সরকার পতনের দাবিতে চলমান আন্দোলনের মধ্যেই বিএনপি থেকে কয়েকজন নেতাকে বের করে আনার প্রক্রিয়া চলছে। নতুন এই প্রক্রিয়াটি বিএনপির কেন্দ্রীয় কিছু নেতার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এর নেতৃত্বে রাখা হয়েছে দলটির বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে (বীর বিক্রম)।
সোমবার (৬ নভেম্বর) আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের বক্তব্যের পর এ আলোচনা এখন প্রকাশ্যে।
সংশ্লিষ্ট ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, তথ্যমন্ত্রীর প্রকাশ্য বক্তব্যের পর হাফিজ উদ্দিন চাপে পড়ে যান। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম গঠনে হাফিজ উদ্দিনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সংস্থার মাধ্যমে সংঘটিত হওয়ায় এ তালিকা আরও বড় হতে পারে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন প্রভাবশালী সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সম্প্রতি দুই ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান ওমর ও আলতাফ হোসেন চৌধুরীর গ্রেফতারের বিষয়টিও নতুন দলের সঙ্গে যুক্ত বলে তারা জানতে পেরেছেন।’
বিএনএমের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র বলছে, বিএনপি নির্বাচনের বাইরে থাকছে, এমন সম্ভাবনাকে সামনে রেখে দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রার্থী নির্ধারণ করতে বিএনএমকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেই পরামর্শের ভিত্তিতেই হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে সামনে রেখে দল গোছানোর কার্যক্রম শুরু হওয়ার প্রাক্কালেই বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। সরকারের ওপর মহল থেকে বিষয়টি সামনে চলে আসায় হাফিজ উদ্দিন আহমেদের জন্য বিএনপির অন্যান্য নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগ অনেকটা কমে গেছে।
মঙ্গলবার (৭ নভেম্বর) দুপুরে এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ। পুরো পরিস্থিতি দেখতেছি। তারপর বলতে পারবো।’
হাফিজ উদ্দিন আহমেদের বিএনএম গোছানোর প্রক্রিয়ায় বিএনপির আরও কয়েকজনের নাম এসেছে। যারা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদে ছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম একজন ‘ভোকাল’কেও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার কথা। যদিও প্রশ্নের জবাবে নিজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছা জানিয়ে আলোচিত এই নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘না তো, আমার এমন জানা নাই।’
দলে মেজর (অব.) হাফিজের যোগদান প্রসঙ্গে বিএনএম-এর আহ্বায়ক ড. আবদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এইটা আমি ‘হ্যাঁ’ ‘না’ বলতে পারবো না। কিছু জিনিস আমানত থাকে।’’
বিএনপির সিনিয়র একাধিক নেতার ভাষ্য, ওয়ান-ইলেভেনের সময় হাফিজ উদ্দিন আহমেদ সংস্কারপন্থি নেতাদের সামনের দিকে ছিলেন। এরপরও খালেদা জিয়া তাকে দলে ফেরান। ১৯৯১ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর বিগত ২২ বছর ধরে দলের অন্যতম ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন হাফিজ। মাঝের কয়েক বছর স্থায়ী কমিটির পদ শূন্য হলে তিনি আগ্রহী হন। বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব আস্থায় নিতে না পারায় তাকে ‘ভাইস চেয়ারম্যান’ হিসেবেই থাকতে হয়।
দলীয় সূত্র জানায়, ৭৯ বছর বয়সী হাফিজ উদ্দিন আহমেদ দুই মাস আগে অসুস্থ হয়ে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালেও ভর্তি ছিলেন। একবার সিঙ্গাপুরে যান চিকিৎসার কাজে।
একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন ‘জেড’ ফোর্সে ছিলেন তিনি। যুদ্ধে সাহসিকতার জন্যে তিনি বীর বিক্রম খেতাব পান। সামরিক বাহিনী থেকে অবসরের পর তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হন। হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ভোলা-৩ (লালমোহন-তজুমদ্দিন) থেকে ৬ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
২০০১ সালে খালেদা জিয়া সরকার গঠন করলে তিনি পানিসম্পদমন্ত্রী হন। দীর্ঘ ২২ বছর ধরে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন তিনি। সরকারের দমন-নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে কারাগারে যান এই রাজনীতিক।
মেজর অব. হাফিজ উদ্দিন ফুটবলেও ব্যাপক পরিচিতি একটি নাম।
২০২০ সাল থেকে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব ও কৌশল নিয়ে ব্যতিক্রমী অবস্থান নেন হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। প্রকাশ্যে তিনি দলের পলিসির বাইরে গিয়ে জনসমাগম করেন। ২০২০ সালের ১৪ ডিসেম্বর দুপুর আড়াইটার দিকে রাজধানীর পুরানা পল্টন-গুলিস্তান এলাকায় বিএনপির শতাধিক নেতাকর্মীকে নিয়ে শেখ হাসিনার পদত্যাগ চেয়ে বিক্ষোভে শওকত মাহমুদ, সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের সঙ্গে তিনিও অংশগ্রহণ করেন।
ওই কর্মসূচির পর ১৫ ডিসেম্বর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদের সই করা বিবৃতিতে ‘হাফিজের বিরুদ্ধে দলের নেতৃত্ব নিয়ে প্রকাশ্যে বিরোধিতার’ অভিযোগ আনা হয় এবং শোকজ করা হয়। চার দিন পর ১৯ ডিসেম্বর নোটিশ প্রসঙ্গে মেজর অব. হাফিজ বলেন, ‘আমি একজন যুদ্ধাহত, খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। বিজয়ের মাসে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে অসৌজন্যমূলক ভাষায় অসত্য অভিযোগ ও কারণ দর্শানোর নোটিশ পেয়ে হতবাক হয়েছি।’
এই ঘটনার পর হাফিজ উদ্দিন দলে নিয়মিত হন এবং সভা-সমাবেশে বক্তব্য দেন। বক্তব্যে সরকার পতনের জন্য ‘রাজপথই একমাত্র সমাধান’ উল্লেখপূর্বক বক্তব্য দেন।
২০২১ সালে একটি অনুষ্ঠানে তিনি আফগানিস্তানের ঘটনাটিকে সামনে রেখে—‘এটা থেকে শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করতে এবং অনেককে কিন্তু হেলিকপ্টারের ডানা ধরে ঝুলতে হবে’ বলেও মন্তব্য করেন।
বিএনপির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র দাবি করেছে, মেজর অব. হাফিজ দলের গ্রহণযোগ্য নেতাদের মধ্যে ঐকমত্য সৃষ্টি করে পলিসিগত চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করছেন। আর এই প্রক্রিয়ার পেছনেও শক্তিশালী একটি পক্ষ রয়েছে।
সোমবার তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্য সামনে চলে আসায় বিষয়টি এখন চাপের মুখে পড়েছে বলেও মনে করা হচ্ছে মেজর অব. হাফিজের ঘনিষ্ঠ সূত্রে। বলা হচ্ছে, সরকারের পক্ষ থেকে বক্তব্য চলে আসায় বিএনপির নেতারা কেউই সহজে হাফিজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইবেন না।
একইসঙ্গে মেজর অব. হাফিজের নির্বাচনি এলাকা ভোলায় (লালমোহন-তজুমদ্দিন) বিএনপির নেতাকর্মীদের গ্রেফতার-আটক চলমান থাকায় দল গোছানোর প্রক্রিয়াটি সমস্যার সম্মুখীন বলে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জানানো হয়েছে। এই সমস্যাটি অবিলম্বে সমাধানের কথা বলা হয়েছে বিএনএমের তরফে।
সূত্র জানায়, ওপর মহল থেকে অন্তত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিএনএম-এর নতুন কমিটি গঠনের ওপর জোর দেওয়া হয়। দৃশ্যমান সমস্যার কারণে এখন তা বিলম্ব হতে পারে, এমন ইঙ্গিতও রয়েছে মেজর অব. হাফিজের পক্ষ থেকে।
এ বিষয়ে কথা বলতে লালমোহন ও তজমুদ্দিন এলাকার বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতাকে ফোন করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।
বিএনপির একজন দায়িত্বশীল মনে করছেন, ব্যক্তিত্ববোধের কারণে হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এই অবস্থার মধ্যে পড়েছেন। তিনি নিজে ভোটে অংশগ্রহণ করতে রাজি। দলের সর্বশেষ কর্মসূচিতে তাকে দেখা না গেলেও তিনি নির্বাচনের পক্ষে অনড়।
