যারা ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ চায়, তাদের পক্ষে নজরুলকে হজম করা সম্ভব নয়

আনু মুহাম্মদ
২৪ মে ২০২৬, ২৩:৫০আপডেট : ২৫ মে ২০২৬, ১৫:০৮

একজন লেখকের মূল চরিত্রকে আড়াল করে তাকে অপবাদ দেওয়া কিংবা তাকে অপব্যবহার করা মূলত দুর্বৃত্তের কাজ; আর যারা এটি করে, তারা আসলে দুর্বৃত্ত।

নজরুল শ্রেণীগত ধর্মীয় জাতিগত বিভেদ বিদ্বেষের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি এমন একটি সমতার সমাজ স্বপ্ন দেখতেন, যেখানে সকল ধর্ম জাতি এবং সকল লিঙ্গের মানুষের মধ্যে একটি ঐক্যবদ্ধ মানবিক পরিবেশ থাকবে। শ্রেণীগত নিপীড়ন বৈষম্য দূর হবে। এই কারণেই তিনি বিপ্লবী রাজনীতির সাথেও একাত্মতা বোধ করতেন। তাঁর সম্পাদিত ‘লাঙল’ পত্রিকা, ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা এবং তাঁর কবিতা, গদ্য, বক্তৃতা সবকিছুর মধ্যে আমরা এই বিপ্লবী চেতনার স্পষ্ট স্বাক্ষর পাই। আর এই বিপ্লবী চেতনা রবীন্দ্রনাথের সাথে তাঁর কোনো সংঘাত তৈরি করেনি, কারণ রবীন্দ্রনাথও অন্তর্গতভাবে একজন বৈষম্যবিরোধী মানুষ ছিলেন।

নজরুলকে সামাজিকভাবে বা সাম্প্রদায়িক উপায়ে ব্যবহার করার একটা অপচেষ্টা বহুদিন থেকেই চলছে। তবে নজরুলকে যারা যথাযথভাবে পাঠ করতে সক্ষম, তাদের পক্ষে এই ধরনের অপপ্রচার চালানো বা বিশ্বাস করা সম্ভব নয়। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, ভারত বিরোধিতা আর সাম্প্রদায়িকতা কিন্তু এক বিষয় নয়। ভারত বিরোধিতা মানে ভারতের আধিপত্যবাদ কিংবা বাংলাদেশের জন্যভারতের ক্ষতিকর ভূমিকার বিরুদ্ধে যৌক্তিক প্রতিবাদ করা। কিন্তু ভারত বিরোধিতার কথা বলে ফাঁকা আওয়াজ তোলা এবং তার মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ঢুকিয়ে কিংবা সাম্প্রদায়িকতার রং দিয়ে মূল রাজনৈতিক প্রশ্নটাকে আড়াল করাই এই অপচেষ্টাকারীদের মূল উদ্দেশ্য। এটি মূলত দুই দেশের ধর্মীয় ফ্যাসিবাদকেই সহায়তা করে, করছেও।

এই অপচেষ্টাটি বহুদিন থেকেই একশ্রেণির লোক উদ্দেশ্যমূলকভাবে করে আসছে। যাদের ভেতরে সাম্প্রদায়িকতা ভরা এবং যারা সাম্প্রদায়িকতাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তারাই মূলত এগুলো প্রচার করে। অন্যদিকে, সমাজের মধ্যে এমন কিছু মানুষও থাকেন যাদের এই সমস্ত বিষয় সম্পর্কে কোনো সঠিক ধারণা নেই; তাদেরকে চট করে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয় এই দুর্বৃত্তরা। 

