জ্বর-ব্যথায় নিজের মতো ওষুধ খেয়ে অজান্তেই ডেকে আনছেন বিপদ

জ্বর, মাথাব্যথা কিংবা শরীরে ব্যথা হলেই অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার বদলে নিজের মতো করে ব্যথার ওষুধ খেয়ে নেন। সাময়িকভাবে স্বস্তি মিললেও প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ওষুধ খেলে শরীরের ভেতরে তৈরি হতে পারে গুরুতর জটিলতা। ইন্দোরের ৩১ বছর বয়সি এক যুবকের ঘটনা সেই আশঙ্কাই সামনে এনেছে।

এক মাসেরও বেশি সময় ধরে জ্বর, মাথাব্যথা এবং শরীরে ব্যথায় ভুগছিলেন ওই যুবক। উপসর্গ দেখা দিলেই তিনি নিজের মতো করে ব্যথানাশক খেতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে ওষুধ খাওয়ার পরিমাণ বেড়ে যায়। মাত্র ৩০ দিনে তিনি ১৩টি ব্যথার ওষুধ খেয়ে ফেলেন। এর পর তাঁর কিডনির কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। শেষ পর্যন্ত গুরুতর কিডনি বিকলতার পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রয়োজন হয় কিডনি প্রতিস্থাপনের।

জানা যায়, তাঁর মা একটি কিডনি দান করেন। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত কিডনির পরিবর্তে নতুন কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। এই ঘটনা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাওয়া এবং প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ব্যথানাশক ব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে সতর্ক করেছে।

ব্যথানাশক ওষুধ কিডনির ক্ষতি করে কীভাবে?

কিছু ব্যথানাশক ওষুধ বেশি মাত্রায় কিংবা দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে কিডনির স্বাভাবিক কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে। ব্যথা ও প্রদাহ কমানোই এই ওষুধগুলির মূল কাজ। তবে অতিরিক্ত ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিডনিতে রক্তপ্রবাহ কমে যেতে পারে। ফলে রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত তরল ছেঁকে বের করার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

প্যারাসিটামল, আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাক, ন্যাপ্রোক্সেন, অ্যাসিক্লোফেনাক, মেফেনামিক অ্যাসিড এবং এটোরিকক্সিবের মতো বহুল ব্যবহৃত ব্যথানাশক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খেলে ক্ষতি হতে পারে। তবে কোন ওষুধ কতটা নিরাপদ, তা ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা, রোগ এবং অন্যান্য ওষুধ ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে।

বিশেষ করে আগে থেকেই কিডনির সমস্যা রয়েছে, শরীরে পানিশূন্যতা রয়েছে অথবা অন্য কোনও গুরুতর অসুস্থতায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক খাওয়া আরও ঝুঁকিপূর্ণ।

কিডনিতে রক্তপ্রবাহ কমলে কী হয়?

কিডনির স্বাভাবিক কাজের জন্য পর্যাপ্ত রক্তপ্রবাহ প্রয়োজন। কিছু ব্যথানাশক শরীরে এমন জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় বাধা দিতে পারে, যার ফলে কিডনিতে রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে কিডনির ছাঁকনির কাজ ব্যাহত হতে পারে এবং শরীরে বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত তরল জমতে শুরু করতে পারে।

গবেষণাতেও দীর্ঘদিন অতিরিক্ত ব্যথানাশক ব্যবহারের সঙ্গে কিডনির ক্ষতির সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। তাই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট মাত্রা ও সময় মেনে ওষুধ ব্যবহার করা জরুরি।

নিজের মতো করে ওষুধ খাওয়ার বিপদ কোথায়?

চিকিৎসকের পরামর্শ বা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ছাড়াই নিজের মতো করে ওষুধ খাওয়ার প্রবণতাকেই স্বেচ্ছায় ওষুধ সেবন বলা হয়। কোনও উপসর্গ দেখা দিলেই অনেকে রোগের কারণ না জেনে সরাসরি ওষুধ খাওয়া শুরু করেন। এতে সাময়িক ভাবে উপসর্গ কমলেও রোগের আসল কারণ থেকে যেতে পারে।

কখনও কখনও ওষুধ গুরুতর অসুস্থতার লক্ষণও চাপা দিয়ে দিতে পারে। ফলে সঠিক রোগ নির্ণয় এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয়। একই সঙ্গে নিজের সিদ্ধান্তে একাধিক ওষুধ খেলে একটি ওষুধের সঙ্গে অন্যটির বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কাও বাড়ে।

কিডনি সমস্যার শুরুতে কোন লক্ষণগুলি দেখা দিতে পারে?

