তিন বছরের শিশু রাফি এখনও স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারে না। আশপাশের সমবয়সী শিশুদের সাবলীলভাবে কথা বলতে দেখে তার বাবা-মায়ের উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে।
রাত সাড়ে ৯টা। ঘুমানোর আগে রাফির মা বিছানায় বসে আছেন। পাশে ছোট্ট রাফি। বিছানার পাশে সুন্দর করে সাজানো অনেক খেলনা। একটা লাল গাড়ি, কয়েকটা ব্লক, একটা ডাইনোসর, আর এক কোণে পড়ে আছে একটা ছবির বই।
মা বইটা হাতে নিয়ে বললেন, ‘আব্বু, গল্প শুনবে?’ রাফি কোনও উত্তর দিলো না। শুধু মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। মা বই খুললেন। প্রথম পাতায় একটা হলুদ রঙের হাঁস। ‘আরে! এটা কে?’ রাফি তবু কিছু বলল না। মা আবার বললেন, ‘হাঁসটা কি পানিতে নামবে?’ রাফির চোখ দুটো হঠাৎ বড় হয়ে গেলো। সে ছবিটার দিকে আঙুল দেখালো। মা হাসলেন--‘ওহ! তুমি হাঁসটাকে খুঁজে পেয়েছো!’
সেদিন রাফি কোনও শব্দ বলেনি। কিন্তু তার মা জানতেন না, কথা বলা শেখার যাত্রাটা ঠিক সেদিন থেকেই একটু একটু করে শুরু হয়ে গেছে।
শুধু শিশু রাফি নয়। এমন পরিস্থিতি অনেক পরিবারের জন্যই পরিচিত। তবে সব শিশুর ভাষা বিকাশের গতি এক নয়। কেউ দ্রুত কথা বলতে শেখে, আবার কেউ একটু বেশি সময় নেয়। এ সময় বাবা-মায়ের ধৈর্য, নিয়মিত যোগাযোগ এবং সঠিক উৎসাহ শিশুর ভাষা বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে। সঠিক সময়ে কারণ বোঝা এবং উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া শিশুর কথা বলার দক্ষতা বাড়াতে পারে।
‘ও তো সব বোঝে... কিন্তু বলে না’
স্পিচ ডিলে থাকা অনেক শিশুর বাবা-মায়ের মুখে আমরা প্রায় একই কথা শুনি ‘ও সব বুঝতে পারে। ‘যা বলি, সব কাজ করে। কিন্তু মুখে কিছু বলতে চায় না।’ এই অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই বাবা-মায়ের মনে অনেক প্রশ্ন আসে-- আমি কী করবো? আরও বেশি পড়াবো? বর্ণমালা শেখাবো? নাকি অপেক্ষা করবো?
এই প্রশ্নগুলোর মাঝেই একটা সহজ কিন্তু খুব শক্তিশালী উত্তর লুকিয়ে আছে। প্রতিদিন বই নিয়ে কিছুটা সময় কাটান। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন। বই পড়ানোর জন্য নয়। বই নিয়ে গল্প করুন।
বই কিভাবে কথা বলা শেখায়?
একটু ভেবে দেখুন। আপনি যখন কোনও ছবির বই খুলে বলেন-- ‘দেখো! একটা হাতি!’ তখন আসলে একসঙ্গে অনেক কিছু ঘটে।
শিশু ছবিটা দেখে, আপনার মুখের দিকে তাকায়, আপনার কণ্ঠ শুনে, শব্দ আর ছবির মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করতে শুরু করে, আপনার মুখের অভিব্যক্তি লক্ষ্য করে। হয়তো হাতিটাকে আঙুল দিয়ে দেখায়। এগুলো সবই কথা বলা শেখার অংশ।
বই পড়বেন না, গল্প করবেন
এটাই সবচেয়ে বড় পার্থক্য। ধরুন, বইয়ের পাতায় একটা বিড়ালের ছবি। অনেকে বলেন, ‘এটা একটা বিড়াল।’ তারপর পাতা উল্টে দেন। কিন্তু একটু অন্যভাবে চেষ্টা করুন। বলুন, ‘ও মা! বিড়ালটা কোথায় যাচ্ছে?’ ‘ও কি খুঁজছে?’ ‘তুমি হলে ওকে কী খেতে দিতে?’ ‘বিড়ালটা কি খুশি?’ ‘বিড়াল কিভাবে ডাকে?’ ‘মিয়াও করতে পারো?’ - এখন দেখুন কী হয়। শিশু হয়তো ‘মিয়াও’ বলবে। হয়তো শুধু হাসবে। হয়তো আপনার মুখ নকল করবে। হয়তো কিছুই করবে না। সবগুলোই মূল্যবান। কারণ সে আপনার সঙ্গে অংশ নিচ্ছে।
প্রশ্ন করুন... তারপর চুপ থাকুন
এটা শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে। কিন্তু অনেক সময় নীরবতাই কথা বলা শেখায়। আমরা প্রায়ই এমন করি ‘এটা কী?’ ‘বলো... আপেল।’ ‘না না... এভাবে বলো।’ ‘আপেল।’
শিশু উত্তর দেওয়ার আগেই আমরা উত্তর বলে ফেলি। তার বদলে প্রশ্ন করুন। তারপর পাঁচ-দশ সেকেন্ড অপেক্ষা করুন। এই অপেক্ষার মধ্যেই শিশুর মস্তিষ্ক কাজ করে। সে ভাবছে। মিল খুঁজছে। চেষ্টা করছে। হয়তো বলবে। হয়তো আঙুল দেখাবে। হয়তো শুধু আপনার দিকে তাকাবে। এসবই আপনার সঙ্গে যোগাযোগের লক্ষণ।
একই গল্প একশো বার?