কিন্তু কেউ যদি দায়িত্ব নিয়ে নজরুলকে জানার চেষ্টা করে তাহলে অনেক বিভ্রান্তিই দূর হবে। তখন অপপ্রচারের বিপরীতে গিয়ে তারা পরিষ্কার দেখতে পাবে যে রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের মধ্যকার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত উষ্ণ। নজরুল রবীন্দ্রনাথকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন, গুরুদেব বলতেন, তাকে নিয়ে লিখেছেনও। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথওনজরুলকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন, নিজের বই নজরুলকে উৎসর্গ করেছিলেন। নজরুল যখন জেলে বন্দী ছিলেন, তখন রবীন্দ্রনাথ তাঁর জন্য লিখেছেন। যদিও দুজনের লেখার ধরন আলাদা ছিল, তবুও তাদের চিন্তার মধ্যে কিছু অভিন্ন বিষয় ছিল। যেমন—দুজনেই অত্যন্ত মানবিক ছিলেন এবং একটি মুক্তচিন্তার, মুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখতেন; যা নানাভাবে তাদের লেখার মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। নজরুল অবশ্য এসব ব্যাপারে তুলনামূলকভাবে বেশি উচ্চকিত এবং সরব ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের লেখার মধ্যে যেখানে একটি সুগভীর ও বহমান ধারা ছিল, নজরুল সেখানে খুব স্পষ্ট করেবিষয়গুলোকে সরাসরি সবার সামনে নিয়ে এসেছেন। নজরুল সাম্যবাদী দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি রুশ বিপ্লব দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাঁর লেখালেখির মধ্যে প্রবলভাবে শোষণ, নিপীড়ন ও বৈষম্যবিরোধী বিষয়গুলোই প্রধান হিসেবে উঠে এসেছে।
নজরুলের ‘বিদ্রোহী’সহ অনেক কবিতা এবং বিভিন্ন লেখালেখিতে পরিষ্কার দেখা যায় যে ধর্মের নামে যারা ভণ্ডামি করে কিংবা ধর্মের নামে যারা শোষণ ও নিপীড়ন চালায়, তাদের বিরুদ্ধে নজরুল সবসময় অত্যন্ত সোচ্চার ছিলেন। হিন্দু এবং মুসলিম উভয় ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর তীক্ষ্ণ সমালোচনা ছিল। এখন যারা সমাজে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে চায়, তাদের পক্ষে নজরুলকে হজম করা সম্ভব নয়; কারণ এসব বৈষম্যবাদী তৎপরতার বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা নজরুলের কবিতার মধ্যেই রয়েছে। তিনি হিন্দু নাকি মুসলিম—তা জিজ্ঞেস না করে সবাইকে মানুষ হিসেবে দেখতেন। তাঁর কবিতায় যখন তিনি বলেন—“কান্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা’র”—তখন পরিষ্কার বোঝা যায় যে, শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের কথা বলার সময় তিনি তাদেরকে কোনো ধর্মীয় পরিচয়ে দেখেননি। বরং যারা মানুষকে ধর্মীয়ভাবে বিভক্ত করে দেখে, তিনি তাদের তীব্র সমালোচনা করেছেন।

তিনি যেমন অত্যন্ত শক্তিশালী ভাষায় ইসলামি গান লিখেছেন, ঠিক তেমনি সমান শক্তিশালীভাবে শ্যামাসংগীতও রচনা করেছেন। নজরুলের মতো এমন গভীর শ্যামাসংগীত স্বয়ং হিন্দু ধর্মের মানুষের পক্ষেও লেখা কঠিন। তিনি মূলত ইসলামি গান এবং শ্যামাসংগীত—দুটোই মানুষের ভেতরের আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা ও চাহিদার জায়গা থেকে লিখেছেন। বিষয়টি এমন নয় যে, তিনি হিন্দু ধর্মের শ্যামাসংগীত লিখে ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে যাচ্ছেন, কিংবা ইসলামি সংগীত লিখে হিন্দু ধর্মের বিরোধিতা করছেন। তাই সাম্প্রদায়িকতার কোনো দিক নজরুলের জীবন ও দর্শনের সাথে কোনোভাবেই মেলানো যায় না।

