বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ মানেই পান্তা-ইলিশ। দীর্ঘদিন ধরেই বাঙালির পহেলা বৈশাখের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইলিশ। বছরের প্রথম দিনে এই খাবার শুধু রুচির নয়, বরং সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও প্রতীক। যদিও বড় ইলিশ এখন মধ্যবিত্তের অনেকটায় নাগালের মধ্যে নেই। তাই সবাই চেষ্টা করে এদিন অল্প বিস্তর ইলিশের আয়োজন রাখতে। সে বিষয়টি মাথায় রেখেই ইলিশের কিছু রান্নার রেসিপি দেওয়া হলো বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্য
ইলিশ পোলাও
পহেলা বৈশাখের দিনে বানিয়ে ফেলতে পারেন মজাদার ইলিশ পোলাও। ঝামেলা ছাড়া সহজ একটি রেসিপি অনুসরণ করে আইটেমটি বানিয়ে ফেলা যায়। জেনে নিন রেসিপি।
উপকরণ: আধা কাপ টক দই, ১/৪ কাপ পেঁয়াজ বাটা, ১ টেবিল চাম আদা বাটা, ১ টেবিল চামচ রসুন বাটা, ১ চা চামচ কাঁচামরিচ বাটা, ১ চা চামচ ভাজা জিরার গুঁড়া, ১ চা চামচ হলুদের গুঁড়া, ১ চা চামচ মরিচের গুঁড়া ও স্বাদ মতো লবণ।
প্রণালি: এক কেজি ওজনের ইলিশ কেটে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিন। মাছের টুকরোগুলো সবগুলো উপকরণের সঙ্গে ভালো করে মিশিয়ে নিন। মসলায় মাছ ম্যারিনেট করে রাখুন এক থেকে দেড় ঘণ্টার জন্য। ম্যারিনেট শেষে এক কাপ পেঁয়াজ কুচি সঙ্গে ১ চা চামচ কর্ণ ফ্লাওয়ার দিয়ে মাছের টুকরোগুলো মিশিয়ে নিন। মাঝারি আঁচে বেরেস্তা করে নিন পেঁয়াজ। সেগুলো ফ্যানের বাতাসে ঠাণ্ডা করে নিন।
চুলায় প্যান বসিয়ে তেল গরম করুন। আধা কাপ পেঁয়াজ কুচি হালকা ভেজে মাছ উঠিয়ে মসলাটুকু দিয়ে দিন এতে। ৫ থেকে ৭ মিনিট নেড়েচেড়ে কষিয়ে নিন। তেল উঠে গেলে ১/৪ কাপ পানি দিন। নেড়েচেড়ে ঢেকে দিন ৫ থেকে ৭ মিনিটের জন্য। এরপর ঢাকনা তুলে ইলিশ মাছের টুকরাগুলো দিয়ে দিন। উপরের দিকে সামান্য ফেরে নেওয়া কয়েকটি কাঁচামরিচ দিয়ে দেবেন। তৈরি থেকে রাখা বেরেস্তা থেকে ১/৪ কাপ দিয়ে দিন। ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিন ৭ মিনিটের জন্য। এর মধ্যে মাছের একপাশ সেদ্ধ হয়ে যাবে ভালমতো। এই পর্যায়ে সাবধানে উল্টে দিন মাছ। দু’দিক সেদ্ধ হয়ে গেলে নামিয়ে নিন মাছ।
