২০০৯ সালে ইলেভেনে পড়ার সময় বাবার সঙ্গে শিলিগুড়িতে গিয়েছিলাম। সেই সময় শিলিগুড়িতে গেলে বাঘাযতীন পার্কে অধ্যাপক-সাহিত্যিক হরেন ঘোষের বাড়িতে একবার অবশ্যই যেতাম। বাবার সঙ্গে তার অত্যন্ত হৃদ্যতা ছিল। আমিও তার স্নেহ পেয়েছি। তার কন্যা, কবি সেবন্তী ঘোষ বাবাকে একটি বই দিলেন 'ফুর্তি ও বিষাদ কাব্য'। এ বইয়ের প্রচ্ছদ যেন আর পাঁচটা বইয়ের চেয়ে আলাদা। তাই বিশেষ ভাবে নজরে এসেছিল। সেই প্রথম আমি যোগেন চৌধুরীর ছবি দেখি। রেখা দিয়ে আঁকা এক নারীর মুখ। একই মুখাবয়বে যেন ফুর্তি ও বিষাদ—এই দুই বৈপরীত্য প্রকাশ পেয়েছে। আলিপুরদুয়ারে ফিরে গেলেও এ বইয়ের প্রচ্ছদ আমি মাঝেমাঝে দেখতাম।
পরের বছর কলকাতায় চলে এলে এই শহরে যোগেন চৌধুরীর প্রদর্শনীর খবরাখবর পেতাম। খুব একটা চিত্রপ্রীতি ছিল না বলেই প্রথমদিকে সেইসব প্রদর্শনী দেখতে যাওয়া হতো না। ২০১৩ সালে এক শীতের সকালে শিল্পীর সাউথ সিটির ফ্ল্যাটে যাওয়ার সুযোগ হলো। সেও সেবন্তীদির সৌজন্যে। তিনি আমাকে বলেছিলেন, তার কবিতার বই 'দিল-দরিয়া'র প্রচ্ছদ এঁকেছেন যোগেনদা। আমাকে সেটা নিয়ে এসে কলেজস্ট্রিটের আনন্দ পাবলিশার্সে দিয়ে আসতে হবে। সাউথ সিটিতে যাওয়া মানে বিরাট ঝক্কি! কেন দেখা করতে চান? কোত্থেকে এসেছেন? এসব নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়! সেইসব প্রশ্নোত্তর পেরিয়ে তার ফ্ল্যাটের কলিংবেল বাজালাম। বউদি দরজা খুলে দিয়েই বললেন, 'তোমাকে সেবন্তী পাঠিয়েছে? বোসো।' মিনিট পাঁচেক বাদে শিল্পী যোগেন চৌধুরী এলেন গায়ে একটা সাল জড়ানো। হাতে প্রচ্ছদের কাগজ, একবার দেখিয়ে খামবন্দি করে দিলেন। গোটা ঘটনাটাই একটা ঘোরের মধ্যে কেটে গিয়েছিল। চা-খেতে দেখেছিলাম ফ্ল্যাটের দেয়ালে টাঙানো তার ছবিগুলি। দেশভাগের ঝড় বয়ে যাওয়া রুক্ষ মানুষের মুখচ্ছবি!
