জেলা দল নির্বাচনে ঘুষের অভিযোগ

অভিযুক্ত কোচের অধীনেই থাকবে ওই ক্রিকেটার, বলেছে বিসিবি

বাগেরহাটের কোচ আবু তাহেরের বিরুদ্ধে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ করেছে স্থানীয় এক কিশোর ক্রিকেটার। তার দাবি, ৩০ হাজার টাকা ঘুষ না দেওয়ায় অনুশীলনে ভালো করা সত্ত্বেও অনূর্ধ্ব-১৬ বাগেরহাট জেলা দলের তিনটি ম্যাচে খেলার সুযোগ দেওয়া হয়নি তাকে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করার উদ্যোগ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় সঠিক তদন্তের স্বার্থে আজ (শনিবার) দুপুরে বিসিবি দুই পক্ষের সঙ্গেই কথা বলেছে। শুনানি শেষ হলেও বাংলাদেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা জানিয়েছে, ‘অধিকতর তদন্তের স্বার্থে’ বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখা হবে।

গত ৩ ফেব্রুয়ারি বাংলা ট্রিবিউনে ‘জেলা দল নির্বাচনে ঘুষের অভিযোগ, তদন্ত করবে বিসিবি’ শিরোনামে প্রকাশিত খবরের পরদিনই বিসিবি থেকে ফোন দিয়ে অভিযুক্ত কোচ ও ভুক্তভোগী ক্রিকেটারকে শনিবার দুপুরে বিসিবি কার্যালয়ে আসার কথা জানানো হয়। সেই অনুযায়ী দুজনই আসেন মিরপুরে অবস্থিত বিসিবি কার্যালয়ে। প্রায় দুই ঘণ্টা অভিযুক্ত কোচ আবু তাহের ও ভুক্তভোগী কিশোর বক্তব্য পেশ করে। ওই সময় ছিলেন বয়সভিত্তিক গ্রুপ টুর্নামেন্ট কমিটি চেয়ারম্যান ওবেদ নিজাম ও বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরী।

দুই পক্ষের কথা শুনলেও বিসিবি এখনই কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি। অভিযোগ কতটা সত্য, সেটি যাচাই-বাছাই করতে আরও তদন্ত করবে বোর্ড। তবে অভিযোগকারী কিশোর ক্রিকেটারকে বাগেরহাটের হয়ে মনোযোগ দিয়ে ক্রিকেট খেলার কথা বলেছে তারা। শুধু তা-ই নয়, বিসিবির মনোনীত বাগেরহাটের কোচের তত্ত্বাবধানেই অনুশীলন চালিয়ে যেতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ, যার বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর, সেই তাহেরকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ওই কিশোরের ক্রিকেট চর্চার চালিয়ে নেওয়ার।

বিষয়টি নিয়ে বয়সভিত্তিক গ্রুপের টুর্নামেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান ওবেদ নিজাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘এমন অভিযোগ তো আমাদের আসতেই থাকে। আমরা এই ইস্যুটা নিয়ে কাজ করছি। আরও সময় লাগবে। এটা নিয়ে আগেভাগে আমরা কিছু বলতে পারছি না। তবে এতটুকু বলতে পারি এটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখবো।’

প্রতিনিয়তই এমন অভিযোগ এলেও এবার লিখিতভাবে আসায় গুরুত্বসহকারে দেখছে বিসিবি। নিজাম বলেছেন, ‘আমাদের শোনা কথা ছিল। এভাবে কখনও আসেনি। লিখিতভাবে এবারই প্রথমবার। এজন্য এটা আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। আমাদের সভাপতি বলেছেন এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে থাকবো। এটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা আজকে শুরু করলাম। আমাদের সুযোগ দিতে হবে। আমরা যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেবো। মাত্র হেয়ারিং হয়েছে, আরও ভালো করে তদন্ত করে বিষয়টি দেখবো। অভিযোগ প্রমাণ হলে শাস্তি তো অবশ্যই পাবেন অভিযুক্ত কোচ।’

শুনানিতে কী আলোচনা হয়েছে, এর ধারণাও দিলেন বিসিবির এই পরিচালক, ‘এমন কোনও পরিস্থিতি হয়নি। দুজন দুজনের কথা বলেছেন। উনি (তাহের) নির্বাচনের কথা বলেছেন, যুক্তি দেখিয়েছেন কেন তিনি তাকে নির্বাচিত করেননি। এখানে অনেক ব্যাপার আছে। এগুলো নিয়ে সবার সঙ্গে আলাপ না করে বলা সম্ভব নয়। মাত্র তো তদন্ত শুরু হলো। আপাতত যে যার মতো কাজ শুরু করুক, সেভাবেই আমরা বলে দিয়েছি।’