এবার পোলাও রান্নার পালা। একটি প্যানে ১/৪ কাপ তেল দিন। তেল গরম হয়ে গেলে মাঝ দিয়ে ছিঁড়ে নেওয়া দুটো তেজপাতা দিন। আরও দিন দুই স্টিক দারুচিনি, ৫ থেকে ৬টি এলাচ ও লবঙ্গ এবং ১/৪ কাপ পেঁয়াজ কুচি দিন। পেঁয়াজ নরম হয়ে গেলে আধা কেজি পোলাওয়ের চাল দিন। চাল ৩০ মিনিট পানিতে ভিজিয়ে রেখে এরপর পানি ভালো করে ঝরিয়ে নেবেন। মাঝারি আঁচে ৫ মিনিট নেড়েচেড়ে চাল ভাজুন। এরপর ইলিশ মাছগুলো উঠিয়ে রেখে মসলার মিশ্রণ দিয়ে দিন। ভালো করে নেড়েচেড়ে চালের দ্বিগুণ পরিমাণ পানি দিন। ১ টেবিল চামচ চিনি ও স্বাদ মতো লবণ দিন। মিডিয়াম আঁচে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিন প্যান। পানি শুকিয়ে গেলে ঘি ও পেঁয়াজ বেরেস্তা ছিটিয়ে দিন। ইলিশের টুকরোগুলো উপরে সাজিয়ে ঢেকে দমে রাখুন ১০ মিনিট। পরিবেশন করুন গরম গরম।
সরষে ইলিশ
উপকরণ: সরষে বাটা ১ টেবিল চামচ, পোস্ত দানা বাটা ১ টেবিল চামচ, কাঁচা মরিচ, হলুদ গুঁড়া ১ চা-চামচ, পেঁয়াজকুচি আধা কাপ, সরিষার তেল ৪ টেবিল চামচ।
প্রণালি: সব উপকরণ পরিমাণ মতো পানিতে ভিজিয়ে রাখবেন। এরপর সবগুলো ব্লেন্ড করে নিবেন। এরপর মাঝারি আঁচে চুলায় প্যান বসিয়ে সরিষার তেল দিন। তেল সামান্য গরম হলে সরিষার পেস্ট দিয়ে দিন। নেড়ে প্রয়োজনমত আদা-রসুন বাটা, হলুদ গুঁড়া, মরিচ গুঁড়া ও লবণ দিয়ে নাড়ুন। মাঝারি আঁচে ৩ থেকে ৪ মিনিট সময় নিয়ে কষান। এবার চুলার আঁচ কমিয়ে মিডিয়াম লো করে ইলিশ মাছের টুকরোগুলো দিয়ে দিন। চামচ দিয়ে মসলা উঠিয়ে মাছের ওপর দিন। ৫ মিনিট পর সাবধানে উল্টে দিন মাছের টুকরাগুলো। আধা কাপ গরম পানি দিয়ে সামান্য নেড়ে ৫ মিনিটের জন্য প্যান ঢেকে দিন। এরপর ঢাকনা তুলে আরেকবার মাছগুলো উল্টে দিন। কাঁচা মরিচের মাথার অংশ কেটে প্যানে দিয়ে আরও ৫ মিনিট ঢেকে রাখুন প্যান। তেল উঠে আসলে নামিয়ে পরিবেশন করুন গরম ভাত কিংবা খিচুড়ির সঙ্গে।
ভাপা ইলিশ
উপকরণ: হলুদ ও কালো সরিষা, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, হলুদ ও পরিমাণ মতো লবণ।
প্রণালি: প্রথমে হলুদ ও কালো সরিষা বেটে নিন। বাটার সময় খানিকটা লবণ ও কাঁচামরিচ দেবেন। এতে সরিষা বাটা তেতো হবে না। এরপর ইলিশ মাছের টুকরোগুলো লবণ ও হলুদ দিয়ে মেখে রেখে দিন কিছুক্ষণ। একটি ছড়ানো বাটিতে পরিমাণমত সরিষার তেল, সরিষা বাটা, হলুদ, লবণ ও মরিচের গুঁড়া দিন। কাঁচামরিচ চিড়ে দিয়ে দিন। মেখে রাখা মাছ দিয়ে দিন মসলার মিশ্রণে। হাত দিয়ে মসলা মেখে নিন মাছের টুকরায়। সামান্য পানি দিয়ে বাটি ঢেকে রাখুন। বাটির মুখ ফয়েল পেপার দিয়ে আটকে দিতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়। ১৫ মিনিট এভাবেই রাখুন।
