দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থী বাছাই, এলাকা নির্ধারণসহ আনুষঙ্গিক কাজ শুরু করেছে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামী ছেড়ে আসা নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। প্রাথমিকভাবে জোটগতভাবে নির্বাচন করলে ৩০টি ও এককভাবে নির্বাচন করলে ১৫০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা।
এবি পার্টির জ্যেষ্ঠ একাধিক নেতা জানান, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এবি পার্টি সর্বাত্মক প্রস্তুতি শুরু করেছে বেশ আগে থেকে। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিবন্ধনের জন্য প্রাথমিক তালিকায় এক নম্বরে জায়গা পেয়েছে দলটি। নিবন্ধনের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে সারা দেশে ১৫০টি এলাকায় দলীয় কার্যালয় স্থাপন করেছে এবি পার্টি।
দলের সদস্য মজিবুর রহমান মনজু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা ৪৮টি জেলা কমিটি, ১৫০টি উপজেলা কমিটি গঠন করেছি। সব জেলাসহ উপজেলা পর্যায়ে অফিস স্থাপনের মধ্য দিয়ে আমরা দলীয় কার্যক্রম শুরু করেছি।’
দলের নেতারা জানান, এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিলেও এবি পার্টির বেশির ভাগ আসন হবে রংপুর, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ এলাকায়। জোটগতভাবে নির্বাচন করলে কক্সবাজার, লালমনিরহাট, পটুয়াখালী, রংপুর, কুমিল্লা, ফেনী, গাইবান্ধা, শেরপুর, জামালপুর জেলায় আসন বেশি চাওয়া হবে বলে দলীয় সূত্র জানায়।
২০২০ সালের ২ মে আত্মপ্রকাশের পর থেকে নানাভাবে আলোচনায় রয়েছে এবি পার্টি। দলটির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত প্রায় সবাই জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় মাঝেমধ্যে উভয় পক্ষের মধ্যে বিরোধিতা সামনে আসে। পাশাপাশি ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কয়েক মাস ধরে বৈঠক করে আলোচনা ধরে রাখতে চেয়েছেন এবি পার্টির নেতারা।
বিএনপির নেতৃত্ব সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো সরকারবিরোধী আন্দোলনে যুগপৎ ভূমিকা রাখলেও, যে কয়টি দল পৃথকভাবে সরকারবিরোধী অবস্থান তৈরি করেছে, তাদের মধ্যে এবি পার্টি উল্লেখযোগ্য।
বিএনপির সঙ্গে বনিবনা না হওয়ার পেছনে জামায়াতের ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন এবি পার্টির নীতিনির্ধারকরা। তাদের এক গুরুত্বপূর্ণ নেতার ভাষ্য, জামায়াত চায়নি বলে বিএনপি অন্যান্য বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করলেও এবি পার্টির সঙ্গে করেনি। তিনি উল্লেখ করেন, জামায়াত যেন না চটে যায়, সে কারণেই বিএনপি দূরত্ব বজায় রেখেছে।
তবে নির্বাচন সামনে রেখে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণঅধিকার পরিষদসহ আরও কয়েকটি দলের সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন জোট গঠনে এবি পার্টি থাকতে পারে, এমন আলোচনা রয়েছে।
মজিবুর রহমান মনজু বলেন, ‘আমরা নিবন্ধন চেয়েছি তো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য। নির্বাচন একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে হওয়া বাঞ্ছনীয়। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন ফেয়ার হয় না।’
এবি পার্টি গঠনের সূত্রপাত
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক বিরোধিতাকারী দল হিসেবে ১৯৭১ সালের ভূমিকা ব্যাখ্যা করার জন্য জামায়াতের মধ্যে আশির দশকের শুরু থেকেই চাপ সৃষ্টি হয়। দলের অভ্যন্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত কামারুজ্জামানও এ বিষয়টিকে সামনে রেখে দলের ফোরামের উদ্দেশে চিঠি লিখেছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় জামায়াতের ভেতরে সংস্কারপন্থীদের অবস্থান তৈরি হতে থাকে।
একাত্তর প্রশ্নে দলের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে জামায়াতের পক্ষ থেকে একটি কমিটিও করা হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত ওই কমিটি কোনও কার্যক্রম করতে পারেনি, এমন অভিযোগ এনে ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দল থেকে পদত্যাগ করেন তৎকালীন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং দল বিলুপ্তির পরামর্শ দিয়ে পদত্যাগ করেন তিনি। প্রায় একই দিন জামায়াত থেকে ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি, জামায়াতের ঢাকা মহানগর মজলিসে শুরার সদস্য মজিবুর রহমান মঞ্জুকে বহিষ্কার করা হয়। ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি ফেসবুক স্ট্যাটাসে এ কথাটি প্রকাশ্যে আনেন।
