নজরুলকে মুসলমান কবি হিসেবে জাহির করানোর চেষ্টা হাস্যকর

নজরুল প্রতিভার শক্তি কেউই অস্বীকার করে না। মাত্র বাইশ বছরের কবি-জীবনে এককভাবে এতগুলো কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছড়া, এমনকি অনুবাদ এবং সর্বোপরি হাজার চারেক গান যার অধিকাংশ নিজেরই সুর করা—এত কিছু এক কিশোর-যুবকের কাছ থেকে পাওয়া বিস্ময়করই বটে। অন্য কোনো ভাষার সংস্কৃতিতে এমন দৃষ্টান্ত আছে বলে মনে হয় না। নজরুল ইসলাম একটা উন্মাদনার মধ্যে তার এইসব সৃষ্টিকর্ম রচনা করে হঠাৎই নীরব হয়ে যান।

ঔপনিবেশিক সমাজ ও সংস্কৃতির নানা দোষত্রুটি, অনাচার-অবিচার স্বচক্ষে দেখে এবং অভিজ্ঞতায় অর্জন করে তিনি বিশেষ করে কবিতা ও গানে যে দুর্ধর্ষ ও অভিনব ঢঙে তা প্রকাশ করেন তা বাস্তবিকই অভূতপূর্ব। আজন্মই নজরুল এক প্রতিবাদী কণ্ঠ।

আমাদের এই হতভাগ্য সমাজ, ইংরেজ শাসন, ধর্মীয় কুসংস্কার ইত্যাদিই তাঁর কবিতার মুখ্য উপজীব্য। প্রতিবাদী কণ্ঠ তাঁর জেগেছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে, চারদিক দেখে শুনে ক্ষেপে গিয়ে সমাজের অন্যায় অসংগতির বিরুদ্ধে একজন সচেতন কবির পক্ষে যতটুকু সোচ্চার হওয়া সম্ভব তা তিনি হয়েছেন।

আমাদের রাজনৈতিক দলগুলি ভারত ভাগের আগে থেকেই তাকে নানাভাবে নিজেদের স্বার্থোদ্ধারে ব্যবহার করেছে। হিন্দু সম্প্রদায় সামগ্রিকভাবে তাঁর কবি প্রতিভার অবমূল্যায়ন করলেও তাঁর শ্যামাসংগীত এবং হিন্দু দেবদেবীর বন্দনায় লেখা গান ও কবিতাকে স্বাগত জানিয়েছে। মুসলমান সম্প্রদায় তাঁর জীবনযাত্রা নিয়ে সন্তুষ্ট না হলেও তাঁর ইসলামি গান, নাত, হামদ ইত্যাদি পছন্দ করেছে। আসলে নজরুলের মতো একজন কবিকে তাঁর সৃষ্টির বিচ্ছিন্ন কিছু অংশ দিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে চেনা সম্ভব নয়। এজন্য লোকে বড় কবিদের কাজের বিভিন্ন অংশ নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করে থাকে।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমরাও ব্যাপকভাবে রবীন্দ্র-নজরুলকে ব্যবহার করেছি। সে সময় ‘আমার সোনার বাংলা’ যখন ট্রানজিস্টারে বাজতো, দেখেছি ওই বেতার ঘিরে বসে থাকা কৃষকরা হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠেছে। নজরুলের ‘চল চল চল’, ‘কারার ওই লৌহ-কপাট’ ইত্যাদি গান অভূতপূর্ব প্রেরণা দিয়েছে। জীবনানন্দের কবিতা, সুকান্তের কবিতা সে সময় আমাদের উৎসাহ জুগিয়েছে। আবার মোহিনী চৌধুরীর ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে’ কিংবা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধন ধান্য পুষ্পভরা’ ইত্যাদি গান স্বাধীনতা আন্দোলনে যেমন, তেমনি জুলাই অভ্যুত্থানেও জুগিয়েছে প্রভূত উদ্দীপনা।

যেহেতু আমাদের দেশের প্রধান আন্দোলনগুলি ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী এবং ধর্ম নিরপেক্ষ, সেজন্য নজরুলের শিল্পকর্মের অংশ-বিশেষ ব্যবহার করে তাঁকে বিশেষ ধর্মের পক্ষে টানার চেষ্টাকে অপপ্রয়াস বলেই চিহ্নিত করতে হবে।

ব্যক্তিগত জীবনে নজরুল ইসলাম যেমন কোনো বিশেষ ধর্মের অনুরাগী ছিলেন না, তেমনি তাঁর শিল্পকর্মেও ঘটিয়েছিলেন উদার মানবিক ধর্মের প্রকাশ। এ দিক থেকে তাঁকে বাংলাদেশের নিজস্ব দর্শন বাউলদের প্রচারিত মানবধর্মের অনুসারী বললেও বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না।

বিশ্ব-দর্শনশাস্ত্রে আমাদের কিছুমাত্র অবদান যদি থাকে তো সেটা বাউল দর্শন। লালন শাহ, হাসন রাজা, রাধারমণ প্রমুখ কবির লালিত ও প্রচারিত মানব ধর্ম নজরুল কাব্যেরও মূল কথা। তিনি এক বিদ্রোহী বাউল বটে।

তাই আজ তাকে মাত্র রবীন্দ্রনাথের মুখোমুখি বা মুসলমান কবি হিসেবে জাহির করার চেষ্টা হাস্যকর বলে মনে হয়। তাঁর মতো এক বিস্ময়-প্রতিভাকে কখনোই ক্ষুদ্র স্বার্থ হাসিলের জন্য খণ্ডিত আকারে ব্যবহার করা উচিত নয়। তাঁর বিশাল, বিস্তৃত, বহুমুখী সাহিত্যকর্মের নানা বিশ্লেষণ, নানা উপযোগিতার কথা মাথায় রেখে তাঁকে পাঠ করা উচিত—ক্ষুদ্র স্বার্থ চরিতার্থের জন্য কখনোই নয়।

শ্রুতিলিখন : উমামা জামান মিম