লোকোমোটিভ সংকটে দীর্ঘদিন ধরেই ধুঁকছে বাংলাদেশ রেলওয়ের মালবাহী পরিবহন ব্যবস্থা। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকায় কনটেইনার ট্রেন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ব্যবসায়ীরা বেশি খরচের সড়ক ও নৌপথের দিকে ঝুঁকছেন। কনটেইনার পরিবহনে এই পতন সবচেয়ে স্পষ্ট। বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত তিন বছরে কনটেইনার পরিবহন থেকে আয় কমেছে ২৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। একই সময়ে পরিবহন করা পণ্যের পরিমাণ এবং ব্যবহৃত ওয়াগনের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
রেলওয়ের কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, লোকোমোটিভের সংকটে নিয়মিত মালবাহী ট্রেন চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। হাতে থাকা ইঞ্জিন বরাদ্দের ক্ষেত্রে যাত্রীবাহী ট্রেনকে অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘লোকোমোটিভের সংকটের কারণে চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে আগের মতো নিয়মিত কনটেইনার ট্রেন চালানো যাচ্ছে না। লোকোমোটিভের সংকটের কারণে যাত্রীবাহী ট্রেন বন্ধ রাখা সম্ভব নয়। তাই প্রথমে যাত্রীবাহী ট্রেনের জন্য লোকোমোটিভ বরাদ্দ দিতে হয়। এরপর যা থাকে, তা দিয়ে কনটেইনার ট্রেন চালাতে হয়।’
তার মতে, কনটেইনার ট্রেন চালাতে প্রতিদিন তিন থেকে চারটি লোকোমোটিভ প্রয়োজন হলেও চাহিদা অনুযায়ী তা দিতে পারছে না রেলওয়ে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের তথ্যেও কনটেইনার পরিবহনে ধারাবাহিক পতনের চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেলের ওয়াগনে ৭ লাখ ৯০ হাজার ৫৩৬ মেট্রিক টন পণ্য পরিবহন করা হয়। ৮০ হাজার ৭১৯টি ওয়াগন ব্যবহারের মাধ্যমে এ খাত থেকে আয় হয় ১১৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৭ হাজার ২৩ মেট্রিক টনে। ৬৩ হাজার ১০০টি ওয়াগন ব্যবহার করে আয় হয় ৭৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫৪ হাজার ৫৬৯টি ওয়াগনে মাত্র ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৫৯৭ মেট্রিক টন পণ্য পরিবহন করা হয়। এ থেকে আয় হয় ৮৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ২০২৩-২৪ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মধ্যে কনটেইনার পরিবহন থেকে রেলের আয় কমেছে ২৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
রেলওয়ের কর্মকর্তা ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই পতন আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ যাত্রী পরিবহনের তুলনায় মালবাহী ট্রেন থেকে রেলের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হতে পারে।
কনটেইনার পরিবহন বাড়াতে লাগেজ ভ্যান ও মৌসুমি বিশেষ ট্রেন চালুর মতো উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো স্থায়ী সেবায় রূপ নেয়নি। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে (আইসিডি)। সেখানে কনটেইনার চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
কমলাপুর আইসিডির তথ্য অনুযায়ী, আগের অর্থবছরের একই মাসের তুলনায় সর্বশেষ জুলাইয়ে সব প্রধান সূচকেই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিল অব এন্ট্রি দাখিল কমেছে ৩৩ দশমিক ০৯ শতাংশ, কনটেইনার চলাচল ৪৭ দশমিক ০৯ শতাংশ, আমদানি করা পণ্য ৫৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ, মূল্যায়নযোগ্য মূল্য ৩১ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং রাজস্ব আদায় কমেছে ৩১ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
