নজরুল অনুবাদের অভিজ্ঞতা ও অনুধ্যান

আলমগীর মোহাম্মদ
২৪ মে ২০২৬, ০০:২৯আপডেট : ২৪ মে ২০২৬, ০০:২৯

কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় কবি। তিনি বাংলা সাহিত্যের এমন এক জ্যোতিষ্ক, যাঁর সৃষ্টির পরিধি শুধু বিশালই নয়, বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যময়। কবিতা, গান, উপন্যাস, ছোটোগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, চিঠিপত্র এবং অভিভাষণ—সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তিনি এক স্বতন্ত্র ও অবিস্মরণীয় স্বাক্ষর রেখে গেছেন। নজরুল মূলত সাম্য, মানবতা, বিদ্রোহ ও প্রেমের কবি। তাঁর এই কালজয়ী সাহিত্যকর্মকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়ার একমাত্র এবং প্রধান মাধ্যম হলো এর মানসম্মত ও বস্তুনিষ্ঠ অনুবাদ। নজরুল সাহিত্যের যথাযথ মূল্যায়ন এবং তাঁকে বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে অনুবাদের কোনো বিকল্প নেই। দুর্ভাগ্যবশত, বিশ্বসাহিত্যে নজরুলের সমসাময়িক অনেক লেখক যেভাবে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন, নজরুল সেখানে অনেকটাই উপেক্ষিত রয়ে গেছেন। তাঁর সাহিত্যের যে গভীরতা ও বৈশ্বিক আবেদন, সেই তুলনায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নজরুলের পরিচিতি এখনো সীমিত। তাই নজরুল সাহিত্যের বিশ্বায়নের লক্ষ্যে অনুবাদের প্রয়োজনীয়তা আজ এক ঐতিহাসিক দাবি।

নজরুল সাহিত্যের অনুবাদ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না পৌঁছানোর পেছনে সবচেয়ে বড়ো কারণ হলো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ এবং সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। যেকোনো ক্লাসিক সাহিত্য অন্য ভাষায় রূপান্তরের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ অনুবাদক প্যানেল এবং পর্যাপ্ত তহবিলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন সবসময়ই ছিল অপ্রতুল। বিগত দশকগুলোতে যা কিছু অনুবাদ হয়েছে, তা মূলত অনুবাদকদের ব্যক্তিগত আগ্রহ, শ্রম এবং অনুরাগের ফসল। প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় না থাকায় এই ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার মধ্যেও কিছু সীমাবদ্ধতা দেখা গেছে। যেমন, অনুবাদকেরা অনেকেই নিজেদের পছন্দের নির্দিষ্ট কিছু কবিতা বা টেক্সট বারবার অনুবাদ করেছেন। ফলে ‘বিদ্রোহী’ বা ‘কামাল পাশা’র মতো কিছু জনপ্রিয় কবিতা একাধিকবার অনূদিত হলেও নজরুলের বিশাল গদ্যসাহিত্য, নাটক বা অনেক গুরুত্বপূর্ণ চিঠি ও ভাষণ সম্পূর্ণ অগোচরে থেকে গেছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি না থাকায় অনুবাদের মান সবসময় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড স্পর্শ করতে পারেনি। একটি সুনির্দিষ্ট অনুবাদ নীতিমালার অভাব এখানে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল। তবে এই স্থবিরতার বৃত্তে একটি আশার আলো দেখা যায় ২০২৫ সালে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে নজরুল সাহিত্যকর্মের ইংরেজি অনুবাদের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে একজন সদস্য হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ার সুবাদে নজরুল সাহিত্যকর্মকে নতুন করে অনুবাদের এবং একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে কাজ করার চমৎকার সুযোগ আমার তৈরি হয়। এই উদ্যোগ নজরুল সাহিত্যের অনুবাদে একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে বলা যায়।