একই বই বার বার পরলে আমরা ভাবি ‘একই বই তো কালও পড়েছি! এর মধ্যে নতুন কি আছে?’ অথচ আপনি জেনে অবাক হবেন, শিশুরা একই গল্প দিনের পর দিন শুনতে ভালোবাসে। কারণ তারা নিরাপত্তা অনুভব করে। পরের পাতায় কী আসবে, সেটা আন্দাজ করতে শেখে। একই শব্দ বারবার শুনতে শুনতে শব্দগুলো তাদের মস্তিষ্কে জমা হতে থাকে। যেমন- ‘বল’ ‘বল’ ‘বল’ একদিন হঠাৎ সে নিজেই বলে উঠল- ‘বল!’ আপনার কাছে সেটা একটা শব্দ। কিন্তু তার কাছে সেটা অনেক দিনের শেখার ফল।
বইয়ের প্রতিটি ছবি হতে পারে একটি কথোপকথন
একটা আপেলের ছবি? শুধু ‘আপেল’ বলেই থেমে যাবেন না। জিজ্ঞেস করুন- ‘এটার রং কী?’ ‘তুমি আপেল খাও?’ ‘আপেল মিষ্টি না টক?’ ‘আপেল গোল কেন?’ ‘আমরা বাজারে গেলে আপেল দেখেছিলাম মনে আছে?’ একটা ছবির মাধ্যমেই পাঁচ মিনিট কথা হয়ে যেতে পারে। আর কথা বলার পথ ঠিক এমনভাবেই বাড়ে।
যদি শিশু একদমই কথা না বলে?
তবুও বই বন্ধ করবেন না। সে যদি শুধু ছবি দেখে- তবুও শিখছে। সে যদি শুধু আপনার মুখ দেখে- তবুও শিখছে। সে যদি শুধু পাতাগুলো উল্টায়- তবুও শিখছে। কারণ মুখে বলার অনেক আগেই শিশুর মস্তিষ্কে কথা তৈরি হতে শুরু করে।
প্রতিদিন মাত্র ১০–১৫ মিনিট ভাবুন তো- রাতে ঘুমানোর আগে মোবাই, টিভি সব বন্ধ। কোনও তাড়া নেই। শুধু আপনি। আপনার শিশু। আর একটা ছবির বই। এই ১০–১৫ মিনিটে আপনি শুধু গল্প বলছেন না। আপনি আপনার সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ছেন।
তার চোখে চোখ রাখছেন। তার ছোট ছোট ইশারার উত্তর দিচ্ছেন। তাকে জানাচ্ছেন- ‘তোমার কথা আমি শুনতে চাই, তুমি যেভাবেই বলো না কেন।’
কোন ধরনের বই দিয়ে শুরু করবেন?
সব বই একরকম নয়। শুরুর জন্য বেছে নিতে পারেন বড় ও স্পষ্ট রঙিন ছবি, প্রতি পাতায় কম শব্দ, প্রাণী, ফল, যানবাহন বা পরিবারের পরিচিত সদস্যদের ছবি, ছন্দময় বা পুনরাবৃত্তিমূলক বাক্য -এমন বই যেখানে শিশুও আঙুল দিয়ে দেখাতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- বইটি যেন পড়ার চেয়ে একসঙ্গে দেখার বই হয়।
ছোট ছোট অভ্যাস, বড় পরিবর্তনের শুরু
কয়েক মাস পরে রাফির মা আবার বললেন, ‘জানেন, ও এখনও অনেক বাক্য বলে না। কিন্তু বই দেখলেই দৌঁড়ে আসে। হাঁস দেখলে 'প্যাক প্যাক' বলে। বিড়াল দেখলে 'মিয়াও' বলে। আমি যদি গল্প থামিয়ে দিই, নিজেই পাতা উল্টাতে চায়।‘ আর এটাই সেই পরিবর্তনের শুরু। কারণ ভাষা একদিনে আসে না। এটা তৈরি হয় হাজারো ছোট ছোট মুহূর্ত থেকে।
প্রতিটি শিশুর কথা বলা শেখার পথ এক নয়। কেউ খুব তাড়াতাড়ি কথা বলতে শুরু করে, আবার কারও একটু বেশি সময় লাগে। তাই অন্য কোনও শিশুর সঙ্গে তুলনা না করে, প্রতিদিন আপনার সন্তানের সঙ্গে ছোট ছোট কথোপকথনের মুহূর্ত তৈরি করুন।
মনে রাখবেন, একটি বই শুধু গল্পের পাতাই খুলে দেয় না- এটি খুলে দেয় শিশুর কল্পনার জগৎ, অনুভূতি প্রকাশের পথ এবং ভাষা শেখার অসংখ্য সুযোগ। প্রতিটি ছবি একটি প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে, প্রতিটি প্রশ্ন একটি নতুন শব্দের, আর প্রতিটি নতুন শব্দ একটি নতুন আত্মবিশ্বাসের।
তবে যদি আপনার সন্তানের বয়স অনুযায়ী কথা বলা বা যোগাযোগের বিকাশ নিয়ে উদ্বেগ থাকে, তাহলে অপেক্ষা না করে একজন স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট বা শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। ঘরে নিয়মিত বই নিয়ে গল্প করা এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সহায়তা- এই দুটি একসঙ্গে শিশুর কথা বলা শেখানোর জন্য একে অপরের সহায়ক হতে পারে।
লেখক: শিক্ষক প্রশিক্ষক | শিশু বিকাশবিষয়ক গবেষক ও লেখক