নারীদের স্বপ্ন দেখানো দেশসেরা কিশোরীই বাল্যবিয়ের শিকার!

শিরোপা জেতা হয়নি তার দলের। তবে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে কিশোরী মেয়েটি ছড়িয়েছিল মুগ্ধতা। হয়েছিল সেবারের বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ ফুটবলের সেরা খেলোয়াড়। দুই বছরের ব্যবধানে সেই স্বরলিকা পারভীনের জীবন ৩৬০ ডিগ্রিতে ঘুরে যাবে, ভাবা যায়নি। অপার সম্ভাবনা নিয়ে খুদে নারী ফুটবলারদের আসরে আলো ছড়ানো মেয়েটির জীবন ঢাকা পড়লো অন্ধকারে। বাধার দেয়াল ঠেলে এগিয়ে চলার প্রত্যয়ে নারীদের আশার আলো দেখানো স্বরলিকাই কিনা বাল্যবিয়ের শিকার!

স্বর‌লিকার বাবা নি‌জেই বি‌য়ের বিষয়‌টি নি‌শ্চিত ক‌রে‌ছেন। গত ৫ মার্চ কু‌ড়িগ্রা‌মের সীমান্তবর্তী উপ‌জেলা ভূরুঙ্গামারীর শিলকু‌ড়ি ইউনিয়নের কামরুল ইসলা‌মের সঙ্গে বি‌য়ে হয়েছে ২০১৭ সালের (২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত) বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবলের সেরা ফুটবলারের। বর পেশায় মোটর মেকা‌নিক।

২০১৮ সাল। ইউনিয়ন ও উপ‌জেলার পর জেলার বাধা টপকে বিভাগীয় পর্যা‌য়ে চ‌্যা‌ম্পিয়ন হ‌য়ে জাতীয় পর্যায়ে খেলতে যায় ভূরুঙ্গামারীর প্রত‌্যন্ত এলাকা বাঁশজানি গ্রা‌মের বাঁশজা‌নি সরকা‌রি প্রাথ‌মিক বিদ‌্যাল‌য়ের ফুটবল দল। বঙ্গমাতা গোল্ডকাপের কোয়ার্টার ফাইনা‌লে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল রাজশাহীর গোদাগাড়ী সোনাদীঘি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বাঁশজানির ৩-১ গো‌লে জেতার পথে হ্যাটট্রিক পেয়েছিল অধিনায়ক স্বরলিকা। সে‌মিফাইনা‌লে হে‌রে গি‌য়ে স্থান নির্ধারণী ম‌্যা‌চে প্রতিপক্ষ চট্টগ্রামের বাঁশখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ৪-১ গোলে হারি‌য়ে তৃতীয় হওয়ার পথেও হ্যাটট্রিক করেছিল এই কিশোরী।

দল চ্যাম্পিয়ন না হলেও ভূরুঙ্গামারীর সদ‌্য বিলুপ্ত ছিটমহ‌ল থে‌কে বাংলা‌দে‌শে একীভূত হওয়া বাঁশজানি গ্রা‌মের স্বরলিকা জিতেছিলেন টুর্না‌মেন্ট সেরার পুরস্কার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হা‌সিনার কাছ থেকে সেরার পুরস্কার পাওয়া সেই কিশোরী আবার আলোচনায়। ফুটবলকে আঁকড়ে ধরে স্বপ্নের সিঁড়ি তৈরি করা স্বরলিকার ফুটবলে থাকা তো দূরে থাক, কুঁড়িতেই ঝরে পড়লো বাল্যবিয়ের কালো ছোবলে।

‘গত তিনটা বছর কেউ আমার মেয়ের খোঁজ নেয়নি। আমি অনেকের কাছে গিয়েছি যা‌তে আমার মে‌য়েটা ভা‌লো জায়গায় খেল‌তে পা‌রে। কিন্তু কেউ এগিয়ে আ‌সেনি। আমি গরিব মানুষ, মে‌য়ের ভ‌বিষ‌্যতের কথা চিন্তা ক‌রেই বিয়ে দিয়েছি।’- নিজের অক্ষমতা তুলে ধরে ‘দোষ’ আড়াল করার চেষ্টাই হয়তো করলেন স্বরলিকার বাবা সহিদুল ইসলাম।