একটি গভীর প্যান বা হাঁড়িতে পানি গরম করুন। পানি ফুটে ওঠার আগেই মাছসহ বাটি পানির মধ্যে বসিয়ে দিন। মিডিয়ামের চাইতেও একটু কম থাকবে চুলার জ্বাল। বাটি যেন অর্ধেক অংশ পর্যন্ত পানিতে ডুবে থাকে। উপরে একটি কাপড় দিয়ে দিন। এতে উপর থেকে তাপ বের হতে পারবে না। ১৫ থেকে ২০ মিনিট এভাবেই রাখুন। বাটির মুখ খুলে দেখুন উপরে তেল ভেসে উঠেছে কিনা। তেল ভেসে উঠলে হয়ে গেছে ভাপা ইলিশ রান্না। নেড়েচেড়ে পরিবেশন করুন গরম ভাতের সঙ্গে।
ইলিশ খিচুড়ি
উপকরণ: ১/৪ কাপ পেঁয়াজ কুচি, ২ টেবিল চামচ হলুদ, সরিষা, ১ চা চামচ রাই সরিষা, আধা চা চামচ আদা, রসুন, স্বাদ মতো লবণ ও কাঁচা মরিচ।
প্রণালি: এই রেসিপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে স্পেশাল মসলা। এই মসলা তৈরির জন্য উপকরণগুলো অল্প পানি দিয়ে ব্লেন্ড করে নিন। মসলা একটি পাত্রে ঢেলে এর সঙ্গে মেশান আধা চা চামচ আদা ও রসুন বাটা। আরও মেশান স্বাদ মতো মরিচের গুঁড়া, আধা চা চামচ হলুদ গুঁড়া, আধা চা চামচ ধনিয়ার গুঁড়া ও ১/৪ চা চামচ ভাজা জিরার গুঁড়া। এক কেজি ওজনের ইলিশ মাছ টুকরো করে কেটে মসলার মিশ্রণে ম্যারিনেট করে রাখুন ৩০ মিনিটের জন্য।
তেল গরম করে পেঁয়াজ বেরেস্তা তৈরি করে উঠিয়ে নিন। একই তেলে ১/৪ কাপ পেঁয়াজ নরম করে ভেজে নিন। পেঁয়াজ নরম হয়ে গেলে মাছের টুকরো সরিয়ে মসলাটুকু দিয়ে দিন। মসলা থেকে তেল ছেড়ে দিলে সামান্য পানি দিন। নেড়েচেড়ে মাছের টুকরো দিয়ে দিন। ৫ থেকে ৭ মিনিট ঢেকে রেখে রান্না করুন। এরপর মাছ উল্টে দিয়ে এক মুঠো পেঁয়াজ বেরেস্তা ও কয়েকটি আস্ত কাঁচা মরিচ দিয়ে দিন। ঢাকনা দিয়ে আরও ৫ মিনিট ঢেকে রান্না করুন। মাছের ভুনা নামিয়ে রাখুন,
এবার খিচুড়ি রান্না করার পালা। একটি প্যানে তেল গরম করে ২ কাপ চাল, আধা কাপ ভেজে নেওয়া মুগ ডাল, ১/৪ কাপ পেঁয়াজ কুচি ও গরম মসলা দিয়ে দিন। কাঁচা মরিচ, শুকনা মরিচ, আধা চা চামচ আদা ও রসুন বাটা, ১/৪ চা চামচ হলুদের গুঁড়া, মরিচের গুঁড়া এবং স্বাদ মতো লবণ দিন। কয়েক মিনিট ভেজে নিন। ভুনা মাছগুলো আলাদা করে তুলে রেখে মসলাটুকু দিয়ে দিন। ভালো করে নেড়েচেড়ে ৫ থেকে ৬ কাপ ফুটন্ত পানি দিতে দিন। ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিন ১০ থেকে ১৫ মিনিটের জন্য। এরপর খিচুড়ির উপরে মাছের টুকরো দিয়ে কম আঁচে কিছুক্ষণ রাখুন। ধনেপাতা কুচি ও পেঁয়াজ বেরেস্তা ছিটিয়ে আরও কিছুক্ষণ রেখে নামিয়ে নিন।
