পুলিশের ওপর হামলা ঠেকাবে কে

থানায় ঢুকে পুলিশ সদস্যকে মারধর, দায়িত্ব পালনের সময় হামলা, পুলিশ কর্মকর্তার সন্তানকে রক্তাক্ত করা, অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যের বাড়িতে অস্ত্রের মুখে ডাকাতি এবং সর্বশেষ সাভারে স্পেশাল ব্রাঞ্চের এসআই আলতাফ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা; একের পর এক ঘটনায় মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ বাড়ছে। পুলিশ কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিনের জনরোষ ও আস্থার ঘাটতি, পুলিশের ভাবমূর্তির সংকট, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা বাস্তবতা মিলিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জনআস্থা ফেরাতে বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়া না গেলে পুলিশের ওপর হামলা কমানো কঠিন হবে বলে মনে করেন তারা।

গত ৬ সেপ্টেম্বর বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় একাধিক মামলার আসামি রিয়াজ ফকিরকে চুরির মামলায় গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তার মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে দুই থেকে তিন শতাধিক ক্ষুব্ধ লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে থানা ঘেরাও করে ভাঙচুর চালায়। হামলাকারীরা থানায় ঢুকে ডিউটি অফিসার এএসআই আব্দুল হালিমকে বেধড়ক মারধর করে। আহত হন কনস্টেবল লিমন মিয়া, ফরহাদ হোসেন, মনির হোসেন, আল আমিন হোসেন ও মেহেদী হাসান।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ করলে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। এতে আসামির স্বজন ও স্থানীয় কয়েকজন আহত হন। ঘটনার দিন এক পুলিশ সদস্যকে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে শোনা যায়, ‘আমাদের নিরাপত্তা কোথায়? একটা মিথ্যা ঘটনায় যেভাবে আমাদের ওপর আক্রমণ করা হলো, আমরা যাবো কোথায়?’

পুলিশের পরিবারও নিরাপদ নয়?

পুলিশ পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও একই ধরনের হতাশা দেখা যাচ্ছে। সন্তানের রক্তাক্ত অবস্থা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করে সিএমপিতে কর্মরত ডিবির কর্মকর্তা আনসারুল করিম ফেসবুকে লেখেন, ‘সরকারি চাকরি করে নিজের অবুঝ সন্তানের নিরাপত্তা যেখানে আমরা নিশ্চিত করতে পারি না, সেখানে আমরা কীভাবে অন্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবো?’

শুধু কর্মরত সদস্যরাই নন, অবসরের পরও পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তার প্রশ্ন উঠেছে। ৭ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে বরিশালের বাবুগঞ্জের মধ্য রাকুদিয়া গ্রামে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য সিদ্দিক শরীফের বাড়িতে সাত থেকে আট জনের একটি সশস্ত্র ডাকাত দল ঢোকে। সিসি ক্যামেরা উল্টে দিয়ে পরিবারের সদস্যদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকারসহ প্রায় পাঁচ লাখ টাকার মালামাল নিয়ে যায়।

সিদ্দিক শরীফের ভাষ্য অনুযায়ী, তার ছেলে সিহাবের বুকে পিস্তল ঠেকিয়েও পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে রাখা হয়েছিল।

এরপর সাভারে স্পেশাল ব্রাঞ্চের এসআই আলতাফ হোসেনকে বেধড়ক পিটিয়ে হত্যার ঘটনা পুলিশ বাহিনীকে আরও নাড়িয়ে দিয়েছে। ঘটনার সময় তিনি ইউনিফর্মে ছিলেন না বলে কেউ কেউ ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখলেও পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, তিনি নিজেকে পুলিশ পরিচয় দিয়েছিলেন। তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি।

মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন আখ্যা দেওয়ার পরিবর্তে কেন বারবার ঘটছে, তার কারণ খুঁজতে হবে। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে পুলিশ ঝুঁকি নেওয়া কমিয়ে দিতে পারে, যার সুবিধা পাবে অপরাধীরা।

জনরোষ এখনও কাটেনি?

