এখনও সচল কেন—জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরিচিত কয়েকজন এখনও ব্যক্তিগতভাবে সার্ভিস দেন। কাস্টমার পেলে তিনি তাদের কাছে পাঠিয়ে দেন। তিনি এখন গ্রামের বাড়ি বরিশালে অবস্থান করছেন বলেও জানান।

অনলাইনের পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পথেঘাটে মোবাইল নম্বরসহ ভিজিটিং কার্ড ফেলে রাখা হয়। একেক রঙের কার্ডে ‘অমুক ভাই’ নামে লেখা থাকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এগুলো স্পা সেন্টারের মার্কেটিং পলিসি। আগে ‘আবাসিক হোটেলের’ নাম করে যেসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড হতো, সেগুলো এখন স্পা সেন্টারের নামে হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গুলশান এলাকার এমন স্পা সেন্টারগুলোকে ঘিরে প্রায় ১০ থেকে ১৫ জন দালাল থাকে। তারাই ক্লায়েন্ট ম্যানেজ করে। মেয়েদের ছবি ক্লায়েন্টদের মোবাইলে পাঠানো হয়। এরপর সেখানেই দরদাম করে ক্লায়েন্টরা দেওয়া ঠিকানায় আসেন।

বনানী কবরস্থানের উল্টো পাশে ‘অবন্তী’ নামের অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে অফিস ও আবাসিক ফ্ল্যাটের মধ্যেই আলাদা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে স্পা সেন্টার পরিচালিত হয়। এর গ্রাহক সংগ্রহের জন্য বনানীর কাকলি ওভারব্রিজ এলাকায় ১৬ জন এজেন্ট কাজ করে। হোটেলের গ্রাহকরা এসে খোঁজ-খবর নিলে তাদের এখানে নিয়ে আসা হয়। নিয়মিত গ্রাহকরা ফোন দিয়ে চলে আসেন।

এসব স্পা সেন্টারের মূল দরজার সামনে, মেইন গেটের পাশে এবং সিঁড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো থাকে। ভেতর থেকে সেগুলো মনিটর করা হয়।

স্পার আড়ালে কী হয়

অনুসন্ধানে জানা যায়, স্পা সেন্টারের আড়ালে মূলত অনৈতিক কারবার চলে। একটি স্পায় ১৫ থেকে ২০ জন কিংবা তার চেয়েও বেশি নারী থাকেন। তাদের দিয়েই মূলত এ কারবার পরিচালনা করা হয়।

ছবি পাঠানো কিংবা সরাসরি আসা ক্লায়েন্টদের নারীদের দেখানো হয়। এরপর পছন্দ হলে দরদাম করা হয়। দাম মিলে গেলে সাজানো রুমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

এখানে ঘণ্টা হিসেবে রেট নির্ধারণ করা হয়। নারী পছন্দ হলে ঘণ্টাপ্রতি ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। পছন্দ অনুযায়ী খরচ নির্ধারিত হয়। ১০ হাজার টাকা রেটের সেবাগুলোকে তাদের ভাষায় ‘ভিআইপি’ বলা হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ পুলিশের ‘ম্যানেজ’

গুলশানের ব্যবসায়ী আরিফুর রহমান বলেন, ‘গুলশান-বনানী এলাকা অভিজাত ও কূটনৈতিক এলাকা হিসেবে পরিচিত। আর এসব এলাকাকে ঘিরে যে এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড হয়, তা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক।’

তিনি বলেন, ‘প্রকাশ্য এ রকম কর্মকাণ্ড হলেও কেউ কিছু বলতে পারে না। এদের পেছনে সন্ত্রাসী পুলিশ কাজ করে। তাছাড়া এ রকম এলাকায় এ ধরনের কর্মকাণ্ড কারও পক্ষে পরিচালনা করা সম্ভব না।’

গুলশান-২-এর ব্যবসায়ী আবুল কালাম বলেন, ‘এই অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর শক্তি হচ্ছে পুলিশ। যারা এগুলো পরিচালনা করে তাদের শক্তি-সাহস দেয় তারা। এ কারণে তারা এত বেপরোয়া। তাছাড়া কবরস্থানের মতো স্পর্শকাতর স্থানের সামনে এগুলো কি চলতে পারে।’

বনানীর স্থানীয় বাসিন্দা সজিব আহমেদ বলেন, ‘আমরা বারবার এগুলোর বিষয়ে কথা বলেছি। কিন্তু কাজ হয়নি। হয়তো দু-একবার লোক দেখানো অভিযান হয়, পরে আবারও শুরু হয়।’

সম্প্রতি রাজধানীর কয়েকটি স্পা সেন্টারে অভিযান চালায় ডিএমপি

ধারাবাহিক অভিযানে গ্রেফতার শতাধিক

সম্প্রতি গুলশান ও বনানীর বিভিন্ন স্পা সেন্টারে অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গুলশান-২-এর প্লাটিনাম মার্কেটে অবস্থিত ‘ডায়মন্ড স্পা সেন্টারে’ ডিবি গুলশান বিভাগ অভিযান চালিয়ে ১৯ জন নারী ও ৩ জন পুরুষসহ ২২ জনকে গ্রেফতার করে।

গুলশান থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে পৃথকভাবে গুলশানের একাধিক স্পা সেন্টার থেকে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ২৯ জন নারী ও ২৪ জন পুরুষসহ আরও ৫৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন এবং অসামাজিক কার্যকলাপ নিরোধ আইনে মামলা দায়ের করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অভিজাত আবাসিক এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এ ধরনের অবৈধ স্পা সেন্টারের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।

নিয়মিত তদারকির পাশাপাশি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এ ধরনের অভিযান আরও জোরদার করা হবে বলে জানান তিনি।