গত এক সপ্তাহে চট্টগ্রামে এক হাজার ৪৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে বলে জানিয়েছেন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। তিনি বলেছেন, স্বাভাবিকভাবে সারা বছরে বাংলাদেশে গড়ে প্রায় দুই হাজার ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। অথচ ৬ জুলাই থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত শুধু চট্টগ্রামেই হয়েছে বছরের মোট বৃষ্টিপাতের অর্ধেকের বেশি। এই অতিবৃষ্টির কারণেই চট্টগ্রাম বিভাগে জলাবদ্ধতা, বন্যা ও বাঁধের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বন্যার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তমন্ত্রণালয় সভা শেষে তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, একই সময়ে বান্দরবানে এক হাজার ১০২ মিলিমিটার এবং কক্সবাজারে ৮৪৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একটি বিভাগে অল্প সময়ে এত বেশি বৃষ্টির কারণেই জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, গত ১২ জুলাই পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালককে সঙ্গে নিয়ে তিনি চট্টগ্রামের বন্যা ও জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি সরেজমিন পরিদর্শন করেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা হয়েছে।
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ ৯৫ শতাংশ শেষ
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার পেছনে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কোনও চলমান প্রকল্পের প্রভাব রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হয়েছে বলে জানান ফরহাদ হোসেন আজাদ।
তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন একটি প্রকল্পের প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। পতেঙ্গা এলাকার এ প্রকল্পটি চলতি বছরের শেষ দিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হতে পারে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমার বিশ্বাস, প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে আগামীতে চট্টগ্রাম নগরে জলাবদ্ধতার সমস্যা আর থাকবে না।
কক্সবাজারে চার স্থানে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত
অতিবৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর একটি কক্সবাজার উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জেলার অন্তত চারটি স্থানে বাঁধ বা পোল্ডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব পোল্ডারের অনেকগুলো ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে নির্মাণ করা হয়েছিল।
মাতামুহুরী উপজেলার পুরাতনখালী পূর্বপাড়ায় বাঁধ উপচে পানি প্রবাহিত হওয়ায় ভাঙন তৈরি হয়েছে। স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বাঁধটি পুনর্নির্মাণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পূর্ব মেহেরনামা এলাকাতেও বাঁধ উপচে গিয়ে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি জানান, কয়েকটি এলাকায় বাঁধের ভেতরের পানি দ্রুত বের করে দেওয়ার জন্য স্থানীয় বাসিন্দারা বাঁধ কেটে দিয়েছেন। শীলখালী এলাকাতেও একই কারণে বাঁধ কাটা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সংশ্লিষ্ট এলাকার স্লুইসগেটগুলো পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কয়েকটি নদীর পানি এখনও বিপৎসীমার ওপরে
১৪ জুলাই সকাল ৬টার তথ্য তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী জানান, কুশিয়ারা নদীর পানি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ স্টেশনে বিপৎসীমার ২৬ সেন্টিমিটার এবং সুনামগঞ্জের মারকুলি স্টেশনে ছয় সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল
সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জের ছাতক স্টেশনে ছয় সেন্টিমিটার এবং সোমেশ্বরী নদীর পানি নেত্রকোনার কলমাকান্দা স্টেশনে ১৩ সেন্টিমিটার বিপৎসীমার ওপরে ছিল। তিস্তা নদীর ডালিয়া পয়েন্টেও পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল বলে জানান তিনি। তবে বক্তব্যে তিস্তার পানির উচ্চতার নির্দিষ্ট পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বৃষ্টিপাত কমে আসায় নদ-নদীর পানি প্রতিনিয়ত নামছে। আগামী এক থেকে দুই দিনের মধ্যে বিপৎসীমার ওপরে থাকা নদীগুলোর পানিও নিচে নেমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সাত লাখের বেশি জিওব্যাগ সরবরাহ
বন্যা ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সার্বক্ষণিকভাবে মাঠে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান ফরহাদ হোসেন আজাদ। ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় কাজ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিবছর বন্যার আগে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এবার সেই প্রস্তুতি আরও জোরদার করা হয়েছিল। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জরুরি কাজ বাস্তবায়নের জন্য প্রায় এক হাজার ৫০০ প্যাকেজ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০০ প্যাকেজের কাজ শেষ হয়েছে এবং আরও এক হাজার প্যাকেজের কাজ চলমান রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, জরুরি মেরামত ও নদীভাঙন মোকাবিলায় সাত লাখের বেশি জিওব্যাগ ইতোমধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে। আরও ছয় লাখ জিওব্যাগ মজুত রয়েছে। পাশাপাশি প্রায় এক লাখ প্লাস্টিক ও সিনথেটিক জিওব্যাগও সংরক্ষণে আছে।
তিনি বলেন, সামনে আবার বৃষ্টিপাত বাড়লে বা নতুন করে বন্যা দেখা দিলে নদীভাঙন থেকে জনপদ ও মানুষকে রক্ষায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রয়েছে।