হঠাৎ হৃদ্যন্ত্রের স্পন্দন বন্ধ হয়ে গেলে প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন জরুরি পরিস্থিতিতে রোগীর জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করতে যে পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়, তার নাম সিপিআর। প্রশিক্ষিত চিকিৎসাকর্মীরা দীর্ঘ সময় ধরে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করলেও সব ক্ষেত্রে রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না। কেন এমন হয়? কী ভাবে কাজ করে সিপিআর?
কী এই সিপিআর?
সিপিআরের পুরো নাম কার্ডিয়োপালমোনারি রিসাসিটেশন। হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে এবং ব্যক্তি স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস না নিলে এই জরুরি পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। বুকের মাঝখানে নির্দিষ্ট নিয়মে বার বার চাপ দিয়ে শরীরে, বিশেষ করে মস্তিষ্ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে, কিছুটা রক্ত চলাচল বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়।
সিপিআর নিজে থেকে সব সময় হৃদ্যন্ত্রকে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনতে পারে না। তবে জরুরি চিকিৎসা পৌঁছোনো পর্যন্ত মস্তিষ্ক ও শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে রক্ত সরবরাহ বজায় রাখতে সাহায্য করে। তাই দ্রুত সিপিআর শুরু করা অত্যন্ত জরুরি।
কী ভাবে কাজ করে এই পদ্ধতি?
সিপিআরের প্রধান অংশ হল বুকের মাঝখানে চাপ দেওয়া, যাকে বলা হয় চেস্ট কমপ্রেশন। এর ফলে হৃদ্যন্ত্র ও বুকের আশপাশের কাঠামোয় চাপ তৈরি হয় এবং শরীরে কিছুটা রক্ত চলাচল বজায় থাকে।
প্রশিক্ষিত ব্যক্তি প্রয়োজন অনুযায়ী এর সঙ্গে কৃত্রিম শ্বাসও দিতে পারেন। এর মাধ্যমে ফুসফুসে বাতাস পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে সাধারণ মানুষ প্রশিক্ষণ না পেয়ে থাকলে শুধু বুকের মাঝখানে চাপ দেওয়ার মাধ্যমেও সিপিআর শুরু করতে পারেন।
কতক্ষণ দিতে হয় সিপিআর?
সিপিআর দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনও সর্বজনীন সময়সীমা নেই। রোগীর শারীরিক অবস্থা, হৃদ্যন্ত্র বন্ধ হওয়ার কারণ এবং চিকিৎসায় সাড়া দেওয়ার উপর নির্ভর করে কতক্ষণ এই পদ্ধতি চালানো হবে। রোগী স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস নিতে শুরু করলে, প্রশিক্ষিত চিকিৎসাকর্মীরা দায়িত্ব নিলে অথবা পরিস্থিতি অনুযায়ী নিরাপদে থামার কারণ তৈরি হলে সিপিআর বন্ধ করা যায়। যিনি সিপিআর দিচ্ছেন, তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়লে অন্য প্রশিক্ষিত ব্যক্তির সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন।
৪৫ মিনিট সিপিআর দিয়েও কেন বাঁচানো যায় না?
সিপিআর জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনা বাড়ায়, কিন্তু সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। হৃদ্যন্ত্র বন্ধ হওয়ার কারণ, কত দ্রুত সিপিআর শুরু হয়েছে, হৃদ্যন্ত্রের ছন্দ, ডিফিব্রিলেটর দিয়ে বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার প্রয়োজন ও সময় এবং রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা সবই ফলাফলে প্রভাব ফেলে।
কিছু ক্ষেত্রে হৃদ্যন্ত্রের ছন্দ স্বাভাবিক করতে ডিফিব্রিলেটর, ওষুধ, শ্বাস-প্রশ্বাসের সহায়তা কিংবা হৃদ্যন্ত্র বন্ধ হওয়ার মূল কারণের চিকিৎসা প্রয়োজন হয়। দীর্ঘ সময় সিপিআর চললেও যদি হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্রম ফিরে না আসে, কিংবা মস্তিষ্ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে দীর্ঘক্ষণ পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পৌঁছোয়, তা হলে রোগীকে বাঁচানো সম্ভব নাও হতে পারে। তাই শুধু কতক্ষণ সিপিআর দেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে চিকিৎসার ফলাফল বিচার করা যায় না।
জরুরি পরিস্থিতিতে কী করবেন?
কেউ হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়লে এবং স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস না নিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা পরিষেবায় খবর দিন। ব্যক্তি সাড়া দিচ্ছেন না এবং স্বাভাবিক শ্বাস নিচ্ছেন না বুঝতে পারলে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের আশঙ্কা করতে হবে। বুকের মাঝখানে জোরে ও দ্রুত চাপ দিতে শুরু করুন। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে মিনিটে ১০০–১২০ বার চাপ দেওয়া এবং বুক প্রায় ৫–৬ সেন্টিমিটার নিচে নামানো উচিত। প্রতিবার চাপ দেওয়ার পরে বুককে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে দিন। কাছে ডিফিব্রিলেটর থাকলে সেটি আনিয়ে যন্ত্রের নির্দেশ মেনে ব্যবহার করুন।
সিপিআর সম্পর্কে প্রশিক্ষণ থাকলে বুকের চাপের সঙ্গে কৃত্রিম শ্বাস দেওয়া যায়। প্রশিক্ষণ না থাকলেও জরুরি পরিষেবার নির্দেশ মেনে বুকের মাঝখানে চাপ দেওয়া শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ।
সিপিআর কোনও জাদুকাঠি নয়, তবে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের সময় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনা বাড়ানো যায়। এমন পরিস্থিতিতে ভয় পেয়ে অপেক্ষা না করে জরুরি সাহায্য চাওয়া এবং দ্রুত সিপিআর শুরু করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।
/এমএএল/