ক‌রোনাভাইরাসের থাবায় বন্ধ হ‌য়ে‌ছে বিদ‌্যালয়, স্থ‌বির হ‌য়ে‌ছে খেলা। আর এরইম‌ধ্যে স্বর‌লিকা বাল্যবিয়ের শিকার হ‌য়ে খেলার মাঠ থে‌কে সংসার জীব‌নের ‘মা‌ঠে’ প্রবেশ ক‌রে‌ছে। মেয়ের বিয়ে দি‌লেও বয়স কম (১৬ বছর) থাকায় নিবন্ধন (‌রে‌জি‌স্ট্রি) করা‌তে পা‌রেন‌নি। শুধুমাত্র গ্রামীণ ও ধর্মীয় রী‌তি‌তে বি‌য়ে দি‌য়ে‌ছেন বলে জানিয়েছেন স্বরলিকার বাবা।

বাঁশজানি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দলের অধিনায়ক ছিল স্বরলিকাপরিস্থিতি আরও ভয়ংকর শোনায়, যখন জানা যায় শুধু স্বর‌লিকা নয়, বাঁশজানি স্কুলের ওই ফুটবল দল‌টির আরও পাঁচ সদ‌স্যের বি‌য়ে হয়েছে, যারা সবাই নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী! অর্থাৎ ১২ সদ‌স্যের কি‌শোরী দ‌লের ছয় জনই বাল‌্যবি‌য়ের শিকার!

বাঁশজানি সরকা‌রি প্রাথ‌মিক বিদ‌্যাল‌য়ের সে সম‌য়ের ফুটবল প্রশিক্ষক আতিকুর রহমান খোকন ব‌লেছেন, ‘স্বরলিকার বি‌য়ে হ‌য়ে‌ছে চল‌তি মা‌সে। কিন্তু তারও আগে এই দ‌লের আরও পাঁচ কি‌শোরী বাল‌্যবি‌য়ের শিকার হ‌য়ে সংসার জীব‌নে প্রবেশ ক‌রে‌ছে। ওদের কারও মু‌খের দি‌কে তাকা‌নো যায় না। কতগু‌লো সম্ভাবনা একবারেই শেষ।’

এই কি‌শোরীরা বর্তমা‌নে স্থানীয় এক‌টি মাধ‌্যমিক বিদ‌্যাল‌য়ের শিক্ষার্থী। ওই বিদ‌্যাল‌য়ের প্রধান শিক্ষক কায়ছার আলী জানিয়েছেন, করোনার সময় স্কুল বন্ধ থাকায় তেমন খোঁজ নেওয়া সম্ভব হয়নি। ত‌বে দল‌টির কয়েক সদ‌স্যের বি‌য়ের বিষয়‌টি তি‌নি অবগত, ‘মে‌য়েগু‌লো খেলার সু‌যোগ পে‌লে অনেক ভা‌লো কর‌তো। কিন্তু স্কুল বন্ধ থাকায় তা‌দের বি‌য়ের খবর সময় মতো জান‌তে পা‌রি‌নি। ফ‌লে আমাদের কিছু করার ছিল না।’ ত‌বে এক‌টি দা‌য়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় জনপ্রতি‌নি‌ধি‌রা অবগত থাক‌লেও তা‌দের মৌন সমর্থনের কার‌ণে বাল্যবি‌য়ে বন্ধ করা সম্ভব হ‌চ্ছে না।

স্বর‌লিকার বি‌য়ের খব‌রে সামা‌জিক যোগা‌যোগমাধ‌্যমে ক্ষোভ আর হতাশা ঝরছে। অনেকেই স্বর‌লিকার ঝরে পড়া‌কে মো‌টেও স্বাভা‌বিকভা‌বে দেখ‌ছেন না। রায়হান ক‌বির র‌নো নামের একজন স্বর‌লিকার ছ‌বি পোস্ট করে লি‌খে‌ছেন, ‘অনেক হা‌সিমুখ ও একজন দেশ‌সেরা ফুটবলার স্বর‌লিকার বাল‌্যবি‌য়ে!’ স্বর‌লিকার সাফল‌্য ও প্রধানমন্ত্রীর কাছ থে‌কে পুরস্কার নেওয়ার স্মৃ‌তি রোমন্থন ক‌রে র‌নোর হতাশা, ‘‌সেই মে‌য়ে‌টি‌কে হতে হ‌লো বাল‌্যবি‌য়ের শিকার!’