আগের অর্থবছরের জুলাইয়ে বিল অব এন্ট্রির সংখ্যা ছিল ৮২২টি। সর্বশেষ জুলাইয়ে তা কমে হয়েছে ৫৫০টি। কনটেইনার চলাচল ১ হাজার ৫৭৯টি থেকে কমে হয়েছে ৮৩৬টি। আমদানি করা পণ্যের পরিমাণ ২৬ হাজার ৪১০ টন থেকে কমে মাত্র ১ হাজার ৯৪২ টনে নেমেছে। মূল্যায়নযোগ্য পণ্যের মূল্য ৬৪০ কোটি টাকা থেকে কমে হয়েছে ৪৩৯ কোটি টাকা। আর রাজস্ব আদায় ২৯৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ২০০ কোটি ২৬ লাখ টাকা।
কমলাপুর রেলওয়ে আইসিডির কমিশনার (কাস্টমস) কাজী মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন এই পতনের প্রধান কারণ হিসেবে লোকোমোটিভ সংকটকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, ‘কনটেইনার পরিবহন কমে যাওয়ার মূল কারণ রেলওয়ের ইঞ্জিনের সংকট। ফলে নিয়মিত মালবাহী ট্রেন আসছে না। ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে সড়ক ও নৌপথে পণ্য পরিবহন করছেন। কনটেইনার চলাচল কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।’
কমলাপুর আইসিডিতে কনটেইনার ট্রেনের অপর্যাপ্ত সরবরাহ নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষও একাধিকবার উদ্বেগ জানিয়েছে। গত ১০ আগস্ট চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ডেপুটি ট্রাফিক ম্যানেজারের (আইসিডি, কমলাপুর) সই করা এক চিঠি ঢাকা বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজারের কাছে পাঠানো হয়। এতে সংকট সমাধানে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
চিঠিতে বলা হয়, এর আগে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় চাহিদা অনুযায়ী প্রতি মাসে কমলাপুর আইসিডিতে প্রায় ৯০টি কনটেইনার ট্রেন সরবরাহের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। তবে বাস্তবে সরবরাহ সেই লক্ষ্যমাত্রার অনেক নিচে রয়েছে। মে মাসে মাত্র ৩২টি, জুনে ৪৪টি এবং জুলাইয়ে ৩৬টি কনটেইনার ট্রেন সরবরাহ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ দশমিক ২২টি ট্রেন পেয়েছে আইসিডি। এর ফলে আমদানি করা পণ্য খালাসে বিলম্ব হচ্ছে।
একইসঙ্গে খালি কনটেইনার এবং রফতানিপণ্যবোঝাই কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরে নেওয়ার কাজও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে আইসিডিতে কনটেইনার দীর্ঘ সময় পড়ে থাকছে। এতে আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও শিপিং এজেন্টদের খরচ বাড়ছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে বলেছে, এই পরিস্থিতির কারণে কয়েকটি শিপিং লাইন কমলাপুর আইসিডির পরিবর্তে বিকল্প টার্মিনাল বা বন্দর ব্যবহারের কথা ভাবছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরের তুলনায় কমলাপুর আইসিডিতে কনটেইনার হ্যান্ডলিং প্রায় ১৮ শতাংশ কমেছে।
স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা এবং বাণিজ্য ও সরকারি রাজস্ব আদায়ে আরও ব্যাঘাত ঠেকাতে প্রতিদিন অন্তত তিনটি, অর্থাৎ মাসে ৯০টি কনটেইনার ট্রেন দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে সংকট আরও তীব্র। বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মামুনুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে মালবাহী ট্রেন পরিচালনার জন্য প্রতিদিন প্রায় ১৫টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী তিন-চারটি লোকোমোটিভও দিতে পারছি না। এর ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ওয়াগনে পণ্য পরিবহন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। একই সঙ্গে কনটেইনার পরিবহন থেকেও আয় কমেছে।’
