ঈদকার্ড এখন কেবলই ইতিহাস

বাঙালি মুসলমানের জীবনে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সময় বিশেষ আকর্ষণ ছিল ঈদকার্ড। প্রতি বছর প্রধান এই দুটি উৎসবের সময় কার্ড দিয়ে নিমন্ত্রণ বা শুভেচ্ছা জানাতেন অনেকেই। দুই ঈদের আগে নানান নকশার ও রঙের বিভিন্ন ধরনের বাহারি কার্ডের পসরা সাজিয়ে বসতো দোকানিরা। ক্রেতাদের ভিড়ে পা ফেলার মতো জায়গাও মিলতো না রাজধানীর পুরানা পল্টনের কার্ডপাড়ায়। সেসব এখন কেবলই ইতিহাস!

বুধবার (৬ জুলাই) ঢাকার এই ব্যস্ততম এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিচিত্র সব কার্ডের দোকানগুলো খুলে বসে আছেন ব্যবসায়ীরা। সারি সারি তাকে আগের মতোই সাজানো রয়েছে কার্ড। বিয়ের কার্ড থেকে শুরু করে সুন্নাতে খতনা- সব ধরনের কার্ড শোভা পাচ্ছে। কেবল দেখা মিলছে না এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় ঈদকার্ডের। নেই ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় আর বিক্রেতাদের বিরামহীন কর্মব্যস্ততা।

এদিন অন্তত ডজনখানেক দোকানির সঙ্গে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের। তারা বলছেন, একযুগ আগেও ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সময় এক একটি দোকানে প্রতিদিন ১-৫ লাখ টাকার ঈদকার্ড বিক্রি হতো। বাণিজ্যিক কারণে এই সময়টার অপেক্ষায় থাকতো সবাই। ডিজিটালের ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে এই অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে, যাতে শেষ পেরেকটা মেরেছে করোনা মহামারি।

ঈদকার্ডের বাজারে এক সময় রমরমা ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম- আইডিয়াল প্রোডাক্টস, আজাদ প্রোডাক্টস, আমিন প্রোডাক্টস, রনি প্রোডাক্টস, রাজ প্রোডাক্টস, গোল্ডেন প্রোডাক্টস, জিয়া প্রোডাক্টস, ফারহান প্রোডাক্টস, রনি প্রোডাক্টস, মদিনা প্রোডাক্টস, ওরিয়েন্টাল প্রোডাক্টস, এবি কার্ড সেন্টার, এইচআর প্রোডাক্টস, হ্যাপি প্রোডাক্টস, শোভন প্রোডাক্টস।

এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এখন ঈদকার্ড মিলছে কেবল আজাদ প্রোডাক্টসে। বাকিদের কেউ কেউ বেশি কার্ডের অর্ডার পেলে ছেপে দিচ্ছে। ক্রেতা না থাকায় রেডি ঈদকার্ড কোনও দোকানে মিলছে না।

আইডিয়াল প্রোডাক্টেসের ম্যানেজার নজরুল ইসলাম খান বলেন, ঈদকার্ড বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতির অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছিল। কিশোর থেকে বয়স্ক- সকলেই এই কার্ড ব্যবহার করতেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও তাদের নামে ঈদকার্ড করতো। এটি এখন কালের পরিক্রমায় হারিয়ে গেছে।

আজাদ প্রোডাক্টেসের ম্যানেজার জামিল হোসেন বলেন, নতুন করে ঈদকার্ড আর ছাপানো হচ্ছে না। আগে ছাড়া বিভিন্ন ধরনের কার্ড ডিসপ্লেতে আছে। করোনার আগে কিছুটা বিক্রি হলেও এখন ক্রেতা নেই বললেই চলে। অথচ এই দোকানেই ক্রেতাদের ভিড়ে পা ফেলা দুষ্কর ছিল এক সময়!

প্রায় একই মন্তব্য আমিন প্রোডাক্টসের মালিক মো. আমিন উদ্দিন, নিউ হ্যাপি প্রোডাক্টসের ম্যানেজার মতিউর রহমান, এশিয়া প্রোডাক্টসের মালিক রাশেদ খানের কাছ থেকে। তারা জানান, ঈদকার্ডের পাশাপাশি তখন বিভিন্ন ধরনের স্টিকার, ভিউকার্ড ও পকেট কার্ড বিক্রি হতো সমান তালে। এখন সেসব স্মৃতির জাদুঘরে স্থান পেয়েছে।

বর্তমানে কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের নামে ঈদকার্ড করে থাকে, যা হাতে হাতে কিংবা পোস্ট অফিস ও কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে প্রাপকের কাছে পাঠানো হয়। এ বিষয়ে জানতে জিপিওতে থাকা ডাক বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বলেছেন, ব্যক্তিগত পর্যায়ের ঈদকার্ড রেজিস্ট্রি খুব একটা হয় না। তবে প্রতিষ্ঠানের কিছু ঈদকার্ড ইস্যু হতে দেখা যায়। একই ধরনের তথ্য জানিয়েছেন বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিস এসএ পরিরহনের চিঠিপত্র ইস্যু করা বিভাগের একজন নারী কর্মকর্তাও।