আরও পড়ুন: জেলা দল নির্বাচনে ঘুষের অভিযোগ, তদন্ত করবে বিসিবি

এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী কিশোর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘বিসিবি মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনেছে। তারা আমাকে বলেছে ওই কোচের অধীনেই অনুশীলন চালিয়ে যেতে। আমাদের সব সুবিধা-অসুবিধাগুলো তাকে (তাহের) দেখতে বলেছে। কিন্তু আমি শঙ্কাতে আছি, তার সঙ্গে থেকে কীভাবে অনুশীলন করবো। তার বিরুদ্ধে আমি অভিযোগ করেছি, এখন তার সঙ্গে থেকে ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়াটা আমার জন্য কঠিনই হবে। যদি আলাদা কোনও ব্যবস্থা করা যেত, তাহলে অনেক সুবিধা হতো।’

শুনানিতে ওই কিশোর প্রমাণ হিসেবে একটি অডিও ক্লিপ জমা দিয়েছিল। ছয় মিনিটের অডিওতে শোনা গেছে, অন্যপ্রান্তের কেউ একজন ভুক্তোভোগী কিশোরকে বোঝানোর চেষ্টা করছে, টাকা চাওয়ার বিষয়টি মজা হিসেবে নেওয়ার জন্য।

এদিকে শুনানিতে অংশ নিতে ঢাকায় আসার পথে আক্রমণের শিকার হয়েছে অভিযোগ করা ক্রিকেটার। তার ধারণা, বাগেরহাটের কোচ তাহেরের লোকজনই আক্রমণ করেছে, ‘হ্যাঁ, বাধা দেওয়া হয়েছিল। যখন গাড়িতে উঠেছি, তখন আমার ওপর আক্রমণ করা হয়। আমি ক্লিয়ারলি বলতে পারছি না তার (তাহের) লোক কিনা। কিন্তু বাগেরহাটের বেশ কয়েকজনের নাম বলেছে। মানে উনার লোক এমনটা বলেছে...। আমার সন্দেহ হচ্ছে যে হতে পারে তার লোক।’

শনিবার শুনানি শেষে তাহেরের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। মিরপুরেও সংবাদমাধ্যমকে এড়িয়ে গেছেন বাগেরহাটের এই কোচ। তবে বাংলা ট্রিবিউনের কাছে আগেই অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন তাহের, ‘আমি যে বিষয় জানি না এবং যে কাজটা করিনি সেটা নিয়ে কী বলবো? এই ছেলের সঙ্গে আমার কোনও ধরনের কথাই হয়নি। যার কোনও প্রমাণ কিংবা ভিত্তি নেই, আপনারা সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন! যে ছেলে এই অভিযোগ করেছে, সে তো বাগেরহাটে খেলেইনি।’

জেলা ক্রিকেটে দুর্নীতির অভিযোগটি ভীষণ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। বিসিবিও এটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। বোর্ড কর্তাদের ভাষ্য, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ওই কোচকে আজীবন নিষিদ্ধ করা হবে। গেম ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ সুজন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘কিছু প্রমাণ হলে শাস্তি তো অবশ্যই পেতে হবে। তার কোচিং ক্যারিয়ারই থাকবে না। শাস্তি তাকে পেতেই হবে। টাকার বিনিময়ে দলে জায়গা করে দেওয়ার কথা বললে সেই দায় তো কোনও কোচ এড়াতে পারবে না। অবশ্যই আমরা এ অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করবো।’

প্রসঙ্গত, চলতি মাসে অনূর্ধ্ব-১৬ বিভাগীয় পর্যায়ের দল চূড়ান্ত হবে। এর অংশ হিসেবে আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি নড়াইলে তিনটি ম্যাচ খেলতে যাবে বাগেরহাটের সেরা ১৫ ক্রিকেটার। এগুলোতে ভালো পারফরম্যান্স দেখানো ক্রিকেটাররা খুলনা বিভাগীয় পর্যায়ের ক্যাম্পে সুযোগ পাবে। তাদের মধ্য থেকে ১৫ জন চূড়ান্তভাবে জায়গা করে নেবে খুলনা বিভাগীয় দলে। এর আগে বাগেরহাটে বাছাই করা ৩৫ ক্রিকেটারকে নিয়ে দুটি ম্যাচ আয়োজন করা হয়। সেখানে একটি অর্ধশতসহ ৫৭ রান করেও ১৫ জনের ক্যাম্প থেকে বাদ পড়েছে ওই কিশোর। তার অভিযোগ, ঘুষ না দেওয়ায় সে জায়গা পায়নি।

আরও পড়ুন: বিসিবির ডাকে ঢাকায় দুর্নীতির অভিযোগ করা ক্রিকেটার