এরই কাছাকাছি সময়ে সুধীর চক্রবর্তীর একটি বই প্রকাশিত হয়েছিল গগণেন্দ্র আর্ট গ্যালারিতে। উদ্বোধক কবি জয় গোস্বামী সেদিন অনুষ্ঠানে আসার সময় রবীন্দ্রসদন চত্বরে যোগেনদার সঙ্গে দেখা হলে শিল্পীকেও সঙ্গে নিয়ে আসেন। সেখানে ফের তার সঙ্গে দেখা। এমনই নানা অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে দেখা হতো। ২০১৫ সালে গড়িয়াহাটের মেঘমল্লার আবাসনে কবি উৎপলকুমার বসুর 'হাঁস চলার পথে' বইটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন জয়দা। তারই আমন্ত্রণে আমি সেদিন গিয়েছিলাম। সেখানে এসেছিলেন যোগেন চৌধুরী। উৎপলকুমার বসু তখন হুইলচেয়ারে। যোগেনদা বলেছিলেন প্যারিসে তারা কীভাবে থাকতেন, কবিতা লিখতেন আর ছবি দেখতেন—এইসব দিনগুলির কথা। প্যারিসে জায়গার অভাবে ছোট্ট-একটা বারান্দার মধ্যে দুজনকে থাকতে হতো—সম্ভবত এমন স্মৃতিচারণ করেছিলেন তিনি।
এরপর আমি মিডিয়াকর্মী হয়ে উঠলে তার সঙ্গে নানা সভায় দেখা-সাক্ষাৎ, ফোনে কথাবার্তা চলত। কখনও ঝোলা থেকে বের করে হাতে ধরিয়ে দিতেন নিজের প্রদর্শনীর চিঠি! খামের ওপর লিখে দিতেন নাম। এরই মধ্যে একটা মজার ব্যাপার ঘটলো। তিনি কোনও পত্রিকায় আমার একটি কবিতা পড়েছেন। চারুকলা অ্যাকাডেমির নীচে একদিন দেখা হতেই বললেন, 'তুমি তো কখনও বলোনি কবিতা লেখো! আমি তোমার কবিতা পড়েছি। আমি ভাবতাম তুমি সাংবাদিক। এখন দেখছি দিব্য কবিতা লেখো'! আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েছিলাম। কী বলব! বলেছিলাম যে, আপনাকে আমার কবিতার বই দেব। দিতে গেলাম ২০১৯ সালে পুজোর সময়, ষষ্ঠীতে। বইয়ের নাম 'খামখেয়ালি পাশবালিশ'। পারলে সে বইয়ের ছোট ছোট লেখাগুলি আমার সামনেই পড়ে ফেলেন! সেদিন অনেকটা সময় দিয়েছিলেন। প্রায় আড়াই ঘণ্টা। আর সেদিনের আড্ডার পরই যেন তার খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম। আমার নতুন বইয়ের জন্য একটি প্রচ্ছদ করে দেওয়ার অনুরোধ জানাই। যোগেনদা তখন রাজ্যসভার সাংসদ। খুবই ব্যস্ত থাকেন একথা তো আমার জানা। তাই বলেছিলাম, আপনার পুরোনো যেকোনও ছবি দিলেই হবে, আমি তা শিরোধার্য করে রাখব। কিছুদিন পর দুটো প্রচ্ছদ দিয়ে তিনি বলেছিলেন, যেটা ভালো লাগে ব্যবহার করো। দুটো ছবিই আমার কাজে লেগেছিল দুটো বইয়ের জন্য। গদ্যের বই 'মধুর তোমার' এবং কবিতার বই 'ছদ্মবেশ ধরে আছে কবিতাসকল'। সোশ্যাল মিডিয়ায় কভার পোস্ট করতেই ব্যাপক সাড়া পড়ে। খুবই খুশি হয়েছিলেন সেবন্তীদি। ঘটনাচক্রে সেবারের বইমেলায় প্রকাশিত তার বইয়ের প্রচ্ছদ করেছিলেন অন্য একজন শিল্পী। তাই ফেসবুকে তিনি মন্তব্য করেন, 'এবার আমার বই থেকে যো উড়ে গিয়ে তোমার বইয়ে বসেছে!'