২০১৯ সালের ২৭ এপ্রিল মজিবুর রহমান মনজুসহ আরও কয়েকজন মিলে ‘জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ’ নামে এর রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করেন। এই উদ্যোগ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে মনজু বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে প্রতিশ্রুত বাংলাদেশ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে জাতীয় জীবনের সব অর্জন ও ঐক্যের জায়গাগুলো সমন্বিত করে নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি প্রস্তুত করা প্রয়োজন। প্রচলিত কোনও রাজনৈতিক ধারা বা দলের অনুসারী কিংবা অনুরক্ত নয়, এটা সম্পূর্ণ স্বাধীন উদ্যোগের একটি স্বতন্ত্র ধারা। জামায়াতে ইসলামীসহ বিদ্যমান কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নেই। রাজনৈতিক দল হবে সত্যিকার অর্থে ইনক্লুসিভ এবং একটি ইতিবাচক বাংলাদেশ গড়ার নতুন রাজনৈতিক কার্যক্রম এটি।’
‘জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ’ প্রক্রিয়াটি এক বছর সারা দেশে জনসংযোগ ও নানা যাচাই-বাছাই শেষে রাজধানীর বিজয় নগরে নিজস্ব কার্যালয়ে ‘আমার বাংলাদেশ পার্টি’ (এবি পার্টি) নামে নতুন দল গঠন করে। সাবেক সচিব এ এফ এম সোলায়মান চৌধুরীকে আহ্বায়ক ও মজিবুর রহমান মনজুকে সদস্য সচিব করে এই দল গঠন করা হয়। নতুন কমিটিতে মেজর (অব.) ডা. আবদুল ওহাব মিনার ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তাজুল ইসলামসহ সাত জনকে যুগ্ম আহ্বায়ক, ৯ জনকে সহকারী সদস্য সচিব করে ২২২ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয় সেদিন।
দলের যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মেজর (অব.) আব্দুল ওহাব মিনার জানান, এবি পার্টির লক্ষ্য ধর্ম, বর্ণ, জাতিনির্বিশেষে বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষের মৌলিক ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে উন্নীত করা।
এবি পার্টির সাত দফা কর্মসূচি আছে। সেগুলো হলো ১. জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা, ২. গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, ৩. প্রেরণা সৃষ্টি, ৪. উন্নয়ন ও গবেষণা, ৫. নেতৃত্ব তৈরি, ৬. সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার, ৭. কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
নতুন কমিটি হবে নির্বাচনের মাধ্যমে, ব্যারিস্টার রাজ্জাকের প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস
নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন কার্যক্রম অব্যাহত থাকায় আহ্বায়ক কমিটি থেকে পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে যেতে পারে এবি পার্টি। দলের নির্ভরযোগ্য একাধিক নেতা জানান, চলতি জুনে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার জন্য কাউন্সিল করার চিন্তা থাকলেও তা এখনই হচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে আগামী আগস্ট-সেপ্টেম্বর নাগাদ দলের সম্মেলন করার চিন্তা রয়েছে।
দলের নীতিনির্ধারকদের একজন দাবি করেন, বর্তমানে দলের প্রধান উপদেষ্টা ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক দলের প্রধান অর্থাৎ চেয়ারম্যান পদে প্রার্থিতা করতে পারেন। এ ছাড়া মহাসচিব হিসেবে মুজিবুর রহমান মঞ্জুও প্রার্থী হতে পারেন।
দলের এক নেতা বলেন, ‘আহ্বায়ক হিসেবে সোলায়মান চৌধুরী থাকলেও দলে কার্যত ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক প্রধান হিসেবেই কাজ করছেন।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এবি পার্টির সদস্য সচিব মজিবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন হবে সম্মেলনের মাধ্যমে, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে।’
আরও পড়ুন:
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতি দীর্ঘমেয়াদে পরিবর্তন আনবে: এবি পার্টি
নতুন রাজনৈতিক দল ‘আমার বাংলাদেশ পার্টি’র আত্মপ্রকাশ
জামায়াতের সঙ্গে এবি পার্টির দ্বন্দ্ব এবার প্রকাশ্যে
শিবিরের সাবেক সভাপতি মন্জুর নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের আত্মপ্রকাশ
শিবিরের সাবেক সভাপতি মঞ্জু জামায়াত থেকে বহিষ্কার
জামায়াতকে ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দিয়ে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের পদত্যাগ
একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইতে বিশেষ কমিটি করেছিল জামায়াত