মঙ্গলবার (৭ নভেম্বর) কয়েকজন সাংবাদিকের কাছে তিনি মন্তব্য করেন, ‘বিএনপির ভোটে অংশ নেওয়া উচিত। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে আমি এই দল থেকেই নির্বাচন করবো।’
জানতে চাইলে বিএনএম আহ্বায়ক ড. আবদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের নির্বাচনি প্রার্থী তালিকা এগিয়ে চলেছে। কেবল বিএনপিই নয়, জাতীয় পর্যায়ের পরিচিত ব্যক্তি, সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক মন্ত্রী অনেকে আছেন। তবে শিডিউল না হলে কিছুই বুঝা যাবে না। সবাই অপেক্ষা করছে নির্বাচনি শিডিউলের। তারপর বলা যাবে চূড়ান্তভাবে কারা প্রার্থী হবেন।’
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল মাহমুদ টুকু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর থেকে দলটিকে ভাঙার চেষ্টা চলছে। কিন্তু বিএনপি বরাবরই ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠেছে, ক্ষমতায়ও গেছে। সাময়িক সুবিধা দেখে কেউ দল ত্যাগ করলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তারাই। মীর জাফর হিসেবে চিহ্নিত থাকবে।’
‘প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হয়নি’
বিভিন্ন গণমাধ্যমে নতুন দলে যোগদান নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন মেজর অব. হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। মঙ্গলবার (৭ নভেম্বর) দুপুর পৌনে তিনটার দিকে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘না না, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কোনও সাক্ষাৎ হয়নি।’
‘মেলানো হচ্ছে মার্কিন আগন্তুক পাঠানোর যোগসূত্র’
শনিবার (২৮ অক্টোবর) বিএনপির মহাসমাবেশে সংঘর্ষের পর দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা পরিচয়ে একজন বিদেশি নাগরিকের সংবাদ সম্মেলন করার পেছনে মেজর অব. হাফিজের যোগসূত্রতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ওইদিন সন্ধ্যা সাতটার দিকে নয়া পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘বিদেশি ওই আগন্তুক মিয়ান আরেফি’ সংবাদ সম্মেলন করেন। এ সময় তার সঙ্গে সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনসহ আরও অনেকে ছিলেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য এ প্রতিবেদককে বলেন, দলের সম্মতির বাইরে একজন বিদেশি নাগরিককে কার্যালয়ে নেওয়ার পেছনে ‘ষড়যন্ত্র’ ছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ওই সংবাদ সম্মেলনের পরই দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল বিষয়টিকে ‘এই বিষয়ে বিএনপি একেবারেই অবগত নয় এবং ওই ব্যক্তির বিষয়ে দূতাবাস থেকে কোনও রকম পূর্ব ধারণা মহাসচিবকে দেওয়া হয়নি’ বলে উল্লেখ করেন।
স্থায়ী কমিটির এই সদস্য মনে করছেন, ‘বিএনপিকে স্যাবোটাজ করার চক্রান্ত থেকেই পূর্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মিয়ান আরেফিকে নিয়ে যান চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী। তার সঙ্গে মেজর হাফিজের যোগাযোগ হয়ে থাকতে পারে। দলের উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের ইশারা ছাড়া এটি অসম্ভব ছিল।’ প্রসঙ্গত, ওই ঘটনায় মার্কিন দূতাবাসের পক্ষ থেকে তথ্যটি ‘মিথ্যা এবং ভুল’ এবং বিষয়টিকে ‘রিউমার’ উল্লেখ করে খবরের সূত্র সম্পর্কে আরও সতর্ক থাকার অনুরোধ জানানো হয়।
পরে ওই ঘটনার রেশ ধরে বিএনপির তরুণ নেতা ইশরাক হোসেনকেও সিনিয়র নেতারা ‘বকা’ দেন।
আরও পড়ুন:
নতুন দলগুলোর টার্গেটে বিএনপির পদবঞ্চিতরা, সাড়া মিলছে কেমন?
শৃঙ্খলা ভাঙায় হাফিজ উদ্দিন ও শওকত মাহমুদকে শো’কজ: রিজভী
যেকোনও শাস্তি পেতে রাজি আছি: হাফিজ
অনেককে হেলিকপ্টারের ডানা ধরে ঝুলতে হবে: হাফিজ