২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে একাধিকবার হলের গেট ভেঙে আন্দোলনে অংশ নিতে দেখা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) নারী শিক্ষার্থীদের। তবে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পরও রয়ে গেছে সেই সংস্কৃতি। কোনও দাবি বাস্তবায়নে মধ্যরাতে গেট ভেঙে বের হয়ে এসে আন্দোলন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে হলে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে মধ্যরাতে বিক্ষোভ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এ সময় হলের গেট ভেঙে বের হয়ে এসে আন্দোলনে যোগ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরাও।
এ ঘটনায় আন্দোলনরত নারী শিক্ষার্থীরা সাধারণ শিক্ষার্থী দাবি করলেও ছাত্র সংগঠনগুলোর অভিযোগ এখানে নেতৃত্ব দিয়েছেন কোনও সংগঠনের নারী নেত্রীরা। অভিযোগ উঠেছে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের উসকে দিয়ে মধ্যরাতে রাস্তায় নামানো হয়েছে।
গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ ও ইসলামি ছাত্রী সংস্থা এই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের উসকে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক ছাত্র সংগঠনের নেতারা। ডাকসু নির্বাচনের সময় পেছানোর জন্য ছাত্রদল এবং গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ সমন্বয় করে এই আন্দোলন করেছে এমন অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের ঢাবি শাখার সদস্যসচিব মহির আলম বলেন, ‘আমাদের নারী নেত্রীরা আন্দোলনে ছিল, কারণ যেহেতু শিক্ষার্থীরা হলে ছাত্র রাজনীতি চায় না, আমরাও হলে ছাত্র রাজনীতির পক্ষে না। তবে আমাদের কেউ আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল না।’ যদিও ছেলেদের হলগুলোতে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের এই আন্দোলনে সামনের সারিতে দেখা গেছে।
অন্যান্য ছাত্র সংগঠন কী বলছে
নারী শিক্ষার্থীদের হলের গেট ভেঙে বের হয়ে আন্দোলন করা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাবি শাখার আহ্বায়ক আরমানুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি মেয়েদের নিজেদের প্রয়োজনে কোনও যৌক্তিক আন্দোলনে গেট ভেঙে বের হতে দেখি না। কিন্তু এ ধরনের একটা রাজনৈতিক আন্দোলনে তারা বারবার কেন গেট ভেঙে বের হচ্ছে, সেটা আমার কাছেও একটা প্রশ্ন।’
তিনি আরও বলেন, ‘৫ আগস্টের পর এই যে তালা ভেঙে বের হয়ে এসে আন্দোলন করা হচ্ছে, আমরা মনে করি এটা ব্যাপকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণার পর সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষুব্ধ ছিল এবং থাকাটা স্বাভাবিক, কারণ ছাত্র রাজনীতি সংস্কারের রূপরেখা আমরা প্রশাসনের কাছ থেকে আশা করেছিলাম। কিন্তু পাইনি। ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝে ছাত্রলীগের রাজনীতির সেই ট্রমা রয়ে গেছে। সে কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে বিক্ষোভ আসারই কথা ছিল। কিন্তু যেভাবে বিক্ষোভটা হলো সেটাকে আমার ফেব্রিকেটেড মনে হয়েছে। কারণ কমিটি দিয়েছে সকাল ১০টায়, কিন্তু মিছিল হয়েছে রাত ১০টার পর। ছেলেদের হলগুলোতে শিবিরের যে টিম আছে সেই টিমের সদস্যদের আমরা দেখেছি। মেয়েদের হলেও অনেকের নামে অভিযোগ এসেছে, যারা শিবিরের ফিল্টার এবং কার্যক্রমের পক্ষে প্রচারণা চালায়। তারা সারাদিন উসকানোর পর এমন একটা অবস্থা দাঁড়িয়েছে।’
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের (বাসদ) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘নারীদের রাজনীতি সচেতন হয়ে ওঠা আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক। তবে ইদানিং দেখা যাচ্ছে নারী শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে যাওয়ার পরে হলের তালা ভেঙে নিরাপত্তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বের হয়ে আসছে। এটা রাজনৈতিকভাবে স্বাভাবিক মনে হলেও এর মধ্যে গভীর কিছু কার্যক্রম চলে। আন্দোলনের সামনের সারিতে সাধারণ শিক্ষার্থী থাকলেও এর ভেতরে থাকে কিছু সংঘবদ্ধ চক্র। এটা হতে পারে কোনও সংস্থা, হতে পারে কোনও সংগঠন। তারা শিক্ষার্থীদের সামনে ঠেলে দিয়ে নিজেরা সব সময় পেছনে থাকে অথবা হলেই থাকে এবং পরবর্তী আন্দোলন কী হবে সেটা নির্ধারণ করে আর সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্রেন ওয়াশ করে আন্দোলনে পাঠায়।’
বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা অভিযোগ করে বলেন, ‘এটা আসলে পরিকল্পিত ছিল। ডাকসু পেছানোর জন্য ছাত্রদল ও বাগছাস মিলে এই আন্দোলন করেছে। ফলে এখানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ খুবই কম।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা পিক অ্যান্ড চুজ পদ্ধতিতে বিক্ষোভে নেমে আসছে— আমরা দেখতে পাচ্ছি এবং এর আগে আমরা দেখেছি, যখন টিএসসিতে জামায়াতে ইসলামীর একটি সমাবেশ থেকে নারীদের বিরুদ্ধে গালিগালাজ করা হলো— নারী কমিশনের যে প্রধান তার বিরুদ্ধে অশ্লীল কথাবার্তা বলা হলো, প্রকাশ্যে নারীকে হেনস্থা করা হলো— তখন কিন্তু এই ছাত্রীরা বের হয়নি। এবং কখন কীভাবে তারা বের হচ্ছে এবং কেন তারা বের হচ্ছে— এটিকে খুব সাদামাটাভাবে দেখলে আমার মনে হয়, ভুল বোঝা হবে। আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা সবসময় প্রতিবাদমুখর হোক। কিন্তু পিক অ্যান্ড চুজ একটি বিষয়কে যে তারা বাছাই করছে এবং তখন তারা রাস্তায় নামছে— আমার কাছে মনে হচ্ছে, এর পেছনে রাজনীতি আছে। আমরা চাই না, আমাদের ছাত্রীদেরকে ব্যবহার করে কেউ কোনও রাজনৈতিক ফায়দা লুটার চেষ্টা করুক।’