বিদ্যুৎস্পৃষ্টে শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে নির্মাণাধীন ২০ তলা অ্যাকাডেমিক ভবনের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর গত ১৩ জুন আবারও কাজ শুরু হয়েছে।
কাজ বন্ধ থাকার বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তার কথা বললেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দফতর বলছে, অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে কাজ বন্ধ ছিল।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি ছাত্র সংগঠনকে চাঁদা না দেওয়ায় কাজ বন্ধ ছিল। তাদের সঙ্গে প্রশাসনের বৈঠকের পর কাজ শুরু অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে, ২০ তলা অ্যাকাডেমিক ভবনের নির্মাণকাজ করার সময় গত ৩১ মে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে সাগর নামে এক শ্রমিক মারা যান। তার বাড়ি নেত্রকোনা। ওই দিন রাতে রাবিতে অধ্যয়নরত নেত্রকোনো জেলার শিক্ষার্থীরা ভবনের নির্মাণকাজ বন্ধ করে আন্দোলন শুরু করেন। পরে তাদের সঙ্গে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা যোগ দেন। এক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিরা আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধানের আশ্বাস দিলে আন্দোলন স্থগিত করা হয়।
আরও পড়ুন: রাবিতে নির্মাণাধীন ভবনে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে শ্রমিকের মৃত্যু
পরে ১ জুন বিকালে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মজিদ সন্সের প্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ছাত্রলীগ নেতাকর্মী ও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে নেত্রকোনা জেলা সমিতির সঙ্গে বৈঠকে বসেন বিশ্ববিদ্যাল প্রশাসন। এতে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী ও অধ্যাপক সুলতান উল ইসলাম, ছাত্র উপদেষ্টা তারেক নূরসহ প্রশসানের শীর্ষ ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে নিহতের পরিবারকে এককালীন ক্ষতিপূরণ, তার বোনের পড়াশোনার খরচের ব্যয় বহনসহ চার দফা দাবি জানানো হয়। এছাড়া দাবি না মানা পর্যন্ত কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়।
এ বিষয়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপক জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘নেত্রকোনা জেলা সমিতির শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণ করা হয়েছে ৪ জুন। ওই দিনই তারা জানিয়েছে, কাজ শুরুতে তাদের পক্ষ থেকে কোনও বাধা নেই। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করে কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল। তাই আমরা কাজ শুরু করতে পারিনি।’
নেত্রকোনা জেলা সমিতির সভাপতি মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমরা আন্দোলন করেছিলাম, যাতে নিহত শ্রমিকের পরিবার ক্ষতিপূরণ পায়। পরে নিহত সাগরের মা আমাদের জানিয়েছেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। তারপর থেকে আমরা কাজ বন্ধ রাখতে বলিনি।’
প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী খন্দকার শাহরিয়ার রহমান বলেন, ‘আমাদের কিছু অভ্যন্তরীণ সমস্যা ছিল, যার কারণে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। তবে সম্প্রতি প্রশাসনের সহযোগিতায় সমস্যা সমাধান করে কাজ শুরুর অনুমতি দেওয়া হয়েছে।’ তবে নিরাপত্তা নিশ্চিতের ব্যর্থতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কথা এড়িয়ে যান।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা এবং বিশ্ববিদ্যালয়েল প্রকৌশল দফতরে একাধিক প্রকৌশলী ও প্রশাসনের এক শীর্ষ ব্যক্তি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, একটি ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের চাঁদা না দেওয়ায় কাজ বন্ধ ছিল। তারা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে কাজের বাজেটের পাঁচ শতাংশ চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তারা আবারও চাঁদার বিষয়টি সামনে আনেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশ অনুসারে ৪ জুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মজিদ অ্যান্ড সন্সের একজন পরিচালক ক্যাম্পাসে আসেন। প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকের পর চাঁদা দাবি করা ওই ছাত্র সংগঠনের শীর্ষনেতারা বৈঠক করেন। তবে কোনও সমাধান হয়নি।
চাঁদা চাওয়ার বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন প্রকৌশল দফতরের একাধিক প্রকৌশলী। নাম প্রকাশ না করা শর্তে ওই প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক প্রকৌশলী বলেন, ‘প্রকৌশল দফতর ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিরা চাঁদার বিষটি জানতেন। তবে গত সপ্তাহে উপাচার্যের সঙ্গে ওই ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক হয়। বৈঠকের পর উপাচার্য কাজ শুরুর অনুমতি দেন।’
তবে বৈঠকে ওই ছাত্র সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে কিনা প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এই প্রকৌশলী তা নিশ্চিত করতে পারেননি।
চাঁদা দাবির বিষয় জানতে চাইলে মন্তব্য করতে রাজি হননি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, ‘কোনও ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে আমার বৈঠক হয়নি। এছাড়া কাজ বন্ধ বা চালু রাখার বিষয়টি আমাদের প্রকল্প পরিচালক দেখেন। আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। আমরা কাজ দিয়েছি, কাজ বুঝে নেবো। কাজের মান দেখার জন্য আমাদের একটা কমিটি রয়েছে। তারা প্রতি মাসে ভিজিট করেন।’