ঝাল ঝাল ইলিশ ভর্তা
মাওয়া ঘাটে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করা হয় মজাদার ইলিশের ভর্তা। সেই একই স্বাদে ঝাল ঝাল ভর্তা বানিয়ে ফেলতে পারেন বাড়িতেই। জেনে নিন কীভাবে বানাবেন।
এর জন্য সাধারণত ইলিশের কাঁটা বেশি এমন অংশ যেমন লেজ ও মাথার অংশ নেওয়া হয়। এই লেজ ও মাথার অংশ ভালো করে ধুয়ে লবণ, হলুদ ও মরিচ দিয়ে ম্যারিনেট করে রাখুন ১০ মিনিট। প্যানে সরিষার তেল গরম করে বোঁটাসহ শুকনো মরিচ মচমচে করে ভেজে নিন। মরিচ উঠিয়ে একই তেলে মাছের টুকরা ভেজে নিন। বেশি শক্ত করে ভাঁজবেন না। মাঝারি আঁচে ৫ থেকে ৭ মিনিট সময় নিয়ে সোনালি করে ভাজুন ইলিশের টুকরা। নামিয়ে শক্ত কাঁটাগুলো আলাদা করে নিন মাছ থেকে। একটি প্লেটে ভেজে রাখা শুকনা মরিচ স্বাদ মতো লবণ দিয়ে ডলে ভেঙে নিন। মাছ যে সরিষার তেলে ভাজা হয়েছিল সেটা দিয়ে দিন। ভালো করে মেখে কাঁটা ছাড়ানো মাছ, ধনেপাতা কুচি ও লেবুর রস দিয়ে মেখে পরিবেশন করুন গরম ভাতের সঙ্গে। বেশি কাটা মনে হলে আপনি মিক্সিতে ব্লেন্ডও করে নিতে পারেন।
বেকড ইলিশ উইথ স্যাফরন রাইস
বাঙালিয়ানার অনেক রান্নার পর আমরা একটা বিদেশি রান্নাও করে দেখতে পারি। সেটি হতে পারে বেকড ইলিশের সঙ্গে স্যাফরন রাইস।
প্রথমেই বেকড ইলিশের জন্য আস্ত ইলিশ মাছকে পরিমাণমত মরিচ গুঁড়া, লেবুর রস, লবণ, ময়দা, আদা বাটা দিয়ে একসঙ্গে মেখে ম্যারিনেট করুন। ৩০ মিনিট পর ডুবো তেলে ভেজে নিন। এরপর গ্রেভি তৈরি করতে হবে। এ জন্য পরিমাণমত আদা বাটা, পেয়াজ বাটা, টমেটো সস, তরল দুধ, মরিচ গুঁড়া, আস্ত মেথি, চিনি একসঙ্গে নিয়ে চুলায় জ্বাল দিন। গ্রেভি তৈরি হলে ভাজা মাছের ওপর দিয়ে ওভেনে ২০ মিনিট বেক করুন।
এর আসি রাইস রান্নায়। পরিমাণমত পোলাও চাল, লবণ, এলাচ/দারুচিনি, চিনি, ঘি একসঙ্গে নিয়ে রাইস কুকারে পোলাও রান্না করুন। নামানোর আগে স্যাফরন দুধে গুলিয়ে দিয়ে দিন। ১০ মিনিট দমে রেখে নামিয়ে ফেলুন স্যাফরন রাইস। বেকড ইলিশ দিয়ে পরিবেশন করুন।