কিডনির অসুস্থতার অন্যতম সমস্যা হল, শুরুতে অনেক ক্ষেত্রেই স্পষ্ট কোনও লক্ষণ দেখা যায় না। কিডনির কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকলেও তা বোঝা কঠিন হতে পারে। সমস্যা গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছলে শরীরে নানা ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

পা ও গোড়ালির কাছে ফোলা, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া কিংবা প্রস্রাবের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিবর্তন কিডনির সমস্যার সম্ভাব্য লক্ষণ হতে পারে। এর সঙ্গে অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা, বমি বমি ভাব, বমি হওয়া এবং খাওয়ার ইচ্ছে কমে যাওয়ার মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে।

কিডনির কার্যক্ষমতা গুরুতর ভাবে কমে গেলে শ্বাসকষ্ট, উচ্চ রক্তচাপ, ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া বা চুলকানি এবং মানসিক বিভ্রান্তির মতো সমস্যাও হতে পারে। তবে এই উপসর্গগুলি অন্য অনেক শারীরিক সমস্যার কারণেও দেখা দিতে পারে। তাই এমন কোনও লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

কারা ব্যথানাশকজনিত কিডনি ক্ষতির ঝুঁকিতে বেশি?

বয়স বাড়ার সঙ্গে কিডনির কার্যক্ষমতা কিছুটা কমতে পারে। তাই বয়স্কদের ব্যথানাশক ব্যবহারে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। একই ভাবে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং দীর্ঘস্থায়ী কিডনির রোগ রয়েছে এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

শরীরে পানিশূন্যতা থাকলেও ব্যথানাশকের কারণে কিডনির উপর চাপ বাড়তে পারে। যাঁরা নিয়মিত একাধিক ওষুধ খান, তাঁদেরও নিজের সিদ্ধান্তে ব্যথানাশক যোগ করা উচিত নয়। বিভিন্ন ওষুধ একসঙ্গে খেলে পারস্পরিক বিরূপ প্রতিক্রিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

শুধু কিডনি নয়, ক্ষতি হতে পারে আরও অঙ্গের

অতিরিক্ত বা দীর্ঘদিন ব্যথানাশক ব্যবহারের প্রভাব শুধু কিডনিতে সীমাবদ্ধ নয়। লিভার, পাকস্থলী এবং হৃদ্‌যন্ত্রের উপরও এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।

অতিরিক্ত প্যারাসিটামল গ্রহণ করলে লিভারের গুরুতর ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার কিছু ব্যথানাশক দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে পাকস্থলীতে আলসার তৈরি হতে পারে এবং গুরুতর ক্ষেত্রে পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

কিছু ব্যথানাশক রক্তচাপ, শরীরে তরলের ভারসাম্য এবং রক্তপ্রবাহের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে আগে থেকেই হৃদ্‌রোগ বা উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

ব্যথানাশক ওষুধ নিরাপদে খেতে কী করবেন?

ব্যথানাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের দেওয়া মাত্রা মেনে চলা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিজের ইচ্ছায় ওষুধের মাত্রা বাড়ানো কিংবা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দিন খাওয়া উচিত নয়। একসঙ্গে একাধিক ব্যথানাশক বা অন্য কোনও ওষুধ খাওয়ার ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার।

অসুস্থতার সময়ে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হচ্ছে কি না, সে দিকেও নজর রাখতে হবে। বিশেষ করে জ্বর বা বমির মতো সমস্যা থাকলে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ জরুরি হতে পারে। তবে কিডনি বা হৃদ্‌রোগের কারণে চিকিৎসক যদি তরল গ্রহণের বিষয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়ে থাকেন, সেটিই মেনে চলতে হবে।

কয়েক দিন ওষুধ খাওয়ার পরও যদি জ্বর, মাথাব্যথা বা শরীরের ব্যথা না কমে, তা হলে নিজের মতো করে ওষুধের মাত্রা বাড়ানো ঠিক নয়। বরং চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে উপসর্গের কারণ খুঁজে বের করা প্রয়োজন।

কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

জ্বর বার বার ফিরে এলে, মাথাব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে কিংবা শরীরে ব্যথা কয়েক দিন ধরে চলতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ব্যথানাশক খাওয়ার পর প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে, পা বা শরীরের কোনও অংশ অস্বাভাবিক ভাবে ফুলে গেলে কিংবা কোনও কারণ ছাড়াই অতিরিক্ত ক্লান্তি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের দ্বারস্থ হওয়া প্রয়োজন।

ইন্দোরের যুবকের ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, সাধারণ মনে হওয়া উপসর্গের ক্ষেত্রে নিজের মতো করে বার বার ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। ব্যথা বা জ্বর সাময়িক ভাবে কমিয়ে দেওয়াই চিকিৎসার শেষ কথা নয়। উপসর্গের কারণ জানা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক চিকিৎসা নেওয়াই শরীরকে বড় জটিলতা থেকে রক্ষা করার সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।

দাবিত্যাগ: এই প্রতিবেদনটি সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। এখানে দেওয়া তথ্য চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। কোনও ওষুধ শুরু, বন্ধ বা পরিবর্তনের আগে অবশ্যই যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সূত্র: এনডিটিভি