কি‌শোরী ফুটবলারের বাল্যবি‌য়ের বিষ‌য়ে জান‌তে চাই‌লে ভূরুঙ্গামারী উপ‌জেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপক কুমার দেব শর্মা ব‌লেছেন, ‘আমি বিষয়গু‌লো অবগত নই। কেউ আমা‌কে জানায়নি। স‌ঠিক সম‌য়ে খবর পে‌লে আমরা অবশ‌্যই এসব বাল‌্যবি‌য়ে প্রতি‌রোধ কর‌তে পারতাম।’

বেসরকা‌রি সংস্থা প্লান ইন্টারন‌্যাশনালের সর্বশেষ তথ‌্যম‌তে, (বি‌বিএফ‌জি প্রক‌ল্পের মধ‌্যবর্তী মূল‌্যায়ন ২০১৯) কুড়িগ্রা‌মে বর্তমা‌নে বাল‌্যবি‌য়ের হার (১৮ বছ‌রের নিচে) ৪৭ ভাগ। ২০১৭ সা‌লের পর উল্লেখযোগ্য হা‌রে বাল‌্যবি‌য়ের প্রবণতা ক‌মে এ‌লেও ক‌রোনাকালীন সম‌য়ে গত এক বছ‌রে এ প্রবণতা কিছুটা বে‌ড়ে‌ছে। ত‌বে বি‌ষয়গুলো সব গোপ‌নে হচ্ছে।

স্বরলিকার নেতৃত্বে বঙ্গমাতা গোল্ডকাপে তৃতীয় হয় বাঁশজানি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়স্বরলিকারা যেখানে বাল্যবিয়ের কালো ছোবলে অন্ধকারে হারাতে বসেছেন, সেখানে তাদের মতোই বঙ্গমাতা স্কুল ফুটবল দিয়ে অনেকে খুঁজে পেয়েছেন জীবনের আলো। কলসিন্দুরের অদম্য মেয়েরা সেখানে অগ্রগামী। তবে স্বরলিকার আক্ষেপ থাকতেই পারে—টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হয়েও পরবর্তী সময়ে তার ওপর বাফুফের নজর পড়লো না!

বঙ্গমাতা ফুটবলে যেহেতু বাফুফের সরাসরি কোনও হস্তক্ষেপ থাকে না, তাই বাংলাদেশের ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে কাঠগড়ায় তোলাও যাবে না। তবে জাতীয় পর্যায়ে ভালো করা কিশোরী ফুটবলারদের ওপর ঠিকই নজর থাকে বাফুফের। স্বরলিকার ক্ষেত্রে সেটি হয়নি।

কেন হয়নি, এমন প্রশ্নে জাতীয় নারী দলের কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন বাংলা ট্রিবিউনকে শুধু বলেছেন, ‘জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় যারা ভালো করে থাকে, তাদের নিয়েই পর্যায়ক্রমে বাছাই করে আমরা আবাসিক ক্যাম্প করে থাকি। কুড়িগ্রামের বাল্যবিয়ের ঘটনাটি আমাদের জানা নেই। তবে এমনটি হয়ে থাকলে তা দুঃখজনক।’ সঙ্গে যোগ করেছেন, ‘আসলে এখনও মেয়েদের ফুটবলে প্রতিবন্ধকতা রয়েই গেছে। এখনও অনেক কষ্ট করে মেয়েদের খেলতে হচ্ছে। তবে এখন মেয়েরা ফুটবল খেলে অর্থ পাচ্ছে। স্বাবলম্বী হচ্ছে। আশা করছি, সামনের দিকে সব প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে যাবে।’

সেই দিন কবে আসবে? প্রশ্নটা জমাট বাঁধছে স্বরলিকার মতো সম্ভাবনাময় ফুটবলারদের হারিয়ে যাওয়ার স্রোতে। তাও আবার সেই হারিয়ে যাওয়াটা যখন বাল্যবিয়ের অভিশাপে!