করোনা মহামারি বিশ্বকে স্থবির করে দেওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে আমি নজরুলের চিঠিপত্র অনুবাদের কাজে হাত দিয়েছিলাম। এই অনুবাদ প্রক্রিয়াটি ছিল আমার জন্য এক পরম বিস্ময়ের এবং একই সাথে আবিষ্কারের। নজরুলের কবিতা ও গানে আমরা যে অমিত তেজ ও বিদ্রোহ দেখি, তাঁর চিঠিপত্রে পাওয়া যায় এক সম্পূর্ণ ভিন্ন, সংবেদনশীল ও রক্তমাংসের মানুষকে। চিঠিপত্রে ব্যক্তি নজরুল যেভাবে প্রতিফলিত হয়েছেন, তা এককথায় অনন্য। নজরুলের চিঠিপত্রগুলো ছিল তাঁর সমকালীন জীবনযাত্রা এবং ভেতরের লড়াইয়ের জীবন্ত দলিল। এই চিঠিপত্রগুলো অনুবাদ করতে গিয়ে আমি নজরুলের জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি। সেখানে মূর্ত হয়েছে দারিদ্র্যের কশাঘাত, সন্তানের অকাল মৃত্যু এবং এর ফলে সৃষ্ট গভীর মানসিক বেদনা ও ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি। একই সাথে নজরুলের রোমান্টিক সত্তা, তাঁর প্রেম ও বিরহের আকুলতা এবং সমকালীন বিভিন্ন প্রকাশক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বের সাথে তাঁর সম্পর্কের জটিল টানাপড়েনও এই চিঠিপত্রগুলোতে চমৎকারভাবে উঠে এসেছে।

নজরুলের চিঠিপত্রের গদ্য অত্যন্ত তাৎক্ষণিক, আবেগঘন এবং তাঁর নিজস্ব ভাষাভঙ্গিতে সমৃদ্ধ। তিনি চিঠিতে এমন কিছু আঞ্চলিক শব্দ, সমকালীন রূপক এবং নিজস্ব বাচনভঙ্গি ব্যবহার করেছেন যা সাধারণ গদ্যে সচরাচর দেখা যায় না। এই গদ্যের নিজস্বতা অনুবাদে হুবহু ধরে রাখা অত্যন্ত জটিল একটি কাজ। অনুবাদ করতে গিয়ে আমার মূল লক্ষ্য ছিল 'ইকুইভ্যালেন্স' বা সমার্থকতা বজায় রাখা। ইংরেজি ভাষায় রূপান্তরের সময় যেন নজরুলের মূল ভাব, তাঁর কণ্ঠস্বরের তীব্রতা এবং চিঠির ভেতরের আবেগটি হারিয়ে না যায়—সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হয়েছে। আক্ষরিক অনুবাদ পরিহার করে ভাবগত ও কাঠামোগত সামঞ্জস্য বজায় রাখার এক নিরন্তর চেষ্টা ছিল আমার এই কাজে।

'কুইন্টইসেন্স অব নজরুল' (Quintessence of Nazrul) নামে নজরুল সাহিত্যকর্মের একটি বিশেষ বাছাই সংস্করণ প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সম্মানজনক সংকলনে নজরুলের কালজয়ী উপন্যাস 'মৃত্যুক্ষুধা' অনুবাদের গুরুদায়িত্বটি আমার ওপর অর্পিত হয়। 'মৃত্যুক্ষুধা' নজরুলের একটি সমাজমনস্ক ও বাস্তবতাবাদী উপন্যাস, যেখানে তৎকালীন নদীয়া অঞ্চলের মুসলিম নিম্নবিত্ত সমাজের দারিদ্র্য, ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার এবং মানুষের বেঁচে থাকার তীব্র লড়াই চিত্রিত হয়েছে। এই উপন্যাসটি অনুবাদের ক্ষেত্রে আমাকে সবচেয়ে বড়ো দুটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল: কালচারাল এডাপ্টেশান (Cultural Adaptation) এবং এল্যুশান (Allusion) বা পরোক্ষ উল্লেখের ব্যবহার।