নজরুল এবং রবীন্দ্রনাথ প্রায় একই সময়ের এবং একই অঞ্চলের মানুষ, বর্তমান ভারতের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চল। এমন তো নয় যে নজরুলবর্তমান বাংলাদেশের মানুষ ছিলেন। তারপরও আমরা নজরুলকে আমাদের নিজেদের লোক মনে করি। একইকারণে বাংলা সাহিত্যের এবং এই অঞ্চলের ধারাবাহিকতায় আমরা রবীন্দ্রনাথকেও আমাদের আপন লোক মনে করি। সীমান্ত দিয়ে সাহিত্যের চিন্তার সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে ভাগ করা যায় না। সেজন্য এই দুজনের চিন্তা, কবিতা ও গান আমাদের চিরকাল অনুপ্রাণিত ও উদ্বুদ্ধ করে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও আমরা দেখেছি যে, এই দুজনের কবিতা গান আমাদের বড় শক্তি দিয়েছিল।

তাই যারা আজ রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়, তারা মূলত সাম্প্রদায়িক শক্তি, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী বৈষম্যবাদীশক্তি। তারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেরও বিরোধী শক্তি। আর সাধারণ মানুষের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো না বুঝে, না জেনেই তাদের সাথে বিভ্রান্ত হয়ে থাকতে পারে।

কিন্তু আবারও বলি একটু খোঁজখবর নিলেই স্পষ্ট দেখা যাবে যে, নজরুল হচ্ছেন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী কণ্ঠস্বর এবং সাম্যবাদের পক্ষের একজন দৃঢ় মানুষ। নজরুল এবং রবীন্দ্রনাথ এই দুজনের হাত ধরে, আরও অনেকের কাজে, আমাদের সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে, আমাদের চিন্তার জগৎ সমৃদ্ধ হয়েছে। ভবিষ্যতেও আমাদের পথচলার বড় শক্তির জায়গা হয়ে থাকবেন এই নজরুল এবং রবীন্দ্রনাথ।

শ্রুতিলিখন : উমামা জামান মিম

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
কাজী নজরুল ইসলাম হলেন ‘বাংলাদেশের মন’: প্রধানমন্ত্রী 
নজরুলকে মুসলমান কবি হিসেবে জাহির করানোর চেষ্টা হাস্যকর
নজরুলকে নিয়ে দলগত টানাহেঁচড়া উপেক্ষা করতে হবে
সর্বশেষ খবর
জাল নোট রাখলে শাস্তি, আসছে কঠোর আইন 
জাল নোট রাখলে শাস্তি, আসছে কঠোর আইন 
মোহাম্মদপুরে দুই জন গ্রেফতার, ৬২০ কেজি তামার তারসহ যা যা জব্দ
মোহাম্মদপুরে দুই জন গ্রেফতার, ৬২০ কেজি তামার তারসহ যা যা জব্দ
বিশ্বকাপে হারের পর লন্ডনে মরক্কো সমর্থকদের তাণ্ডব, আহত পুলিশ
বিশ্বকাপে হারের পর লন্ডনে মরক্কো সমর্থকদের তাণ্ডব, আহত পুলিশ
আগৈলঝাড়া থানায় হামলা ও পুলিশকে মারধরের ঘটনায় আটক ১৮
আগৈলঝাড়া থানায় হামলা ও পুলিশকে মারধরের ঘটনায় আটক ১৮
সর্বাধিক পঠিত
খামেনির জানাজায় লাখো মানুষের ঢল, তবে আড়ালে অন্য চিত্র
খামেনির জানাজায় লাখো মানুষের ঢল, তবে আড়ালে অন্য চিত্র
‘মদ নিষিদ্ধের’ বিল কেন প্রত্যাহার করে নিলেন জামায়াত এমপি
‘মদ নিষিদ্ধের’ বিল কেন প্রত্যাহার করে নিলেন জামায়াত এমপি
সরোয়ার আলমগীরই হলেন চট্টগ্রাম-২ আসনের এমপি
সরোয়ার আলমগীরই হলেন চট্টগ্রাম-২ আসনের এমপি
সপ্তাহে একবার নেওয়ার ইনসুলিন চালু ভারতে, দাম কত
সপ্তাহে একবার নেওয়ার ইনসুলিন চালু ভারতে, দাম কত
সাত লাখের কথা বলে দুই লাখ গাছ লাগানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বললেন ‘দুঃখজনক’ 
সাত লাখের কথা বলে দুই লাখ গাছ লাগানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বললেন ‘দুঃখজনক’