লোকেরা নিজেদের সুবিধামতো নজরুলকে উদ্ধৃত করছে এবং ব্যবহার করছে, কিন্তু নজরুল মূলত একজন অসাম্প্রদায়িক কবি ও সর্ব মানবতার কবি। তিনি খণ্ডিত নন এবং তাঁকে কোনোভাবেই খণ্ডন করা যায় না।
বর্তমান সময়ে তাঁকে ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করে বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে, তবে সেই ব্যবহারটুকুকে আমাদের উপেক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠী নজরুলকে সম্পূর্ণ নিজেদের আদর্শের ছাঁচে ফেলে আপন করে দাবি করার এক তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। কেউ তাঁর ইসলামিক ঘরানার সৃষ্টিকে আঁকড়ে ধরে তাঁকে নির্দিষ্ট একটি ধর্মীয় বৃত্তে বন্দি করতে চায়, আবার কেউ তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ ও সাম্যবাদী চেতনাকে ঢাল বানিয়ে তাঁকে অন্য রঙে রাঙাতে চায়। এই যে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা ও সুবিধাবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য নজরুলকে নিয়ে দলগত টানাহেঁচড়া—এটি তাঁর সুবিশাল ক্যানভাসকে ছোট করার এক অপচেষ্টা মাত্র। এই ব্যবহারটুকুকে আমাদের উপেক্ষা করতে হবে।
আমরা আমাদের মতো করে তাঁকে বিবেচনা করব এবং ঐতিহাসিকভাবে তাঁকে বিচার করব। সেই ঐতিহাসিক মানদণ্ডে নজরুল একজন খাঁটি মানবতাবাদী কবি এবং মানবতার দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি অনেক উঁচু স্থানে অবস্থান করছেন, তিনি কোনোভাবেই সংকীর্ণ নন।
যদি এভাবে খণ্ডিত উপায়ে এবং দলীয় সংকীর্ণতার মোড়কে নজরুলের মূল্যায়ন করা হয়, তবে সামগ্রিকভাবে নজরুলের আলোচনা হুমকির মুখে পড়বে। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি কখনো আপোস করেননি। তিনি আজীবন মুক্তি চেয়েছিলেন—মানুষের মুক্তি এবং সর্বহারার মুক্তি। তিনি ধর্মীয় সংকীর্ণতার তীব্র বিরুদ্ধে ছিলেন। যারা ধর্মীয় সংকীর্ণতার মধ্যে আবদ্ধ থাকে, তিনি তাদের বিরুদ্ধে গিয়ে একটি উদার মানবতাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্মকে এবং ধর্মের শক্তিকে ব্যবহার করেছেন। তিনি এই শক্তিকে কখনোই সংকীর্ণ অর্থে ব্যবহার করেননি।
কাজেই নজরুলের সেই প্রকৃত রূপটিকে আমাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। অর্থাৎ মানুষের মুক্তি, মানুষের স্বাধীনতা এবং মানুষের শোষণ-পীড়ন থেকে মুক্তির জন্য আমরা পুনরায় নজরুলকে সামনে নিয়ে আসতে পারি। সবকিছুর ঊর্ধ্বে নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনাটাই হলো মূল কথা, তিনি মূলত সর্ব মানবের কবি।
শ্রুতিলিখন : উমামা জামান মিম