'কুইন্টইসেন্স অব নজরুল' (Quintessence of Nazrul)
'মৃত্যুক্ষুধা' উপন্যাসের চরিত্রগুলোর ভাষা স্থানীয় উপভাষা এবং ইসলামি-বাংলা সংস্কৃতির মিশ্রণ। সেখানে এমন অনেক শব্দ, প্রবাদ, গালিগালাজ এবং সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের বিবরণ আছে যা পশ্চিমা বা ইংরেজিভাষী পাঠকদের সংস্কৃতির সম্পূর্ণ বাইরে। উদাহরণস্বরূপ— রান্নাঘরের তৈজসপত্র, গ্রামীণ খাদ্যসামগ্রী বা নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় রীতিনীতিকে ইংরেজিতে রূপান্তর করতে গিয়ে কেবল আক্ষরিক শব্দ বসালে মূল রসটি মার খেয়ে যায়। তাই সেখানে সাংস্কৃতিক রূপান্তর বা কালচারাল এডাপ্টেশান করতে হয়েছে, যাতে ইংরেজি পাঠক শব্দের ভেতরের সাংস্কৃতিক আবহটি অনুধাবন করতে পারেন। অন্যদিকে, নজরুল তাঁর এই উপন্যাসে প্রচুর পরিমাণে ধর্মীয়, ঐতিহাসিক এবং পৌরাণিক 'অ্যাল্যুশন' বা পরোক্ষ উল্লেখ ব্যবহার করেছেন। তিনি একই সাথে ক্যালিফোর্নিয়া, আরব ও পারস্যের ইতিহাস থেকে শুরু করে কোরআন-হাদিসের প্রসঙ্গ এবং হিন্দু পুরাণের রূপক ব্যবহার করেছেন তাঁর চরিত্রগুলোর মনস্তত্ত্ব বোঝাতে। একজন বিদেশি পাঠকের পক্ষে এই দ্বি-সাংস্কৃতিক এল্যুশানগুলোর মর্মার্থ বোঝা কঠিন। তাই অনুবাদে এমন শব্দচয়ন করতে হয়েছে যা এই পরোক্ষ উল্লেখগুলোর অন্তর্নিহিত অর্থকে স্পষ্ট করে তোলে, এবং ক্ষেত্রবিশেষে টীকা বা ফুটনোটের সাহায্য নিতে হয়েছে।

নজরুলের গল্পগুলো বাংলা কথাসাহিত্যে এক অনন্য সংযোজন। 'ব্যথার দান', 'রিক্তের বেদন' কিংবা 'শিউলি মালা'র মতো গল্পগুলোতে রোমান্টিকতা এবং বাস্তবতার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। তবে নজরুলের গল্পের সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্ট্য হলো এর গদ্যভাষা। তিনি যখন গল্প লেখেন, তখন তাঁর ভেতরের কবিসত্তাটি পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। ফলে তাঁর গল্পের গদ্য হয়ে ওঠে অত্যন্ত কাব্যিক, ছন্দোময় এবং আলংকারিক। এই গল্পগুলোর অনুবাদে কোনো সাধারণ বা যান্ত্রিক পদ্ধতি খাটানো অসম্ভব। নজরুলের গল্পের গদ্যভাষা পুরোপুরি তাঁর নিজস্ব জগতের সৃষ্টি। এখানে অনুবাদকের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো গল্পের 'এসেন্স' (Essence) বা মূল নির্যাস ধরে রাখা। নজরুলের বাক্য গঠনের যে আবেগীয় গতিশীলতা, তা ইংরেজিতে রূপান্তর করতে গেলে অনেক সময় বাক্য বড় হয়ে যায় বা তার নান্দনিকতা নষ্ট হয়। তাই এখানে শব্দে শব্দে অনুবাদের চেয়ে নজরুলের সেই 'কাব্যিক গদ্যের' মেজাজ বা টোনটি ধরে রাখা জরুরি ছিল। এই এসেন্স বা ভাবরস অক্ষুণ্ন রাখা ছাড়া নজরুলের গল্প অনুবাদে আহামরি বা চমকপ্রদ কিছু করা প্রায় অসম্ভব, কারণ মূল লেখার সৌন্দর্যই তার নিজস্ব গদ্যরীতির মধ্যে নিহিত।

