মৌসুমি জ্বর, সর্দি-কাশি এখন ঘরে ঘরে। কিন্তু অসুস্থতা সেরে যাওয়ার পরেও যদি শিশুর কাশি না কমে, রাতে শ্বাস নিতে কষ্ট হয় কিংবা বুকের মধ্যে সাঁই সাঁই শব্দ শোনা যায়, তা হলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। সাধারণ ভাইরাল সংক্রমণের পাশাপাশি এগুলো হাঁপানি বা অ্যাজমার লক্ষণও হতে পারে। তাই শিশুর শ্বাসকষ্টের ধরন, কত দিন ধরে সমস্যা এবং কোন সময়ে তা বাড়ছে, সে দিকে নজর রাখা জরুরি।
সাধারণ সর্দি-কাশির সময়ে শ্বাসনালিতে শ্লেষ্মা জমে সাময়িক অস্বস্তি হতে পারে। তবে বারবার কাশি হওয়া, বিশেষ করে রাতে বা ভোরের দিকে কাশির প্রকোপ বেড়ে যাওয়া, শারীরিক পরিশ্রমের সময়ে হাঁপিয়ে ওঠা কিংবা শ্বাস ছাড়ার সময়ে বাঁশির মতো শব্দ শোনা গেলে হাঁপানির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে শুধু এই লক্ষণগুলি দেখেই হাঁপানি হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না। চিকিৎসকের পরামর্শে সঠিক কারণ নির্ণয় করা জরুরি।
শিশুদের হাঁপানি কেন হতে পারে?
হাঁপানি একটি দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসনালির প্রদাহজনিত সমস্যা। এই রোগে শ্বাসনালি অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। প্রদাহের কারণে শ্বাসনালির ভেতরের অংশ ফুলে যেতে পারে, চারপাশের পেশি সংকুচিত হতে পারে এবং শ্লেষ্মা তৈরি বাড়তে পারে। ফলে ফুসফুসে বাতাসের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয় এবং শ্বাস নিতে অসুবিধা দেখা দেয়।
ধুলোবালি, ধোঁয়া, বায়ুদূষণ, ঠান্ডা বাতাস, অ্যালার্জি এবং ভাইরাসজনিত সংক্রমণ অনেকের ক্ষেত্রে হাঁপানির উপসর্গ বাড়িয়ে দেয়। পরিবারে হাঁপানি বা অ্যালার্জির ইতিহাস থাকলেও শিশুর ঝুঁকি বেশি। তবে সব শিশুর ক্ষেত্রে কারণ বা উপসর্গ এক রকম হয় না।
কোন লক্ষণগুলি দেখলে সতর্ক হবেন?
১. দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার ফিরে আসা কাশি: সর্দি-জ্বর সেরে যাওয়ার পরেও কাশি থেকে যাওয়া, ঘন ঘন কাশির সমস্যা ফিরে আসা কিংবা রাতে কাশির কারণে ঘুম ভেঙে যাওয়া হাঁপানির অন্যতম লক্ষণ।
২. রাতে শ্বাসকষ্ট বাড়া: দিনের তুলনায় রাতে বা ভোরের দিকে শ্বাস নিতে বেশি অসুবিধা হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। হাঁপানিতে অনেক সময় রাতের দিকে উপসর্গ বেড়ে যায়।
৩. শ্বাসের সঙ্গে সাঁই সাঁই শব্দ: শ্বাস ছাড়ার সময়ে বুকের ভেতর থেকে বাঁশির মতো শব্দ বেরোতে পারে। তবে সব শিশুর হাঁপানিতে এই শব্দ শোনা যায় না।
৪. খেলাধুলো বা হাঁটাচলায় হাঁপিয়ে ওঠা: সমবয়সি শিশুদের তুলনায় অল্প দৌড়ঝাঁপেই শ্বাসকষ্ট হওয়া, বারবার থেমে বিশ্রাম নেওয়া কিংবা খেলতে গিয়ে কাশি শুরু হলে নজরে রাখা দরকার।
৫. বুক চেপে আসা বা অস্বস্তি: শিশু বুক ভারী লাগার কথা বলতে পারে। ছোট শিশুরা অনেক সময় অস্বস্তির কথা স্পষ্ট করে বোঝাতে পারে না। সে ক্ষেত্রে শ্বাসের গতি বেড়ে যাওয়া বা স্বাভাবিক কাজকর্মে অনীহা দেখা দিতে পারে।
ভাইরাল সংক্রমণ আর হাঁপানি কি আলাদা করা যায়?
ভাইরাসজনিত সংক্রমণেও শ্বাসনালিতে প্রদাহ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে রাইনোভাইরাস ও রেসপিরেটরি সিনসিটিয়াল ভাইরাসের মতো জীবাণু শিশুদের শ্বাসযন্ত্রে সমস্যা তৈরি করে। কিছু শিশুর ক্ষেত্রে ভাইরাসের সংক্রমণ হাঁপানির উপসর্গও উসকে দেয়।
তবে সর্দি-কাশি হলেই হাঁপানি হয়েছে, এমন ধারণা ঠিক নয়। সাধারণ সংক্রমণে জ্বর, নাক দিয়ে জল পড়া, গলাব্যথা ও কাশি দেখা যেতে পারে। অন্য দিকে, বারবার একই ধরনের শ্বাসকষ্ট, রাতের কাশি এবং খেলাধুলার সময়ে উপসর্গ বেড়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলি হাঁপানির সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করে। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক শিশুর শারীরিক পরীক্ষা এবং বয়স উপযোগী শ্বাসপ্রশ্বাসের পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেবেন।
কখন দ্রুত চিকিৎসা জরুরি?
শিশুর শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হলে, শ্বাসের সঙ্গে বুকের নিচের অংশ বা পাঁজরের ফাঁক ভেতরের দিকে ঢুকে গেলে, কথা বলা বা খেতে সমস্যা হলে কিংবা ঠোঁট ও জিভ নীলচে হয়ে গেলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। শিশুকে অস্বাভাবিক নিস্তেজ দেখালেও অপেক্ষা করা উচিত নয়।
বারবার কাশি বা শ্বাসকষ্ট হলে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া ইনহেলার বা অন্য ওষুধ শুরু করা, বন্ধ করা কিংবা মাত্রা পরিবর্তন করা ঠিক নয়। ধোঁয়া, ধুলাবালি ও পরিচিত অ্যালার্জির কারণগুলি এড়িয়ে চলাও উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
শিশুর হাঁপানি থাকলে নিয়মিত চিকিৎসা ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক খেলাধুলো ও দৈনন্দিন কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। তাই সর্দি-কাশি দীর্ঘস্থায়ী হলে বা শ্বাসকষ্ট বারবার ফিরে এলে সেটিকে শুধু মৌসুমি অসুস্থতা ভেবে এড়িয়ে না গিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।