নদীমাতৃক বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসে ‘মেলা’ কেবল একটি সাময়িক উৎসব নয়, বরং এটি গ্রামবাংলার মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি এবং সামাজিক মেলবন্ধনের এক শক্তিশালী মাধ্যম। বর্ষবরণ, ঋতু পরিবর্তন আর ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আয়োজিত হয় শত বছরের প্রাচীন সব মেলা। কোনোটি আড়াইশত বছরের পুরনো ‘জামাই মেলা’, কোনোটি পাপমোচনের আশায় পুণ্যার্থীদের মিলনমেলা, আবার কোনোটি গ্রামীণ পণ্য ও লোকজ ঐতিহ্যের ভাণ্ডার।
তবে আধুনিকতার ছোঁয়া আর সঠিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেক প্রাচীন মেলা আজ তার চিরচেনা জৌলুশ হারাতে বসেছে। কোথাও মেলার রূপান্তর ঘটছে নতুন সামাজিক প্রথায়, আবার কোথাও অব্যবস্থাপনায় ফিকে হয়ে আসছে শত বছরের ঐতিহ্য। কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা থেকে শুরু করে টাঙ্গাইল, গাজীপুর কিংবা নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দ—প্রতিটি জনপদের মেলার রয়েছে আলাদা ইতিহাস ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। বাংলার এই বৈচিত্র্যময় লোকজ মেলার বর্তমান অবস্থা, বিবর্তন ও স্থানীয় মানুষের জীবনের ওপর এর প্রভাব নিয়ে আমাদের এই বিশেষ আয়োজন।
মেলা নয় যেন পারিবারিক মিলনমেলা
বাঙালির সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ মেলা। গ্রামবাংলার বিভিন্ন প্রান্তে বছরের বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের মেলা বসে। এর অংশ হিসেবে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বিনিরাইল এলাকায় প্রায় আড়াইশত বছর ধরে বসছে ‘জামাই মেলা’। এটি মাছের মেলা নামে শুরু হলেও পরে জামাই মেলা হিসেবে পরিচিতি পায়। এটি এখন শুধু কেনাবেচার স্থান নয় বরং স্থানীয়দের কাছে সামাজিক বন্ধন, আবেগ ও ঐতিহ্যের মিলনমেলা।
জৌলুশ হারিয়েছে ‘মহারাজপুর মেলা’
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মহারাজপুর মেলা কালের বিবর্তনে এবং অব্যবস্থাপনার কারণে জৌলুস হারিয়েছে। শহরের অদূরে প্রায় ২০০ বছর আগে মহারাজপুরের মিয়া-চৌধুরীরা শুরু করেছিলেন এই মেলার আয়োজন। ঐতিহ্যবাহী মেলাটি একসময় সাড়ম্বরে উদযাপিত হলেও বর্তমানে সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে মূল আকর্ষণ ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব হারিয়েছে। দিন দিন লোকজনও কম আসছেন।
গ্রামীণ সংস্কৃতিতে মেলা একটি ঐতিহ্যবাহী ‘উৎসব’। পণ্য কেনাবেচার সঙ্গে এই আয়োজন বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মিলনমেলায় রূপ নেয়। কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার চিলমারী উপজেলায় সনাতন হিন্দুধর্মাবলম্বীদের মহাঅষ্টমী পুণ্যস্নানে পুণ্যার্থীদের ঢল নেমে। তা ঘিরে শত বছর ধরে আয়োজন হয়ে আসছে ‘অষ্টমীর মেলা’ ও ‘বালাবাড়িহাট মেলা’। এক উৎসব ঘিরে দুই মেলার আয়োজন ওই এলাকার গ্রামীণ সংস্কৃতির কয়েকশত বছরের অবিচ্ছেদ্য আয়োজন। লোকজ ঐতিহ্যে মুখরিত থাকে দুই মেলা।
কত বছর আগে শুরু হয়েছিল লাঙ্গলবন্দের মেলা
নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দে ব্রহ্মপুত্র নদে সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মহাঅষ্টমী পুণ্যস্নানে লাখো পুণ্যার্থীর ঢল নামে প্রতি বছর। এই পুণ্যস্নান ঘিরে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে প্রতি বছর জমে লাঙ্গলবন্দের মেলা। এতে লাখ লাখ দেশি-বিদেশি ভক্তরা জমায়েত হন। পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত এই লাঙ্গলবন্দ স্থান ও মেলার রয়েছে ধর্মীয় ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতা। দেবতার আশীর্বাদের পর থেকে পাপমোচনের লক্ষ্যে লাঙ্গলবন্দের ব্রহ্মপুত্র নদে লাখ লাখ পুণ্যার্থী স্নানোৎসবে আসতে শুরু করেন। পুণ্যার্থীদের প্রয়োজনের তাগিদে ও ভক্তদের মিলনমেলা হিসেবে শত শত বছর আগে থেকে এই মেলার যাত্রা শুরু হয়।
‘কুমারবাড়ির মেলা’ কীভাবে হলো ‘জামাই মেলা’
টাঙ্গাইলের রসুলপুরে ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে চলছে ঐতিহ্যবাহী জামাই মেলা। এটিকে কেন্দ্র করে অন্তত ৩০ গ্রামের জামাই-বউয়ের ঢল নামে মেলায়। ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে দিনটির জন্য অপেক্ষা করেন এই অঞ্চলের জামাই-বউরা। এই দিনে প্রায় প্রতি বাড়িতে জামাইদের উপস্থিতিতে আনন্দ উদযাপন করা হয়। বিশেষ করে জামাই-বউদের উপস্থিতিতে মিলনমেলায় পরিণত হয় মেলাটি।