সাবেক আইজিপি বাহারুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার মনে হয়, পুলিশের প্রতি আগে জমে থাকা যে জনরোষ, সেটা এখনও কমেনি। মানুষ পুলিশকে ওই চোখেই দেখছে।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায়। এখন পরিস্থিতি ভালো হওয়ার কথা। সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই চব্বিশের আন্দোলনে ছিল। এখন তারাই ক্ষমতায়, কিন্তু পুলিশের যে কাজ, সেই কাজে কোনও গতি আসছে না।’

সাবেক এই আইজিপি আরও বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়, পুলিশকে যদি তার মতো কাজ করতে না দেওয়া হয়, তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারকে সমালোচনা শুনতে হবে।’

তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলসহ পুলিশ ও জনগণ যাতে এভাবে আগ্রাসী না হয়, সে জন্য একেবারে গোড়া থেকে কাজ করতে হবে। জনসচেতনতা বাড়াতে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। জনগণকে বোঝাতে হবে যে পুলিশ তাদের শত্রু নয়।

রাজধানীর বিমানবন্দর থানার ওসি ও পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কামরুল ইসলাম তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে আসলে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থার ঘাটতি প্রতিফলিত হয়। তবে আমরা বিগত কয়েক মাস নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছি জনগণের সেই ঘাটতি পূরণ করার জন্য।’

তিনি বলেন, ‘জনগণ সচেতন না হলে, আর পুলিশ যদি পুলিশের মতো কাজ করতে না পারে, তবে দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করবে কে? আমরা তো জনগণের জন্যই কাজ করি। জনগণের সহায়তা ছাড়া কাজ করা অসম্ভব।’

মাঠপর্যায়ের পুলিশের শঙ্কা

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, আসামি গ্রেফতারের অভিযানে এমনিতেই ঝুঁকি থাকে। সেই ঝুঁকি যদি স্থানীয় জনতা আরও বাড়িয়ে দেয়, তাহলে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালনে অনাগ্রহী হয়ে পড়বেন।

তাদের ভাষ্য, পুলিশের কাছে অস্ত্র থাকলেও আক্রমণের মুখে সেটির ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হচ্ছে না। তাই এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে পুলিশকে অস্ত্র ব্যবহারের পরিস্থিতিতেই পড়তে না হয়।

পুলিশের আইজি আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় হামলার শিকার হচ্ছে পুলিশ। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি, কীভাবে এটি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।’

কেন কমছে না হামলা?

ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির আইন ও অপরাধ বিভাগের প্রধান ড. কূদরাত ই খুদা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চব্বিশের আন্দোলনে পুলিশ যেভাবে আক্রমণের শিকার হয়েছে, সেই ট্রমা আস্তে আস্তে কাটিয়ে উঠলেও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা কিন্তু কমছে না।’

তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, জনগণ এখনও পুলিশের ওপর ওইভাবে আস্থা আনতে পারেনি। সে কারণে আগের ক্ষোভই এখনও বড় বাধা। সামাজিকভাবে পুলিশকে নিয়ে ইতিবাচক প্রচারণা দরকার। জনগণ যেন বুঝতে পারে, পুলিশ আছে বলেই সমাজে শান্তি আছে। অপরাধীরা ভয়ে আছে।’

সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে পুলিশের ওপর হামলার কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, বিগত সময়ের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও দলীয়করণের অভিযোগ থেকে তৈরি জনআস্থার ঘাটতি, মাঠপর্যায়ে পেশাদারত্ব ও প্রস্তুতির দুর্বলতা, পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের অভাব, সদস্যদের মনোবলের সংকট এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও আইন প্রয়োগে হস্তক্ষেপ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রমাগত হামলা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক আলোচনার কারণে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে কাজের প্রতি দ্বিধা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হচ্ছে। একইসঙ্গে নিজেদের আইনি সুরক্ষার বিষয়েও শঙ্কা বাড়ছে।

পুলিশ কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সংকট শুধু পুলিশ বাহিনীর নয়, এটি পুরো আইনশৃঙ্খলা কাঠামোর জন্য ঝুঁকি। হামলার ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের আইনের আওতায় আনা, পুলিশের কাঠামোগত সংস্কার ও পেশাদারত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে দূরত্ব কমানো জরুরি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দল, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও পুলিশের সমন্বিত উদ্যোগে জনআস্থা পুনর্গঠন করা না গেলে হামলার প্রবণতা ঠেকানো কঠিন হবে।