অতিরিক্ত মিটারগেজ লোকোমোটিভের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘লোকোমোটিভ পাওয়া গেলে যাত্রী ও মালবাহী—দুই ধরনের ট্রেন থেকেই আয় বাড়বে।’
লোকোমোটিভ সংকট যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন পরিচালনার মধ্যে একটি কাঠামোগত সংকট তৈরি করেছে। রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেনের মতে, যাত্রীবাহী ট্রেনকে অগ্রাধিকার দিতেই হচ্ছে, কারণ লোকোমোটিভ সংকটের কারণে যাত্রীবাহী ট্রেন বন্ধ রাখার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, ‘প্রথমে যাত্রীবাহী ট্রেনের জন্য লোকোমোটিভ বরাদ্দ দিতে হয়। এরপর অবশিষ্ট লোকোমোটিভ দিয়ে কনটেইনার ট্রেন চালানো হয়।’
ফলে এমন এক সময়ে মালবাহী ট্রেনের চলাচল অনিয়মিত হয়ে পড়েছে, যখন বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য চট্টগ্রাম বন্দর ও ঢাকার অভ্যন্তরীণ কনটেইনার সুবিধার মধ্যে নির্ভরযোগ্য যোগাযোগের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ডেপুটি ট্রাফিক ম্যানেজার (আইসিডি, কমলাপুর) মোহাম্মদ আশরাফ করিম চৌধুরী বলেন, ‘সংকট সমাধানে তারা রেলওয়েকে একাধিকবার অনুরোধ করেছেন। আমাদের প্রয়োজন মাসে ৯০টি কনটেইনার ট্রেন। আমরা অন্তত ৬০টি চেয়েছি। কিন্তু মাসে ৩০টি কনটেইনার ট্রেনও আসে না।’
তার মতে, লোকোমোটিভ সংকটের সমাধান হলে কমলাপুর আইসিডির পরিচালনাগত সমস্যাগুলো অনেকটাই কমবে।
মালবাহী পরিবহনে এই ধারাবাহিক পতন বাংলাদেশ রেলওয়ের সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক সেবাগুলোর একটি থেকে কতটা আয় করতে পারছে, সেই প্রশ্নও সামনে আনছে।
বাংলাদেশে মালবাহী পরিবহনে সড়কপথ এখনও প্রধান মাধ্যম। তবে দীর্ঘ দূরত্বে বড় পরিমাণ পণ্য পরিবহনে রেলের সুবিধা রয়েছে, বিশেষ করে বন্দর ও অভ্যন্তরীণ লজিস্টিকস কেন্দ্রগুলোর মধ্যে পণ্য পরিবহনে।
কিন্তু পর্যাপ্ত লোকোমোটিভ ও নিয়মিত মালবাহী ট্রেনের সময়সূচি না থাকায় ব্যবসায়ীরা অন্য পরিবহন ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছেন।
এর প্রভাব শুধু রেলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। অনিয়মিত কনটেইনার ট্রেন ব্যবসায়ীদের পরিবহন ব্যয় বাড়াচ্ছে, অভ্যন্তরীণ কনটেইনার সুবিধায় জট তৈরি করছে এবং রেলপথনির্ভর শুল্কসুবিধা দিয়ে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারে।
কনটেইনার চলাচল কমে যাওয়ার প্রভাব শুল্ক রাজস্বেও পড়ছে। জুলাইয়ে কমলাপুর আইসিডিতে রাজস্ব আদায় কমে যাওয়ার পরিসংখ্যানেই এর প্রমাণ মিলছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য মালবাহী পরিবহনের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে তাই মাঝে মধ্যে বিশেষ ট্রেন চালানো বা সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়াই যথেষ্ট হবে না। তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হলো, যাত্রীবাহী ট্রেনের পাশাপাশি নির্ধারিত মালবাহী ট্রেন চালানোর মতো পর্যাপ্ত লোকোমোটিভ নিশ্চিত করা।
এই সক্ষমতা ফিরে না আসা পর্যন্ত দেশের পণ্য পরিবহনে রেলের অংশ সেই সংকটেই আটকে থাকবে, যে সংকট রেলওয়েকে তার মালবাহী ব্যবসার পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগাতে দিচ্ছে না।