নজরুল কেবল সাহিত্য সৃষ্টিই করেননি, তিনি ছিলেন সমাজ ও রাজনীতির এক অগ্রগামী কণ্ঠস্বর। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সভায় দেওয়া তাঁর ভাষণ, প্রতিভাষণ ও অভিভাষণগুলো (যেমন: 'যুগবাণী', 'রাজবন্দীর জবানবন্দী' বা 'অনিল-স্মরণ') বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। এগুলো অনুবাদ করার ক্ষেত্রেও আমাকে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়েছে। নজরুলের ভাষণগুলোর একটি বিশেষ দিক হলো, এগুলো আপাতদৃষ্টিতে সংক্ষিপ্ত মনে হলেও থিমের দিক থেকে অত্যন্ত গভীর, তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সচেতন। নজরুল যখন ভাষণ দেন, তখন তিনি প্রাচীন ঐতিহ্য থেকে শুরু করে সমকালীন বৈশ্বিক রাজনীতি—সবকিছুকে এক সুতোয় বাঁধেন। এখানে অনুবাদ করতে গিয়ে 'ডায়নামিক ইকুইভ্যালেন্স' (Dynamic Equivalence) বা গতিশীল সমার্থকতা তত্ত্বের মাথা রাখা ছিল সবচেয়ে জরুরি। ডায়নামিক ইকুইভ্যালেন্সের মূল কথাই হলো—অনূদিত টেক্সটটি পাঠক বা শ্রোতার মনে ঠিক সেই ধরনের মানসিক ও আবেগীয় প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, যা মূল টেক্সটটি তার নিজস্ব ভাষার পাঠক বা শ্রোতার মনে তৈরি করেছিল। নজরুলের তীব্র দেশপ্রেম, অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জন এবং সাম্যের ডাককে ইংরেজি ভাষায় সমানভাবে প্রভাবশালী করে তুলতে নজরুলের 'ইন্টেন্ট' বা বোঝা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কেন এই শব্দটি ব্যবহার করলেন, তাঁর অবদমিত ক্ষোভ বা আশাবাদের জায়গা কোনটি—তা না বুঝে ভাষণ অনুবাদ করলে তা কেবল কিছু শুষ্ক রাজনৈতিক শব্দের সমষ্টিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

নজরুলের নাটক ও নাটিকাগুলো (যেমন: 'ঝিলিমিলি', 'আলেয়া', 'মধুমালা') তাঁর সাহিত্যের আরেকটি জটিল ও ভিন্নধর্মী এলাকা। নজরুলের নাটকের ভাষা একাধারে কাব্যিক, গীতিময় এবং লোকজ উপাদানে ভরপুর। নাটকের সংলাপগুলোর মধ্যে যে গতি ও নাটকীয়তা থাকে, তা অন্য ভাষায় রূপান্তর করা যেকোনো অনুবাদকের জন্যই একটি বড় পরীক্ষা। নজরুল নাটকের অনুবাদে মূলত দুটি বিষয়ের ওপর সবচেয়ে বেশি মনোযোগ নিবিষ্ট করতে হয়েছে: দেশজ উপাদান এবং কালচারাল এডাপ্টেশান। নজরুলের নাটকে বাংলার গ্রামীণ সমাজ, লোকগাথা, মেলা, পার্বণ এবং লোকসংগীতের প্রচুর ব্যবহার রয়েছে। এই দেশজ উপাদানগুলোর অনেকটিরই সরাসরি কোনো ইংরেজি প্রতিশব্দ নেই। আবার, নাটকের সংলাপ যদি অনূদিত ভাষায় পড়ার সময় কৃত্রিম বা আড়ষ্ট শোনায়, তবে নাটকের মূল আবেদনই নষ্ট হয়ে যায়। তাই সংলাপের ক্ষেত্রে কালচারাল এডাপ্টেশান এমনভাবে করতে হয়েছে যেন ইংরেজি সংলাপেও নজরুলের চরিত্রের আবেগ, রাগ বা উপহাসের সুরটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফুটে ওঠে।