একটা ব্যাপারে যোগেনদা আক্ষেপ করতেন, তা হলো অনেক ক্ষেত্রে প্রচ্ছদ ঠিকমতো রূপায়ণ হতো না। তার ছবিটি হুবহু বসিয়ে দিলেই হয় না। তাকে প্রচ্ছদ হিসেবে ফুটিয়ে তুলতে গেলে আনুষঙ্গিক কিছু কাজ করতে হয়। এক্ষেত্রে তিনি আমার বইগুলির প্রচ্ছদ রূপায়ণ দেখে বেশ তুষ্ট হতেন। সে কথা বলতেনও আমাকে। এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব অবশ্য ভাষালিপির সঞ্জীব চৌধুরীর। রাজা লেনে বসে বসে দেখতাম কী-নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি যোগেনদার প্রচ্ছদগুলি রূপায়ণ করছেন আমার বইয়ের জন্য।
এরই মধ্যে যোগেনদার আর্ট সেন্টার চারুবাসনায় আমার খুব যাতায়াত শুরু হলো। প্রায় প্রতিদিন যেতাম। নবীন-প্রবীণ কত শিল্পীর প্রদর্শনী দেখা হলো এই ক'বছরে। আর্ট সেন্টারে ঢোকার মুখে তিনি ভিজিটর্স ডায়রি লক্ষ্য করতেন, খেয়াল রাখতেন কে কে চারুবাসনায় এসেছেন! প্রদর্শনী দেখার ফাঁকে অনেক সময় ছবি নিয়ে কথা বলতেন তিনি। এমন বহুবার তার কথা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। গড়িয়াহাটে দেবভাষায় তার প্রদর্শনী দেখতে গিয়েছি। ছোট পোস্টকার্ডের ওপর আঁকা নানা ছবি। বইমেলায় তার সঙ্গে দেখা হতো। আমাদের ডাকে তিনি এসেছিলেন সুবোধ সরকারের ভাষানগর কবিতার গাড়িতে। মার্বেল ডাস্টের ওপর সেবার ত্রিনয়ন এঁকে তিনি গাড়ির পথচলা শুরু করেছিলেন। তারপর দু-চার কথা বলে মিশে যেতেন বইমেলার ভিড়ে। হেঁটে হেঁটে পুরো মেলাটা ঘুরতেন। ফের তার সঙ্গে দেখা হতো। নিয়ে যেতেন চারুবাসনার স্টলে।
আত্মমগ্ন শিল্পী তিনি কথা বলার সময় কখনও খেই হারিয়ে ফেলতেন। হয়ত তখন ছবির চিন্তা মাথায় ঘুরত। একবার তার জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাতে ফোন করেছি, ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি সেদিনের সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারলেন না, অনুষ্ঠানটি কোথায় হবে! এতে আমি বেজায় বিপাকে পড়েছিলাম। কিছুক্ষণ বাদে আর্ট সেন্টারের কর্মী হারুদা আমাকে ফোন করে জানান, জন্মদিনের অনুষ্ঠানটি হবে লেক ক্লাবে! যা হোক, আমি একগুচ্ছ গোলাপ নিয়ে হাজির হই তার সমনে। সে এক স্মরণীয় মুহূর্ত।
আমার আরেকটি গদ্যের বই 'কিছুই হারায় না'-এর জন্য ফের তার একটি পুরোনো ছবি প্রচ্ছদের জন্য দিতে বলেছিলাম। আমাকে অবাক করে, পাণ্ডুলিপি পড়ে তিনি এঁকে দিয়েছিলেন সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রচ্ছদ! ঘটনাটি আজও আমাকে বিস্মিত করে। কলমের কালিতে, সূক্ষ্ম রেখায় ফুটে ওঠা নানা মানুষের মুখচ্ছবি, ফুল, পাতা ইত্যাদি। বইয়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসেছিলেন যোগেনদা। তাকে যখন আমন্ত্রণ জানাতে যাই চারুবাসনায়, তিনি তৎক্ষণাৎ তারিখ লিখে রেখেছিলেন ডায়রিতে। এভাবেই তার সঙ্গে আমার সম্পর্কের শিকড় গভীরে চলে যায়। অনুষ্ঠানে তার বক্তব্যে তিনি রিপিট করেছিলেন সেই কথাটা, অরুণাভকে একজন সাংবাদিক হিসেবেই চিনতাম। পরে জানতে পারি গদ্য-পদ্য লেখে। আর এ কারণেই সে আমার স্নেহের পাত্র হয়ে উঠেছে।