লেখকের অনুবাদগ্রন্থ
নজরুল সাহিত্যের সামগ্রিক অনুবাদ প্রক্রিয়াটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চিঠিপত্রে ব্যক্তি নজরুলের ট্র্যাজেডি প্রকাশে ফরমাল ও ইনফরমাল গদ্যের সামঞ্জস্য রক্ষা করা জরুরি। উপন্যাসে প্রয়োজন আঞ্চলিক উপভাষা ও বহু-সাংস্কৃতিক এল্যুশানের গভীর কালচারাল এডাপ্টেশান, ছোটগল্পে আক্ষরিকতা পরিহার করে টেক্সটের 'এসেন্স' রক্ষা করা আবশ্যক, ভাষণ ও প্রবন্ধে নজরুলের 'ইন্টেন্ট' বুঝে 'ডায়নামিক ইকুইভ্যালেন্স' প্রয়োগ করা প্রধান শর্ত। এবং নাটক ও নাটিকায় দেশজ উপাদানের যথোপযুক্ত রূপান্তর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৫ সালে নজরুল ইনস্টিটিউটের নেওয়া উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, তবে এটিকে একটি স্থায়ী ও চলমান প্রক্রিয়ায় রূপ দিতে হবে। নজরুল সাহিত্যের বিশ্বস্ত ও মানসম্মত অনুবাদের জন্য নজরুল ইনস্টিটিউট বা বাংলা একাডেমির অধীনে একটি স্থায়ী অনুবাদ সেল গঠন করা উচিত, যেখানে দেশ-বিদেশের ভাষাবিদ ও অনুবাদকেরা নিয়মিত কাজ করবেন। তরুণ অনুবাদকদের উৎসাহিত করতে নজরুল সাহিত্য অনুবাদের ওপর বিশেষ ফেলোশিপ ও কর্মশালার আয়োজন করা প্রয়োজন। একই সাথে, অনূদিত গ্রন্থগুলো যাতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ও বিশ্বজুড়ে পরিবেশিত হয়, তার জন্য কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিতে হবে।

নজরুল যে সাম্যবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা ও বিশ্বমানবতার কথা বলে গেছেন, আজকের যুদ্ধ বিক্ষুব্ধ ও বিভক্ত পৃথিবীতে তার প্রাসঙ্গিকতা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। নজরুলকে কেবল বাঙালির কবি হিসেবে বন্দি না রেখে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার এই যে সুযোগ ২০২৫ সালের কমিটির মাধ্যমে তৈরি হয়েছে, তা যেন বিন্দুমাত্র ম্লান না হয়। অনুবাদক হিসেবে আমাদের কাজ হলো নজরুলের সেই অম্লান চেতনাকে অন্য ভাষার পাঠকদের হৃদয়েও জ্বেলে দেওয়া। নজরুল সাহিত্যের সঠিক ও মানসম্মত অনুবাদই হবে এই মহান কবির প্রতি আমাদের শ্রেষ্ঠ প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত শ্রদ্ধাঞ্জলি।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
কাজী নজরুল ইসলাম হলেন ‘বাংলাদেশের মন’: প্রধানমন্ত্রী 
যারা ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ চায়, তাদের পক্ষে নজরুলকে হজম করা সম্ভব নয়
নজরুলকে মুসলমান কবি হিসেবে জাহির করানোর চেষ্টা হাস্যকর
সর্বশেষ খবর
পানের প্রতীক দেখে চেনা যাবে এই উপজেলার ঐতিহ্য
পানের প্রতীক দেখে চেনা যাবে এই উপজেলার ঐতিহ্য
হাঁসের বাচ্চা বেচাকেনা নিয়ে বিরোধে একজনকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ
হাঁসের বাচ্চা বেচাকেনা নিয়ে বিরোধে একজনকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ
এবার কাশিমপুর মহিলা কারাগারের জেল সুপার বদলি, জেলার বরখাস্ত
এবার কাশিমপুর মহিলা কারাগারের জেল সুপার বদলি, জেলার বরখাস্ত
শরিকদের দূরে যেতে দিতে চান না প্রধানমন্ত্রী: মান্না
শরিকদের দূরে যেতে দিতে চান না প্রধানমন্ত্রী: মান্না
সর্বাধিক পঠিত
পরবর্তী ২০৩০ ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজক কারা, জেনে নিন সূচি ও নতুন ফরম্যাট
পরবর্তী ২০৩০ ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজক কারা, জেনে নিন সূচি ও নতুন ফরম্যাট
কোচের পাঁচ ভুলেই বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার পরাজয়
কোচের পাঁচ ভুলেই বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার পরাজয়
ইলিশের জালে ধরা পড়ছে বড় বড় পাঙাশ, দামও কম
ইলিশের জালে ধরা পড়ছে বড় বড় পাঙাশ, দামও কম
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো ৪৯ রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রত্যাহার
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো ৪৯ রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রত্যাহার
সাবান-আইসক্রিমসহ চার প্রতিষ্ঠানের ৮ পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ 
সাবান-আইসক্রিমসহ চার প্রতিষ্ঠানের ৮ পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